লোডশেডিংয়ের থাবায় শিবরাম-নজরুল

১৩৫ পঠিত ০ ... ১৭:৪৩, আগস্ট ২৭, ২০২৬

ঘড়ির কাঁটা তখন রাত দুটো ছুঁই-ছুঁই। বিদ্যুতের ‘কারেন্ট’ হাওয়া! কত সময় পার হল! আমি মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের মেসে আমার সুপরিচিত  তক্তারামে চিত হয়ে শুয়ে শুয়ে ভাবছিলুম- গরমকাল আর লোডশেডিংয়ের সম্পর্কটা ঠিক কী? উত্তর পেলুম, একটা ‘গরম’, অন্যটা ‘গরমিল’!

বিদ্রোহী কবির একখানা কবিতা গুনগুনাচ্ছিলুম, যদি গরমটা কম বোধ হয়! তেজটা বড্ড ‘তেজী’ কি না! ভাবলুম, নজরুল সাহেবের ‘নজর’ আর আমাদের ওপর নেই, তাই নজরুলের মিষ্টি গানের ‘বাজনা’ আজ বাড়িওয়ালার তেতো ‘খাজনা’ হয়ে গেছে! সাথে তিমির রাত্রি তো ফ্রি!

হঠাৎ ঘরের কোণে কালবোশেখী ঝড়ের মত হাওয়া আর একখানা গমগমে গলার হাঁক শোনা গেল,

বলো বীর- বলো উন্নত মম শির!

দেশলাই কাঠি জ্বালিয়ে দেখি, ঘরের এক কোণে বাবরি চুল দুলিয়ে ধোঁয়াটে চেহারায় এক জাঁদরেল মূর্তি খাড়া! হাতে অবশ্য বাঁশি-টাসি কিচ্ছু নেই, তার বদলে কাঁধে গোল করে পেঁচানো একখানা ফিউজ হওয়া বিজলি তার! তার হাতের ‘ফিউজ’ দেখে আমি ‘কনফিউজড’ হয়ে গেলুম।

তক্তারাম থেকে আধ-ওঠা হয়ে শুধোলুম,

কে হে বাপু, তুমি? মাঝরাতে এসে এমন ‘প্রলয়োল্লাস’  -মার্কা হাঁক দিচ্ছ যে? মেসে কি ‘বিদ্রোহ’ শুরু হলো, নাকি বাড়িওয়ালা নোটিশ দিলে?

মূর্তিটা এক গাল হাসল, আমি নজরুল! কাজী নজরুল ইসলাম! ভাঙার গান গাইতে গাইতে ভুল করে তোমার এই ভাঙা মেসে এসে পড়লুম হে শিবরাম!

কাজীদা!, আমি হাতজোড় করে বললুম, তা পরলোক থেকে হঠাৎ এই মুক্তারামের তক্তারামে? এখানে তো কোনো 'মম চিত্তে নিতি নৃত্যে'র আয়োজন নেই, কেবল মশার অর্কেস্ট্রা আর লোডশেডিংয়ের ঘন ছায়াবাজি!

কাজীদা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাবরি চুল ঝাঁকিয়ে বললেন,

আর বোলো না শিবরাম! ওপরে কারেন্ট যাওয়ার পর ভাবলুম প্রেতলোক থেকে নেমে এসে এদেশের মানুষকে একটু জাগিয়ে তুলব! তা অন্ধকার রাস্তায় নামতেই এক ছোকরা ফ্ল্যাশলাইটের আলো আমার মুখে ফেলে চিৎকার করে উঠলে,

ওরে ব্যাস! একি কোনো কবি, নাকি ছদ্মবেশী চাঁদা শিকারি? সময়টা নাকি চাঁদারই চলছে, শিবরাম? আমার বেশ অপমানবোধ হল এই আচরণে, বুঝলে? চিনতেই পারলে না, এ কেমন কথা?

আমি ধামাধরা হাসিতে সান্ত্বনা দিলুম, আহা কাজীদা! কারেন্টে হাত পড়লে মানুষ যতটা শক খায়, কারেন্ট চলে গেলে তার চেয়ে বেশি ‘শকড’ হয়ে যায়! আপনার তো তবু ‘অগ্নিবীণা’ ছিল, এখনকার মানুষের তো লোডশেডিং হলে ঘামের চোটে ‘জলবীণা’ গড়িয়ে পড়ে! এই দেখুন না, পাখা বন্ধ হতে না হতেই আমার এই ‘শিব্রাম চকরবরতি’ শরীরটা গলে প্রায় ‘ক্ষীর-রাম’ হবার জোগাড়!

কাজীদা মোমবাতির শিখার দিকে তাকিয়ে একটু থমকে গিয়ে বললেন,

তা যা বলেছ! আমি অন্ধকার রাস্তায় দাঁড়িয়ে বললুম- ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর!'  অমনি পাশের বাড়ির জানলা দিয়ে এক ভদ্রলোক হাত বাড়িয়ে আমার হাতে একটা পাওয়ার ব্যাংক গুঁজে দিয়ে বললে, ‘আগে এটা চেপে ধরে একটু চার্জ তুলে দাও তো কবি সাহেব! জয়ধ্বনি কাল সকালে হবে, আগে আমার মোবাইলের প্রাণটা বাঁচুক! ভূতের কাছে লোকে চার্জ চাইছে, বোঝো কাণ্ড!

আমার দম ফেটে হাসি পেল, কিন্তু কবিপ্রবরের করুণ মুখের দিকে চেয়ে হাসলুম না। বললুম,

ওই তো মুশকিল হয়েছে কাজীদা! আপনার আমলে ছিল ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, আর আজকের আমলের মানুষের সবচেয়ে দুর্গম হলো- 'ব্যাটারি লো হওয়া মোবাইল! এম্নিতেই জেনজি আমল, মোবাইলেই ‘চিরউন্নত মম শির' অবনত হয়ে গেছে। তাতে যোগ হয়েছে লোডশেডিং!  মানুষ এখন  অহরহই চার্জার ফ্যানের নিচে গিয়ে ‘অবনত মম শির’ করে হাঁপায়! ওদিকে আকাশের দিকে ধেয়ে যাওয়া ভবনগুলোর দিকে দেখুন!  ওর লিফটে আটকে পড়া মানুষগুলোর দশা তো আরও করুণ- না পারছে মর্ত্যে নামতে, না পারছে স্বর্গে যেতে! একদম স্বর্গের ত্রিশঙ্কু!

কাজীদা এইবার একটু হেসে ফেললেন,

খাসা বলেছ শিবরাম! তবে যাই বলো, কারেন্ট যাওয়া কিন্তু একদিক থেকে ভালোই। এই যে অন্ধকার হলো, তবেই না মানুষ একটু মোমবাতির আলোয় নিজের ভেতরের ‘চির-উন্নত’ সত্তাটাকে দেখতে পাবে!

আমি বললুম, তা তো বটেই! কিন্তু বাইরের ‘লাইটের’ অভাবে ভিতরের ‘এনলাইটমেন্ট’ হবার আগেই ডেঙ্গু হয়ে যাবার সমুহ সম্ভাবনা হে কবিপ্রবর! ভেতরের সত্তা দেখতে গিয়ে হাসপাতালে যমরাজকে দেখে আসা! রথ দেখা-কলা বেঁচা দুই-ই হল, যদি ফিরে আসতে পারে তবে! তাছাড়া মোমবাতিও তো আজকাল বেজায় হিসেবি- আলোর চেয়ে শিক্ষা দেয় বেশি যে ‘পরের কারণে মরণেও সুখ!’

কাজীদা তখন বাবরি চুল দুলিয়ে বললেন,

চললুম তবে শিবরাম! এই তিমিরে বেশি ক্ষণ থাকলে এরা আবার আমাকে ‘ইনভার্টারের কবি’ বানিয়ে ছাড়বে! সে তিমিরের আর অন্ত থাকবে না! যদ্দিন ধরাধামে আছ, লোডশেডিং আর তার ‘লোড’ হজম করেই বেঁচে-বর্তে থাক! ওপারে দেখা হবে। যাই দেখি, ওপরে কারেন্ট ফিরল বোধহয়!

ধোঁয়া ধোঁয়া কবি জানলার বাতাসে মিলিয়ে গেলেন, আর ঠিক তখনই কারেন্টটা অতি-অসভ্যের মতো ফিরে এসে আমার মাথার ওপরের ফ্যানটাকে ঘুরিয়ে দিয়ে বলে উঠল, আমি এলুম!

 

 

 

 

১৩৫ পঠিত ০ ... ১৭:৪৩, আগস্ট ২৭, ২০২৬

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top ​