তারাপদ যেদিন বাজারে গেলেন

পঠিত ... ২ ঘন্টা ৪০ মিনিট আগে

ইদানীং আমাদের দেশে বাজার করা আর নিটশের দর্শনচর্চা করা যেন একই ব্যাপার। দুটি ক্ষেত্রেই মানুষের জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হয় এবং শেষমেশ এক পরম সত্য উপলব্ধি হয়, এই সংসারে কিছুই চিরস্থায়ী নয়, বিশেষত পকেটের টাকা।

আজকাল বাজারে ঢুকলে আমার নিজেকে নীল আর্মস্ট্রং বলে মনে হয়। চাঁদে পা দিলে মানুষের যেমন ওজন হালকা হয়ে যায়, তেমনি বাজারে পা রাখামাত্র মানিব্যাগটাও যেন শূন্যতায় ভাসতে শুরু করে।

আজ সকালে বাজারে গিয়ে বেগুনের দিকে হাত বাড়াতেই বিক্রেতা এমনভাবে আমার দিকে তাকাল, যেন আমি বেগুন নয়, ওর কোনো আত্মীয়ের কিডনি স্পর্শ করে ফেলেছি! কেজি প্রতি দামটা শুনে আমারই কিডনি নড়ে গেল! এই বেগুনটি নিশ্চয়ই কোনো সাধারণ গাছে ফলেনি; স্বয়ং স্বর্গের নন্দনকাননে বিশেষজ্ঞ মালিদের দিনরাত তদারকিতে লালিত-পালিত হয়েছে। তারপর সরাসরি চার্টার্ড ফ্লাইটে করে বাজারে অবতরণ!

সরে এসে একটু পাশে তাকাতেই দেখলাম, ঢেঁড়স আর লাউ! পাশাপাশি এমন শান্ত ও গম্ভীর মুখে বসে আছে, যেন তারা কোনো উচ্চমার্গের ঋষি। লাউয়ের দিকে হাত চলে গেল মনের ভুলে! অমনি দোকানদারের গম্ভীর গলা!

ভাই, ওটা কিন্তু সাধারণ লাউ নয়, আজ সকালেই পেট্রোল পাম্পের রেটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দর বেড়েছে।

আমি মনে মনে হিসাব করলাম, এক কেজি ঢেঁড়সের যা দাম, সেই টাকায় হয়তো আধা লিটার ডিজেল কিনে স্কুটারটা আরও কিছুদিন চালানো যেত। কিন্তু মুশকিল হলো, স্কুটারে তেল দিলে পেট ভরে না, আর তাতে গিন্নির মেজাজ চড়ে!

আজকাল বাজারে সবচেয়ে বিনয়ী প্রাণী হলো ক্রেতারা। আগে যারা আলু-পেঁয়াজ কেনার পর বিনামূল্যে দুটো কাঁচামরিচ বা এক আঁটি ধনেপাতা দাবি করে দোকানদারের সঙ্গে তুলকালাম কাণ্ড করে ফেলত, আজ তারা যেন পরম ভক্ত! পারলে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকে!

আর ফ্রিতে কাঁচামরিচ চাওয়া? কী স্পর্ধা! ফাঁসি না হয়ে যায়! চারটে মরিচ কেনার পর দোকানি যেভাবে ওগুলো পলিথিনের প্যাকেটে মুড়ে দিল, আমার মনে হলো কোনো অলংকারের দোকান থেকে সদ্য কেনা হীরের নোলক নিয়ে বাড়ি ফিরছি। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমায় চুপিচুপি পরামর্শ দিলেন,

মরিচ দুটো কিন্তু তরকারিতে দেবেন না মশাই। ওগুলো শোকেসে সাজিয়ে রাখুন। বাড়িতে অতিথি এলে দেখাবেন! আপনার স্ট্যাটাস সিম্বল ওগুলো!

আজকাল গৃহিণীদের রান্নার কৌশলও আমূল বদলে গেছে। রান্নার কড়াইতে তেলের ছিটে দেওয়ার সময় তারা এমন নিখুঁত পরিমাপক ড্রপার ব্যবহার করছেন, যা সাধারণত কেমিস্ট্রির ল্যাবরেটরিতে পরমাণু পরীক্ষার সময় ব্যবহৃত হয়। তরকারিতে নুন হয়তো একটু বেশি পড়ে যেতে পারে, কিন্তু তেল? একটু বেশি পড়ে গেলেই আগামী মাসের সংসার খরচ সোজা আইএমএফের (IMF) ঋণের লাইনে গিয়ে দাঁড়াবে।

আর মাছের বাজারের কথা না-ই বা বললাম। রুই-কাতলার পেটির দিকে তাকালে এখন আর ক্ষুধা জাগে না, কেবল এক ধরনের বৈরাগ্য আসে। মনে হয়, এই পৃথিবীতে আসা-যাওয়া সবই মিছে। মাছের কেজি শুনে হার্টবিট যে ধাক্কা দেয়, তাতে আধুনিক ডাক্তারদের উচিত ইসিজি মেশিন না কিনে রোগীদের সোজাসুজি বাজার করতে পাঠানো।

সব কেনাকাটা শেষ করে খালি মানিব্যাগ আর আধপোড়া সবজির থলি হাতে যখন ফিরছি, তখন রাস্তার মোড়ের পুরোনো বটগাছের ডাল থেকে একটা কাক আমার দিকে তাকিয়ে যেন একটু করুণা মেশানো গলায় ডেকে উঠল।

আমার মনে হলো—

বাজার থেকে ফেরার পর আর আমার কোনো বস্তুগত চাওয়া-পাওয়া বাকি রইল না। জীবনের সমস্ত মোহ কেটে গেছে। এখন থেকে প্রতিদিন সকালে বাজারে যাব, সবজির দর শুনব, আর পরম শান্তিতে মোক্ষ লাভ করব।

 

পঠিত ... ২ ঘন্টা ৪০ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top