কিছু সিনেমা শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়, অঞ্চল কিংবা রাজনৈতিক ঘটনার গল্প বলে না। বরং তারা এমন এক অভিজ্ঞতাকে সামনে আনে, যার সঙ্গে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষও নিজেদের ইতিহাসের মিল খুঁজে পেতে পারে। ‘Satluj’ তেমনই একটি সিনেমা। Honey Trehan পরিচালিত এবং Diljit Dosanjh অভিনীত ছবিটি মানবাধিকারকর্মী Jaswant Singh Khalra-র জীবন ও কাজকে কেন্দ্র করে নির্মিত। ছবিটির আগের নাম ছিল Punjab ’95। দীর্ঘ সেন্সর-জটিলতার পর ২০২৬ সালে এটি ‘Satluj’ নামে OTT-তে আসে।
Khalra-র গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকের পাঞ্জাব। সশস্ত্র সংঘাত ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা অভিযানের সেই সময়ে বহু মানুষ নিখোঁজ হন এবং অসংখ্য অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে। Khalra এসব মানুষের পরিচয় ও তাদের পরিণতি অনুসন্ধান করতে শুরু করেন। তাঁর অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত তাঁকেও বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। ১৯৯৫ সালে তিনি নিখোঁজ হন। পরে তাঁর অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় চার সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার দণ্ড হয়।
বাংলাদেশের সঙ্গে মিলটা কোথায়?
বাংলাদেশি দর্শকের কাছে এই গল্পের সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিকটি হলো, এর রাজনৈতিক আবহ অনেকটাই পরিচিত মনে হতে পারে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশে enforced disappearance বা জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গোপন আটক এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ বহু বছর ধরে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর আলোচনায় ছিল। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গঠিত গুম তদন্ত কমিশন এসব অভিযোগ নিয়ে তদন্ত শুরু করে। কমিশনের কাজ ও পরবর্তী প্রতিবেদনে বিপুলসংখ্যক অভিযোগের কথা উঠে আসে এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে তদন্তের প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করা হয়।
এখানে ‘Satluj’-এর সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিলটি কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বা ঘটনার মধ্যে নয়। মিলটি ক্ষমতা ও নাগরিকের সম্পর্কের মধ্যে।
একজন মানুষ নিখোঁজ হয়ে গেলে তার পরিবারের কাছে সেটি শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়। সেটি একটি দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা—মানুষটি কোথায়, কেন তাকে নেওয়া হয়েছিল, সে কি ফিরে আসবে, রাষ্ট্র কেন কোনো উত্তর দিচ্ছে না? বছরের পর বছর এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া একটি পরিবারকে যেমন ভেঙে দেয়, তেমনি সমাজের মধ্যেও ভয় তৈরি করে। ‘Satluj’ এই ভয়টাকেই ব্যক্তিগত মানুষের গল্পের মধ্য দিয়ে অনুভব করায়।
পাশাপাশি ‘Satluj’ দেখার সময় একজন বাংলাদেশি দর্শকের মাথায় সম্ভবত সবচেয়ে আগে যে প্রশ্নটি আসতে পারে, তা হলো—মানুষগুলোর আসলে কী হলো?
এই প্রশ্নটাই গুমের রাজনীতির সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গা। হত্যার ঘটনায় অন্তত একটি মৃতদেহ থাকে, একটি মৃত্যুর ঘোষণা থাকে, একটি শেষকৃত্য থাকে। কিন্তু গুমের ঘটনায় পরিবার অনেক সময় কোনো নিশ্চিত পরিণতিই জানতে পারে না। ফলে শোকও যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এ কারণেই গুম শুধু একজন ব্যক্তির অধিকার লঙ্ঘন নয়; এটি একটি পরিবারের সময়, স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎকেও আটকে দিতে পারে।
Khalra-র কাজের বিশেষত্ব ছিল এখানেই। তিনি শুধু ‘মানুষ মারা গেছে’ বলছিলেন না; তিনি জানতে চাইছিলেন, এই মানুষগুলো কারা ছিল, তাদের সঙ্গে কী ঘটেছিল এবং তাদের অস্তিত্ব কোথায় নথিবদ্ধ হয়েছে? অর্থাৎ, তিনি রাষ্ট্রীয় নথি, প্রশাসনিক রেকর্ড এবং মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতির মধ্যে যোগসূত্র খুঁজছিলেন।
রাষ্ট্রীয় বয়ান বনাম ব্যক্তিগত স্মৃতি
‘Satluj’-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক থিম হলো ন্যারেটিভ বা বয়ান নিয়ন্ত্রণ। যেকোনো সংঘাতের সময়ে রাষ্ট্র সাধারণত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, জাতীয় স্বার্থ কিংবা আইনশৃঙ্খলার ভাষায় নিজের কর্মকাণ্ড ব্যাখ্যা করে। অন্যদিকে ভুক্তভোগীর পরিবার ঘটনাটিকে দেখে সম্পূর্ণ ভিন্ন জায়গা থেকে—আমার বাবা কোথায়? আমার ছেলে কি জীবিত আছে? আমার ভাইকে কে নিয়ে গেল? আমার স্বামী কেন আর ফিরল না?
এই দুই বয়ানের মধ্যে যে দূরত্ব, ‘Satluj’ সেটিকে দৃশ্যমান করে।
বাংলাদেশেও শেখ হাসিনা আমলের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার ও বিরোধীদের ঘটনাবলির ব্যাখ্যার মধ্যে বড় পার্থক্য ছিল। সরকার অনেক সময় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার যুক্তি সামনে এনেছে, অন্যদিকে বিরোধী দল, পরিবার ও মানবাধিকারকর্মীরা অভিযোগ করেছেন রাজনৈতিক দমন-পীড়নের।
শেষ কথা
পাঞ্জাবের সংঘাতের ইতিহাস, ভারতের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা। ‘Satluj’ বাংলাদেশের ইতিহাসের সিনেমা নয়। কিন্তু সিনেমাটির যে রাজনৈতিক অনুভূতি—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সামনে একজন সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব, নিখোঁজ মানুষের পরিবার, সত্য প্রকাশের ভয় এবং ক্ষমতার বয়ানের বিপরীতে সাক্ষ্য সংরক্ষণের প্রয়োজন—সেটিই বাংলাদেশি দর্শকের কাছে শেখ হাসিনা আমলের অভিজ্ঞতার সঙ্গে একটি শক্তিশালী মানসিক সংযোগ তৈরি করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ‘Satluj’-এর সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক প্রশ্নটি হয়তো কোনো নির্দিষ্ট দল বা নেতাকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো: একটি রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের জীবনের মূল্য কতটুকু, এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সত্য বলার অধিকার কতটা নিরাপদ?
এই প্রশ্ন বাংলাদেশের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, পাঞ্জাবের জন্যও তেমনই ছিল। আর সেই কারণেই একটি পাঞ্জাবি গল্প ঢাকার একজন দর্শকের কাছেও এত অস্বস্তিকরভাবে পরিচিত মনে হতে পারে।


