গল্পটা খুব সোজা আছিলো একসময়। পাসপোর্ট বানাও, একটা চামড়ার ব্যাগ গোছাও, আর লাব্বাইক সিডনি বইলা শাহজালাল বিমানবন্দর থিকা সোজা মেলবোর্ন বা ব্রিসবেনের ফ্লাইটে উইং মেলো। কিন্তু ২০২৬ সালের এই কারেন্ট টাইমে আইসা ক্যাঙ্গারুর দেশ অস্ট্রেলিয়া আমগো লগে যে গেমটা খেলল, তার আসল নাম হইলো এভিডেন্স লেভেল ৩।
সোজা খাঁটি বাংলায় এর অর্থ হইলো, তোমারে আর তোমার চৌদ্দ গোষ্ঠীরে আমরা চরম উচ্চ ঝুঁকির খাতায় ফালাইলাম, তোমায় আমরা চট করে বিশ্বাস করি না!
আমগো দেশের পোলাপাইনের হিসাব আছিলো পড়ালেখার একটা বাহানা ধইরা একবার ক্যানবেরা বা সিডনিতে পাড়া দিতে পারলেই কেল্লাফতে! কিন্তু ভিসা অফিসারেরা তো আর ডালপুরি খাইয়া বইসা নাই। তারা হিসাব মিলাইয়া দেখল, বাংলাদেশ, নেপাল, ভারত আর ভুটানের মতো দক্ষিণ এশীয় মুলুক থিকা মেধার চর্চা করতে আসা পোলাপাইনের বিরাট একটা অংশ আসলে ক্লাসরুমের চেয়ে ভিক্টোরিয়া স্ট্রিটের ফুটপাতে বা রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে কাজ খুঁজতেই বেশি ব্যস্ত। ফলে তারা কী করল? ভিসার কেঁচো খুঁড়তে গিয়া এক প্রকাণ্ড কেউটে সাপ বের করল!
২০২৬-এর শুরুর দিকে আইসা দেখা গেল বাংলাদেশি স্টুডেন্ট ভিসা আবেদনের ৪৫ থিকা ৫১ পার্সেন্টই সরাসরি রিজেক্ট হইয়া চটপট আস্তাকুঁড়ে গিয়া পড়তেছে! কোনো কোনো মাসে এই রিজেকশনের হার তো আরও আসমানে গিয়া ঠেকছে।
তার ওপর আইলো নতুন ফতোয়া। স্পাউস ও ডিপেন্ডেন্ট নো এন্ট্রি। মানে, আপনি যদি পিএইচডি বা উচ্চতর গবেষণার কোনো জাঁদরেল স্কলার না হন, তবে বউ-বাচ্চা বগলে চেপে ক্যাঙ্গারুর দেশে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন একেবারেই শেষ। এমনকি পড়ালেখা শেষ কইরা যে গ্র্যাজুয়েট ভিসা নিবেন, সেখানেও একই কড়াকড়ি। পরিবার নেওয়ার কোনো সুযোগ নাই!
আর আমগো দেশের অতি চালাক কিছু লোক যে ধান্দা করতো, আরে চল্ ট্যুরিস্ট বা ভিজিটর ভিসা নিয়া কুইক অস্ট্রেলিয়া ঢুইকা পড়ি, তারপর ভেতরে গিয়া চুপিচুপি স্টুডেন্ট ভিসায় সুইচ মাইরা দিমু। সেই চালাকির মুখেও ক্যানবেরা মারিয়া দিল No Further Stay নামের প্রকাণ্ড একখানা তালা! অর্থাৎ, যেই ভিসায় ঢুকবা, পড়ালেখা বা অন্য কিছু করার সুযোগ না পাইয়া সোজা ওই ভিসার মেয়াদ শেষে আবার ঢাকার ফ্লাইটে ব্যাক করতে হবে।
এরপর তারা হাজির করছে Genuine Student (GS) Test নামের এক অণুবীক্ষণ যন্ত্র। এই টেস্ট পার হওয়া মানে আস্ত একটা জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড ডিঙানো! আপনার আগের সাবজেক্টের লগে অস্ট্রেলিয়ার কোর্সের সামান্য গরমিল আছে? রিজেক্ট! আপনার বাপের ব্যাংকের স্টেটমেন্টে বা ফিন্যান্সিয়াল ব্যাকগ্রাউন্ডে একটুখানি সন্দেহ জাগছে? রিজেক্ট! পড়ালেখা শেষে যে আপনি বাংলাদেশে ফেরত আইসা নিজের দেশে কিছু করবেন, সেই টাইস বা টানের প্রমাণ দিতে পারতেছেন না? বিসমিল্লাহ বইলা রিজেকশনের সিল ঠুকে দিল!
আসলে ক্যানবেরার আসল গোমরটা কী? অস্ট্রেলিয়া সরকার দেখল, তাদের দেশে এখন থাকার ঘরের চরম অভাব, হেলথ কেয়ার বা স্বাস্থ্যসেবায় বেহাল দশা, আর তার ওপর হাজার হাজার আন্তর্জাতিক স্টুডেন্ট আইসা ওভারস্টে করতেছে, কাজের ধান্দায় ঘুরতেছে, আর সুযোগ পেলেই রাজনৈতিক আশ্রয়ের রিফ্যুজি কার্ড পাওয়ার জন্য কেস ঠুকে দিতেছে। এই হাউজিং সংকট সামলাতে আর সিস্টেমের অপব্যবহার রোধ করতেই তারা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ওপর এই খড়্গহস্ত নীতি চাপাইয়া দিল।
২
অস্ট্রেলিয়া তো আমগো দরজায় কপাট মারল, কিন্তু বাকিরা কি বসে আছে? একদম না! ব্রিটেনের দিকে তাকান। তারা ২০২৪ সালেই এক হুকুমনামা জারি কইরা বলে দিল, পড়ালেখা করতে আইসা বউ-বাচ্চা অর্থাৎ স্পাউস ও ডিপেন্ডেন্ট সাথে নিয়া ঘুরাঘুরি করা বন্ধ! শুধু যারা পোস্টগ্র্যাজুয়েট রিসার্চ বা পিএইচডি লেভেলে পড়ালেখা করবে, তারাই কেবল পরিবার সাথে নেওয়ার পারমিশন পাবে। কারণটা কী? কারণ আমগো দেশ থেকে বাপের সম্পত্তি বেচে বা লোন নিয়ে একলা স্টুডেন্ট ভিসা বাগাত, তারপর পিছু পিছু পুরো পরিবার নিয়ে গিয়ে লন্ডনের অলিতে-গলিতে ঢুকে পড়ত। সেখানে গিয়ে কাজকাম না পেয়ে, ঘরের ভাড়া না জোটাতে পেরে শেষে সিস্টেমের ওপর চাপ বাড়াত আর রিফ্যুজি কার্ড বা আশ্রয়ের দোহাই কাটত। সাহেবরা হিসাব মিলাইয়া দেখল, এই ডিপেন্ডেন্টের বহর কমাইতে না পারলে তাদের নিজেদের অর্থনীতিই ধসে যাবে!
এবার আসেন অটোয়া আর টরন্টোর কানাডায়। যে কানাডাকে মানুষ ভাবত ভালোবাসার স্বর্গরাজ্য, যেখানে স্টুডেন্ট গেলে বউ-জামাই সাথে সাথেই ওয়ার্ক পারমিট পাইয়া একদম সেটেলড! সেই কানাডাও ২০২৫-২৬-এ এসে স্টুডেন্ট স্পাউস ওয়ার্ক পারমিটের ওপর শক্ত কাঁচি চালাইয়া দিছে। এখন নিয়ম হইছে, কমপক্ষে ১৬ মাসের মাস্টার্স, পিএইচডি বা নির্দিষ্ট কিছু প্রফেশনাল ডিগ্রি ছাড়া স্টুডেন্টদের স্পাউসরা আর কোনো ওয়ার্ক পারমিট পাবে না! সাথে স্টুডি পারমিটে বসানো হইছে কড়া ক্যাপ বা নির্দিষ্ট কোটা। কেন? কারণ কানাডার প্রধান শহরগুলোতে এখন থাকার মতো কোনো খালি ঘর নাই, মেডিকেল সার্ভিসগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নাই, হাউজিং ক্রাইসিস এমন জায়গায় ঠেকছে যে নিজেদের লোকই এখন ক্ষোভে ফুঁসতেছে!
আর জার্মানি? সে তো ভাই আরেক ট্র্যাজিক মহাকাব্য! জার্মানিতে টিউশন ফি নাই শুনে ঢাকার পোলাপাইন হুড়মুড় করে জার্মান ভাষা শিখতে দৌড়ালো। কিন্তু ঢাকায় জার্মান এম্বাসির অ্যাপয়েন্টমেন্ট যেন ওই অমাবস্যার চাঁদ! স্টুডেন্ট ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতেই কেটে যায় মাসের পর মাস, আর ফ্যামিলি রিইউনিয়ন অর্থাৎ বউ বা জামাইকে জার্মানি নিয়ে যাওয়ার ভিসার সিরিয়াল পেতে লেগে যাচ্ছে কয়েক বছর পর্যন্ত! একে তো অ্যাপয়েন্টমেন্টের দীর্ঘ লাইন, তার ওপর পেপারস ভেরিফিকেশনের জন্য আলাদা ১০ থিকা ১২ সপ্তাহ সময়। জার্মানির লোকাল ইমিগ্রেশন অথরিটিতে পেপারস ঘুরে আসতে আসতে চুল পেকে সাদা হওয়ার জোগাড়! কেন এমন অবস্থা? কারণ ঢাকার জার্মান এম্বাসির লোকবল আর বাজেট একদম সীমিত, কিন্তু আবেদনকারীর সংখ্যা আসমান ছোঁয়া। আর জার্মান আইন অনুযায়ী সস্তা লোক দিয়ে তো আর ভিসা দেওয়ানো যায় না, বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কন্সুলার অফিসারদেরই সবকিছু দেখতে হয়।
এবার একটু মিডল ইস্ট বা মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকান। দুবাই, ওমান, বাহরাইনের মতো জায়গায় গিয়েও শান্তি নাই। ইউএই বা দুবাইতে বাংলাদেশি ওয়ার্ক আর ভিজিট ভিসা অনানুষ্ঠানিকভাবে পুরো টাইট বা স্থগিত করা হইছে। হাজার হাজার ভিসা হুটহাট ক্যানসেল হয়ে গেছে। কারণ কী? আমাদের লোক সেখানে গিয়ে ওভারস্টে করে, কাজের ভিসা ছাড়া অবৈধ কাজ করে, ভিসার নিয়ম ভাঙার মহোৎসব চালায়, আর মাঝেমধ্যে তাদের মাটিতে গিয়ে রাজনৈতিক জটলা তৈরি করে। মালয়েশিয়া, ওমান বা বাহরাইনেও একই কেচ্ছা।ভুয়া কাগজপত্র জমা দেওয়া, পাসপোর্ট জালিয়াতি আর নিয়মের তোয়াক্কা না করার কারণে শ্রমবাজার একদম সীমিত বা বন্ধ হয়ে গেছে।
এমনকি সুদূর আমেরিকা বা ইউএসএ-ও ৭৫টা দেশের যে তালিকা বানাইছে, যেখানে ইমিগ্র্যান্ট ভিসা প্রসেসিং ঝুলিয়ে রাখা হইছে, সেই তালিকায় বাংলাদেশও আছে! মার্কিনদের ভয় একটাই, পাবলিক চার্জ। মানে তাদের ধারণা, বাংলাদেশ থেকে লোক গিয়ে যদি চাকরি-বাকরি না পেয়ে সরকারি সহায়তার ওপর বসে বসে খায়! আর আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের কথাও বাদ দেবেন না। নিরাপত্তা আর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক হাওয়া-বাতাসের টানাপোড়েনে ট্যুরিস্ট ভিসা দেওয়া প্রায় বন্ধের কোঠায় নামিয়ে এনেছে।
সোজা কথায়, দুনিয়ার ম্যাপে বাংলাদেশিদের জন্য স্পাউস বা পরিবার নিয়ে যাওয়ার পথগুলা বন্ধ বা টাইট করার মূল উদ্দেশ্য হইলো চারটা—
১. জনসংখ্যা ও মাইগ্রেশনের সংখ্যা কমানো
২. গন্তব্য দেশগুলোর আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর থেকে বাড়তি চাপ সরানো
৩. ওভারস্টে আর কথায় কথায় ভুয়া আশ্রয়ের কেস ঠোকা বন্ধ করা
৪. ব্যাংক স্টেটমেন্ট আর সার্টিফিকেটের ভুয়া নথিপত্রের প্রতারণা থামানো
৩
এখন মূল জায়গায় গিয়া হাত দেওয়া যাক। দুনিয়ার এত এত দেশ হঠাৎ একসাথে আমগো ওপর অখুশি হইয়া দরজায় তালা মারতেছে কেন? আসল গোমরটা কিন্তু অন্য কোথাও না, আমাদের নিজেদের ঘরের চালচিত্রেই লুকাইয়া আছে!
প্রথম কাণ্ড হইলো আমগো হাই রিস্ক পারসেপশন বা চরম অবিশ্বাস। বাজারে গিয়া যেমন আলু-পটল কেনা যায়, আমগো দেশে একশ্রেণীর ধান্দাবাজ লোক ঠিক তেমনি ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ভুয়া কাজের অভিজ্ঞতা, জাল সার্টিফিকেট আর ভুয়া এম্ব্যাসি লেটার বেচাকেনা করে। ভিসা বাগানোর জন্য এই ধরনের ভুয়া নথিপত্র জমা দেওয়ার হার এত বাইড়া গেছে যে, বাইরের দেশের কনস্যুলার অফিসাররা এখন আমগো যেকোনো আসল কাগজ দেখলেও আগে তিনবার সন্দেহ করে। তার ওপর ভিসা পাইয়া ভিজিটর বা স্টুডেন্ট হিসেবে বিদেশে পাড়া দেওয়ার পর অনেকেই আর দেশে ফেরে না। অবৈধ হইয়া লুকাইয়া থাকে, ওভারস্টে করে, আর শেষমেশ কোনো উপায় না পাইয়া হুট করে ভুয়া রিফ্যুজি কেস বা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন ঠুকে দেয়।
দ্বিতীয়ত, আমাদের গ্লোবাল পাসপোর্টের মান-ইজ্জত। দুনিয়ার পাসপোর্টের র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশি পাসপোর্টের অবস্থা এখন ৯৪ কি ৯৫ নম্বরের ঘরে গড়াগড়ি খাচ্ছে! আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই দুর্বল পাসপোর্টের অর্থ হইলো আমগো ওপর তাদের বিশ্বাসের ভিত্তিটা একদম নড়বড়ে। তার ওপর ২০২৪ সালের সরকার পরিবর্তন আর রাজনৈতিক অস্থিরতার পর থেকে অনেক দেশই বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ব্যাপারে অতিরিক্ত সতর্ক বা সন্দেহপ্রবণ অবস্থান নিছে।
তৃতীয়ত, গন্তব্য দেশগুলোর নিজেদের ঘরোয়া গ্যাঁড়াকল। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা বা ইউকের মতো দেশে এখন থাকার ঘরের চরম অভাব, হেলথ কেয়ারে ডাক্তার পাওয়া যায় না, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আসমানছোঁয়া। সেখানকার সাধারণ জনগণ এখন সরকারের ওপর ক্ষিপ্ত। ফলে রাজনীতি সামলাতে আর নিজেদের ঘরের চাপ কমাতে ওই দেশগুলোর সরকার সোজা সাপ্টা পথ বাছিয়া নিছে; ইমিগ্র্যান্ট আর স্পাউস আসার কলকব্জা টাইট করে দাও!
তবে কি পুরো গল্পটাই একখানা অন্ধকারের ইতিহাস? না ভাই, একদম নিরাশ হওয়ারও কিছু নাই। আসল কথা হইলো, দুনিয়া কিন্তু সৎ আর জেনুইন লোকজনের জন্য পুরোপুরি বন্ধ হইয়া যায় নাই। ধান্দাবাজি বা চালিয়াতির পথ ছাইড়া যদি একদম খাঁটি নথিপত্র, সঠিক শিক্ষাগত ব্যাকগ্রাউন্ড, আর শতভাগ লিগ্যাল ফিন্যান্সিয়াল ডকুমেন্টস দেখাইতে পারেন—তবে ভিসা এখনো হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে।
কিন্তু ওই যে প্রবাদ আছে না, একজনের পাপে পুরো গ্রাম কাঁদে! কতিপয় ভুয়া কাগজপত্রওয়ালা আর অবৈধভাবে থেকে যাওয়া লোকজনের আকামের খেসারত এখন দিতে হচ্ছে দেশের হাজার হাজার সত্যি সত্যি মেধাবী, সৎ আর পরিশ্রমী তরুণ-তরুণীকে।



পাঠকের মন্তব্য