শেখ মুজিবের ইতিহাস রাখতে ইচ্ছা হয় না কেন!

পঠিত ... ৩ ঘন্টা ৫০ মিনিট আগে

আমাদের এই পোড়খাওয়া জনপদে ইতিহাস জিনিসটা ঠিক ঐতিহাসিক নয়, ওটা হলো ক্ষমতার চেয়ারে বসা মহামান্যদের মুড-মর্জি। যখন যে সরকার আসে, তারা ভাবে, ইতিহাস মানে তো তাদের বাপের বায়নামা দলিল! খামখেয়ালিপনায় একটু এদিক-সেদিক হলেই হলো।

এই যেমন সেদিন ডাকসুর এক কর্ত্রীমণি, যিনি আবার মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন সামলান, সাংবাদিকদের একদম সাফ জানিয়ে দিলেন, ডাকসু সংগ্রহশালায় শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক ইতিহাস রাখতে নাকি তার ইচ্ছা হয়নি, তাই রাখেননি! বাহ রে! দেশটার বয়স পার হয়ে গেল কত বছর, কিন্তু নেতাদের ইচ্ছা হয়নি রোগটা কিছুতেই গেল না।

আচ্ছা, জিন্নাহ সাহেবকে নিয়ে আপনাদের এত পিরিত কেন? ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর তিন-তিনটে ছবি দিব্যি ঝুলছে! সেদিনকার ছবিও বাদ যায়নি, যেদিন উনি বুক ফুলিয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন, উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা! আর এই বাংলার ছাত্র-জনতা গলা ফাটিয়ে বলেছিল, না, কদাচ না! সেই ছবি সসম্মানে টাঙানো হলো। অথচ ১৯৬৬-এর ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান কিংবা একাত্তরের ৭ই মার্চের সেই আসল লড়াকু মানুষটার, মানে শেখ মুজিবের, মুক্তিযুদ্ধের আগের গোঁফও রাখা হলো না। তার বদলে স্থান পেল ১৯৭৪ সালে তাঁর দুই ছেলের বিয়ের একটা ছবি! আহা! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতে কার ছেলেদের বিয়ে হয়েছে আর কার হয়নি, তা নিয়ে কার মাথা ব্যথা? কিন্তু ইতিহাস বিকৃতির কী চমৎকার মুন্সিয়ানা!

সাংবাদিকরা যখন আমতা-আমতা করে জানতে চাইল, ভাইসব, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১-এর মধ্যে শেখ সাহেবের ছবিগুলো গেল কোথায়? তখন ওই কর্ত্রীমণি হাসিমুখে বলে দিলেন, ইচ্ছা হয়নি! অর্থাৎ, যা ভালো লাগবে না, তাই মুছে দেব। দেশটা যেন বাপ-দাদার মুল্লুক!

তবে খামখেয়ালি করে ইতিহাসকে ধোলাই করার এই সংস্কৃতি কিন্তু নতুন কোনো আমদানি নয়। এ হলো আমাদের চিরকালের রাজনৈতিক রেওয়াজ। এপার বাংলা হোক বা ওপার, ক্ষমতায় বসলেই সবার হাত চুলকায় ইতিহাস বদলানোর জন্য।

শুরু করা যাক পুরনো আমলের সেই দলটাকে দিয়ে, যারা কথায় কথায় একাত্তরের লবডঙ্কা বাজাত। তারা তো ক্ষমতায় থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে একদম পারিবারিক পিকনিক স্পটে নামিয়ে এনেছিল! তাজউদ্দীন আহমদ সাহেব, যিনি জীবন বাজি রেখে যুদ্ধটা সামলান, তাঁকে ঠেলে দিল একদম ডাস্টবিনের কোণে। মওলানা ভাসানীর গণআন্দোলন কিংবা জেনারেল ওসমানীর রণকৌশল সব গিলে খেল ব্যক্তি-স্তাবকতার দানব। জিয়াউর রহমানের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের ঘোষণা নিয়ে পাঠ্যবইয়ে যা হলো, তা তো ম্যাজিক শো-কেও হার মানায়। আর একাত্তরের পর রক্ষীবাহিনীর কাণ্ডকারখানা, বাহাত্তরের চুরির দুর্ভিক্ষ কিংবা বাকশালের মতো অলংকারগুলো পাঠ্যবই থেকে এমনভাবে মুছে ফেলা হলো, যেন ওগুলো স্রেফ কল্পবিজ্ঞান!

এরপরে এলো বিএনপি আর খাকি উর্দিধারীরা। তারা এসেই চশমা উল্টে ফেলল ১৮০ ডিগ্রি কোণে। দু’দশক ধরে সরকারি রেডিও-টিভি বা স্কুলের বইয়ে শেখ মুজিবের নাম উচ্চারণ করা মানেই ছিল জেল-জুলুম অবধারিত। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হলো। আর জিয়ার এমন বন্দনা শুরু হলো, যেন দেশটা এক রাতে এক মেজরের হুইসিলেই স্বাধীন হয়ে গেছিল, তার আগে এ দেশে কোনো রাজনীতি বা আন্দোলন বলতে কিচ্ছু ছিল না! ১৯৯১ বা ২০০১-এ সরকার বদলালেই পাঠ্যবইয়ের পাতাগুলো যেন রিকশার হুডের মতো ওঠানামা করতে শুরু করত।

আর আমাদের জামায়াত ভাইদের কথা আর কী বলব! তাদের তো সারাটি জীবন কাটল একাত্তরের অপকর্ম ঢাকতে ঢাকতে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যাদের কুকীর্তি দলিল দিয়ে প্রমাণিত, তারাও দিব্যি গলা চড়িয়ে বলে বেড়ায়, আহা, ওটা নাকি কোনো মুক্তিযুদ্ধ ছিল না, ওটা ছিল স্রেফ বিদেশি চক্রান্ত! সুযোগ পেলেই ইতিহাসের চাকা উল্টো দিকে ঘোরানোর পাঁয়তারা তাদের রক্তে মিশে আছে।

এরই মধ্যে গেল গেল বছর এল সেই মহা-অভ্যুত্থান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। সাধারণ মানুষ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বুক ফুলিয়ে সবাই ভাবল, যাক বাবা, এত দিনে বুঝি দলীয় জবরদখল থেকে ইতিহাস মুক্ত হলো! ফ্যাসিবাদের ভূত তো নামল, এবার হয়তো একটু স্বাধীনভাবে নিশ্বাস নেওয়া যাবে।

কিন্তু কই মাছের প্রাণ যেমন তেলেই ভাজে, তেমনি ক্ষমতার মসনদে বসলেই সবার ভেতরে একটা করে ছোটখাটো একচ্ছত্র সম্রাট জেগে ওঠে। জাতীয় পর্যায় তো দূর কি বাত, খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু সংগ্রহশালাতেও যদি বর্তমান কর্তারা আগের আমলের একনায়কদের মতো স্বেচ্ছাচারিতা করেন, তখন সাধারণ মানুষ আর যায় কোথায় দাঁড়াবে? বিগত পনেরো বছরের জবরদস্তির প্রতিশোধ নিতে গিয়ে কি তবে বায়ান্ন, বাহাত্তর আর ছেষট্টি সালের মাঠের নেতাদের নামগন্ধ মুছে দেওয়া হবে?

সবাই মিলে যদি একটা সর্বজনীন জাতীয় ঐকমত্যে না পৌঁছানো যায়, তবে কি দেশটা চিরকাল এই খেয়োখেয়ির আবর্তেই ঘুরপাক খাবে? আওয়ামী লীগ লিখেছিল তাদের সুবিধের মনগড়া ইস্তাহার, বিএনপি বানাল তাদের নিজেদের রাজনৈতিক বয়ান, জামায়াত ধামাচাপা দিল তাদের পুরোনো অপরাধ, আর এখন ডাকসু এসে সাফ জানিয়ে দিল, ইচ্ছা হয়নি!

এই খেয়ালি পান্তাভাতের রাজনীতি বন্ধ না হলে, সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গেই কি ইতিহাস বারবার শূন্যের কোঠায় গিয়ে ঠেকবে? নাকি এই দেশের কোটি সাধারণ মানুষ চিরকাল গুটিকক নেতার খামখেয়ালি আর ব্যক্তিগত ইচ্ছের কাছে চিরতরে জিম্মি হয়ে থাকবে?

পঠিত ... ৩ ঘন্টা ৫০ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top