খাবার জিনসটা মূলত চার ইঞ্চি লম্বা একটা জিব আর আধমিটার মতো এক খাদ্যনালীর ব্যাপার। কিন্তু মানুষের সাইকোলজি এমনই বিচিত্র বস্তু, যে সেখানে আলুর চপ ঢুকবে নাকি পোর্কের চপ, তা নিয়ে তর্কাতর্কি গড়াতে পারে সোজা বিশ্বশান্তির বৈঠক পর্যন্ত।
সম্প্রতি কলকাতার এক প্রবীণ অভিনেতা বাংলাদেশ ঘুরে এসে বেশ আয়েশ করে বললেন, তার গরুর মাংস পছন্দ। কথাটা শুনলেই মনে হওয়া উচিত ছিল; একজন সত্তরোর্ধ্ব মানুষ তার পছন্দমতো দু’টুকরো মাংস খেয়ে বেশ তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছেন, মামলা খতম। কিন্তু না, সমাজ নামক যন্ত্রটি চালিত হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন শক্তিতে। কলকাতার নেটিজেনদের একাংশ হঠাৎ আবিষ্কার করলেন, এতে নাকি সমগ্র ধর্মের সুপ্রাচীন ভিত্তি এক ঝটকায় থরথর করে কেঁপে উঠেছে। অমনি শুরু হলো হুমকির মহোৎসব, ওপারে গিয়েই থেকে যান, ডিম মারা হবে। অর্থাৎ, উনি কী দিয়ে ভাত মেখে খাবেন, সেটা নাকি সিদ্ধান্ত নেবে ফেসবুকের চারটে ট্রোল পেজ আর জনান্তিকে গজিয়ে ওঠা কিছু স্বঘোষিত ধর্মোদ্ধারক।
অথচ সহজ হিসাবটা পানির মতো পরিষ্কার। পৃথিবীর যে-কোনো মানুষের পেটটা তার নিজের, ক্রয়ের টাকাটা তার নিজের, আর চিবানোর দাঁতগুলোও তার নিজের। তিনি যদি চান খাসির রেজালা খাবেন, চান তো ব্রয়লার মুরগি চিবোবেন, আর মন চাইলে গরুর মাংসের ঝোল দিয়ে মাখবেন। এই অতি-সাধারণ বাথরুম-লেভেলের সত্যটা বোঝার জন্য বিশাল কোনো মহাকাশবিজ্ঞানী হওয়ার দরকার পড়ে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, কোনো মানুষের পাতের দিকে নজরদারি করার যে একপ্রকার বিকৃত আনন্দ আছে, তা আমাদের এই উপমহাদেশীয় রক্তের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুরঘুর করে।
অবশ্য আমার বাংলাদেশের অনেক উদারচেতা প্রগতিশীল জনতা আবার এই ট্রোলিংয়ের দৃশ্য দেখে হঠাৎ বেশ সোচ্চার হয়ে উঠলেন। তারা বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীর ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে ব্যানার উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন, আহা! খাদ্য পছন্দ তো ব্যক্তিগত ব্যাপার, একেক জনের রুচি একেক রকম, সেখানে ধর্ম কেন আসবে? বাহ, শুনতে কী চমৎকার লাগে! ঠিক যেন সভ্য পৃথিবীর একেবারে শেষতম কনসেপ্ট। নিজের থালায় আপনি কী তুলবেন, তা একান্তই আপনার মর্জির একচেটিয়া অধিকার। এই তত্ত্বটা এতটাই স্বাদযুক্ত যে শুনে যে-কারোর মনে হতে পারে, আমরা অবশেষে এক মহাসভ্য জাতির দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছি।
কিন্তু গোলমালটা শুরু হয় ঠিক তার পরমুহূর্তেই। কারণ ব্যক্তিগত স্বাধীনতা জিনিসটা নাকি আবার ভৌগোলিক সীমান্ত আর ধর্মগ্রন্থের পাতা দেখে লাল-সবুজ বা গেরুয়া রঙ ধারণ করে!
ধরা যাক, কাল সকালে যদি বাংলাদেশেরই অতি-পরিচিত কোনো মুসলিম তারকা হঠাৎ কোনো দূর দেশের রেস্তোরাঁয় বসে খুব স্বাভাবিক মুখে বলে ফেলেন, এই পোর্কের স্টেকটা কী দারুণ বানিয়েছিল! আমার কিন্তু বেশ পছন্দ! ঠিক কী ঘটবে তখন?
যারা গতকাল বিশ্বজিৎবাবুর আহারের সমর্থনে পার্সোনাল চয়েস-এর লম্বা লম্বা ভাষণ দিচ্ছিলেন, তাদের প্রগতির ফানুসটি তখন কোন মহাশূন্যে বিলীন হবে, তা নিয়ে কোনো রকেট সায়েন্স করার প্রয়োজন নেই। যে সমাজ গতকাল অন্য ধর্মের লোকের থালা দেখে উদারতার সাগরে ভাসছিল, সেই সমাজই নিজের ঘরের লোকটির থালায় নিষিদ্ধ মাংস দেখে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে তেড়ে আসবে। তাকে ধর্মদ্রোহী, কাফের আর জাহান্নামী বানিয়ে একেবারে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলবে।
আসলে আমরা কেউ খাবারের স্বাধীনতা চাই না, আমরা চাই আমাদের পছন্দের তালিকার বাইরের লোকগুলোকে একটু বিপদে দেখতে। ওপরের লোকটা কী খাবে না-খাবে তা নিয়ে পরকালের যে বিচারক বসে আছেন, তার দায়িত্বটা আমরা নিজেরাই চটজলদি হাতে তুলে নিতে বেশ ভালোবাসি। কেউ মহাধুমধামে গরু খাক, কেউ সুস্বাদু শূকর চিবিয়ে খাক, কেউ বা স্রেফ ঘাস-পাতা খেয়ে জীবন পার করে দিক; যার যার শরীর আর বিশ্বাস, সে সে বুঝে নিক না ভাই! কিন্তু না, অপরের পাতের প্রোটিন আর ফ্যাটের হিসাব না রাখলে যে আমাদের ঘুমই আসে না।
২
গতকাল পর্যন্ত যাদের হৃদয় বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীর প্রোটিন-প্রীতির জন্য দয়ায় একদম টলমল করছিল, তাদের যদি হঠাৎ বলা হয়; ভাই, কাল থেকে আপনার পাশের বাসার ছেলেটির নিজের পাতে পোর্ক পছন্দ করার স্বাধীনতাকেও একই রকম তালি দিয়ে স্বাগত জানাতে হবে, তাহলে দেখা যাবে সেই মহতী উদারতার বেলুনটি পট করে ফেটে গেছে।
কারণ আমাদের এই ভৌগোলিক এলাকার প্রগতি আর ব্যক্তিস্বাধীনতা ভীষণ হিসাব মেনে চলে। হিসাবটা খুব সহজ। পরের ঘরের লোক নিজের ধর্মশাস্ত্রের নিয়ম ভাঙলে সেটাকে চমৎকার মুক্তচিন্তা বলে হাততালি দেওয়া যায়; কিন্তু নিজের ঘরের লোক শাস্ত্রের বাইরে এক পা ফেললেই অমনি ধর্ম সংকটে পড়ে যায়, সমাজ উদ্ধার করতে লাঠি হাতে নেমে পড়তে হয়। অন্যের পাতের খাদ্য দেখতে স্বাধীনতা, আর নিজের পাতের খাদ্য দেখতেই কেতাবের পাতায় লুকানো হাজার বছরের নিষেধাজ্ঞা।
একদল ভাবেন, অন্য ধর্মের লোকে কী খেল না-খেল তা নিয়ে হুলুস্থুল বাধানোটাই বুঝি পরম ধার্মিকতার লক্ষ্মণ। আর অন্য দল ভাবেন, নিজের ঘরের কঠোর নিয়মগুলো অক্ষুণ্ণ রেখে কেবল প্রতিবেশী সমাজের গোঁড়ামিকে বিদ্রূপ করাই হলো আসল সুশীলতা। আসলে দু’পক্ষই একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। সমস্যাটা খাবারের মধ্যে নেই, সমস্যাটা রয়েছে মানুষের মনের ভেতর আটকে থাকা নজরদারির ব্যাধিতে। অন্যের প্লেটে কী চামচ দিয়ে তোলা হচ্ছে, তা নিয়ে মাথা ঘামাতে গিয়ে নিজেদের মাথার ভেতরের মগজটুকু যে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে, সে খেয়াল কারও নেই।
বাস্তবতা হলো, একজন মানুষ নিজের টাকায় কী কিনে চিবোবেন, তা নিয়ে যদি অন্য রাষ্ট্র, সমাজ বা ফেসবুকের তৌহিদি জনতা নির্দেশিকা তৈরি করতে শুরু করে, তবে বুঝতে হবে সমাজ হিসেবে আমাদের রুচি শেষ সীমায় এসে ঠেকেছে। গরু হোক, শূকর হোক, বা ঝিঙে-খাদ্য স্রেফ খাদ্যই। এটাকে জান্নাতের পাসপোর্ট বা জাহান্নামের টিকিট বানিয়ে ফেলাটা আর যাই হোক, কোনো সুস্থ সভ্যতার কাজ হতে পারে না।
কেউ যদি গরু খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন, তুলুন। কেউ যদি পোর্ক খেয়ে বলেন আহা, তৃপ্তি করে খেলাম! তাকেও বলতে দিন। আর যে লোকটা এসবের কিছুই ছোঁয় না, স্রেফ লাল শাক আর ডাল ভাত খেয়ে দিন কাটায়, তাকেও তার মতো শান্তিতে হজম করতে দিন।



পাঠকের মন্তব্য