ঢাকার জ্যামে বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালি অভিযান

২৮ পঠিত ... ১৮ ঘন্টা ৪৬ মিনিট আগে

 

কতকাল বোধকরি হইয়া গেল একইভাবে বসিয়া আছি! যেন অনন্তকালের প্রতীক্ষায়!

বাসটি আজ প্রায় আড়াই ঘণ্টা যাবৎ এক জায়গায় স্থির দাঁড়াইয়া আছে। মানুষের মতো উহারও জীবন টানিয়া লইতেও যেন প্রাণান্ত হইতেছে! সামনে আগাইবার না আছে উপায়, না আছে ক্ষমতা!

ক্লান্তি জীবনময়। জানলার বাহিরে দৃষ্টি মেলিয়া দিলাম। অনন্ত প্রসারিত রিকশা, সিএনজি ও প্রাইভেট কারের সারি যেন আদিগন্ত বিস্তৃত। ঠিক যেন আমার আরণ্যকের সেই লবটুলিয়া-বইহারের অন্তহীন প্রান্তর! কেবল দিগন্তজোড়া শুভ্র কাশফুলের বদলে আজ চোখে পড়িতেছে সারি সারি গাড়ির তপ্ত ধাতব ছাদ। রোদের তাপে পিচঢালা পথ হইতে যেন মরীচিকা উঠিতেছে! নিমেষেই আমি ফিরিয়া গেলাম সিংভূম জঙ্গলের সেই তপ্ত, নির্জন দুপুরের স্মৃতিতে।

কানের কাছে অবিরত যে শব্দতরঙ্গ ভাঙিয়া পড়িতেছে, কিন্তু তাহা কোনো একাকী দোয়েল বা ঘুঘুর কুহু-কাকলি নয়! শত শত হাইড্রোলিক হর্নের এক মনুষ্যসৃষ্ট তরঙ্গ। তবু উহাতেও যেন আমি এক আদিম, বন্য সিম্ফনির ঘ্রাণ পাই। চোখ বুজিলে মনে হয়, আমি যেন আফ্রিকার রিখটারসভেল্ড পর্বতের কোনো এক অজানা উপত্যকায় বসিয়া আছি, আর চারিপাশ হইতে অজানা বন্য জন্তুরা সমস্বরে আর্তনাদ করিতেছে। প্রকৃতি এখানে কতই না রুদ্র, কতই না ভয়ংকর উগ্র!

হঠাৎ জানলা দিয়া এক ঝলক হাওয়া আসিয়া আমার চোখেমুখে লাগিল। না না, বনতুলসী বা ঘেঁটুফুলের বুনো সুবাস ইহাতে নাই। পোড়া মবিল, আধপোড়া ডিজেল আর কারওয়ান বাজারের পচা মাছের এক মিশ্র গন্ধ আমার স্নায়ুকে সচকিত করিয়া তুলিল।

মানুষের ঘর্মাক্ত শরীরের গন্ধে যেন এক অদ্ভুত আদিম অরণ্যের ঘ্রাণ পাইলাম। আমার পাশের সিটে বসা মাঝবয়সী ভদ্রলোকটি পরম নিশ্চিন্তে ঘুমে ঢুলিতেছেন। মাঝে মাঝে তাঁহার মাথা আসিয়া আমার কাঁধে পড়িতেছে। তাঁহার নাসিকাধ্বনি আমাকে মনে করাইয়া দিল নির্জন রাতে তাঁবুর পাশে বয়ে চলা ইছামতীর সেই মৃদু কুলকুল ধ্বনির কথা।

ভাবিতেছি, মানুষের জীবন বড় অদ্ভুত। মহাকালের অনন্ত যাত্রায় এই যানজট তো এক ক্ষুদ্র বিন্দু মাত্র! কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের সেই অ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকার দিকে চাহিয়া ভাবি, ওখানেও কি এমন ভিআইপি মুভমেন্টের জন্য সিগন্যাল বন্ধ থাকে? নক্ষত্ররাও কি এমন ঠেলিয়া-গুঁতাইয়া বাসে ওঠে? কে জানে!

হঠাৎ হেলপারের কর্কশ কণ্ঠস্বর আমার ধ্যান ভাঙিয়া দিল,

হাতিরপুল, শাহবাগ, নামেন ভাই, সামনে জ্যাম, গাড়ি আর যাইব না!

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলিলাম। প্রকৃতির এই অপার মহিমা, এই অনন্ত স্থবিরতা উপভোগ করিবার এমন সুযোগ তো রোজ আসে না। গাড়ি না চলুক, আমি পায়ে হাঁটিয়াই রওনা হইব। কে জানে, হয়তো এই কংক্রিটের জঙ্গলের বুকেই আজ আমি নতুন কোনো ‘পথের পাঁচালী’ খুঁজিয়া পাইব।

২৮ পঠিত ... ১৮ ঘন্টা ৪৬ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top