কী ভীষণ ঠান্ডা পড়েছে আজ!
তবুও বুড়ো মানুষটি বেরিয়ে এলেন কম্বলের ভেতর থেকে। পরনের আলখাল্লার কোনাগুলোও যেন চুপিচুপি তাঁকে ফলো করছে। একেবারেই নিঃশব্দে। তিনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন, তুষারঝরা সাদা খাতা যেন প্রকৃতি! হাত নেড়ে তাঁকে কাছে ডেকে বলছে, নতুন কিছু লেখো! নতুন করে লেখো!
তিনি লেখার টেবিলে বসলেন, লিখলেনও কিছু। লেখাটা শেষ করে পেপারওয়েট দিয়ে চাপা দিলেন। শেষ হলো। এখানকার কাজ শেষ হলো! বিরাশি বছরের শরীরটা যেন আর সঙ্গ দিতে চাইছে না। কিন্তু মনটা বড্ড পালাই পালাই! তাও কি আজকাল থেকে? তিরিশ বছর হতে চলল!
‘মুক্তি চাই, মুক্তি চাই’ বলে সারাক্ষণ চেঁচানো মনটাকে নিয়ে আর কতকাল খাঁচায় বসে থাকা যায়?
পরনে সাধারণ কৃষকের একটা পুরোনো ওভারকোট, হাতে কাপড় দিয়ে বাঁধা সামান্য একটা পোঁটলা। বুড়ো শরীর, কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে এক অদম্য, পাগলাটে মুক্তির ক্ষুধা! বেরিয়ে গেলেন লিও টলস্টয়! বিশ্বসাহিত্যের এক সম্রাট!
পথে যেতে যেতে তাঁর মনে হলো, আহ! এই প্রথম যেন শুদ্ধ বাতাস ঢুকছে ফুসফুসে! এই তাহলে মুক্তির স্বাদ? এই তাহলে বন্ধনহীনতা? এটাই তাহলে শান্তি? আহ! আরাম!
তাঁর দিকে তাকালে সবাই দেখে একজন সফল মানুষকে, যিনি একদিকে বিখ্যাত একজন লেখক, অপরদিকে একজন কাউন্ট! অর্থ, খ্যাতি আর সামাজিক প্রভাব, কোনোটারই কমতি নেই যার। ইয়াসনায়া পলিয়ানা স্টেটের জমিদার! ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, আনন্দ, সবকিছু উপচে পড়ছে যার জীবনে!
কিন্তু নিজের দিকে দৃষ্টি ফেরালেই তিনি দেখেন এক নিঃস্ব, অসহায় মানুষকে, যার চারপাশে শুধুই শো-অফ, ভণ্ডামি আর অন্যকে ছোট করে দেখার প্রবণতা। তিনি যেন বাস করেন এক সোনামোড়া খাঁচায়! সোনার চাকচিক্যটাই চোখে পড়ে সবার, কিন্তু তিনি দেখেন শুধু খাঁচা!
নিজের জীবনের মোটো, অহিংসা, স্বাবলম্বিতা আর মিনিমাল লাইফ, তাঁর চারপাশে এর কিছুই নেই। এই অমূল্য রত্নগুলো তিনি দেখেছেন কৃষকদের জীবনে। তাঁদের অর্থ, খ্যাতি, প্রভাব কিছুই নেই, তবু তাঁরা শান্তির ঘুম ঘুমান! তিনিও চান এই নিঃস্বতার শান্তি, অহিংসতার শান্তি! নিজের সঙ্গে এই প্রতারণা আর সহ্য হচ্ছিল না তাঁর! ট্রেনের চলার তালে তালে তাই তিনিও চলেছেন সেই পরম শান্তির খোঁজে!
চড়েছিলেন ট্রেনের থার্ড ক্লাস বগিতে। যে কামরায় আলু-পেঁয়াজের বস্তা নিয়ে ভেজা কাপড়ে সাধারণ দিনমজুর আর কৃষকেরা যাতায়াত করে। কনকনে বাতাস বগির ফাঁকফোকর দিয়ে এসে তাঁর হাড়জিরজিরে গায়ে তীরের মতো বিঁধছিল। সঙ্গী ডাক্তার চাদর জড়িয়ে দিতে চাইলে টলস্টয় তা সরিয়ে দিলেন। মুচকি হেসে ফিসফিসিয়ে বললেন,
“অনেক বছর তো উষ্ণতায় কাটালাম, মাশোভিৎস্কি... এবার অন্তত ওদের মতো করে জমে যাওয়াটা অনুভব করতে দাও।”
কিন্তু অশীতিপর দুর্বল শরীরটা এই মুক্তির চড়া দাম দাবি করে বসল। ফুসফুসে জমে গেল মারাত্মক নিউমোনিয়া। প্রচণ্ড জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে ট্রেনের সিটে নেতিয়ে পড়লেন।
ট্রেন থামাতে হলো আস্তাপোভো নামের এক ধূলিমলিন, মানচিত্রে নাম না-থাকা ছোট স্টেশনে। তিনি কে, তা জানতে পেরে স্টেশন মাস্টার নিজ রুমে তাঁকে শুইয়ে দিলেন। খবর ছড়িয়ে পড়ল দাবানলের বেগে! ‘দ্য গ্রেট লিও টলস্টয়’ আছেন আস্তাপোভোতে! জমে গেল ওয়ার্ল্ড মিডিয়ার প্রতিনিধি, রাশিয়ার সিক্রেট পুলিশ আর হাজারো ভক্ত! স্পেশাল ট্রেনে চেপে এলেন তাঁর স্ত্রী! জানালার কাঁচের বাইরে মুখ ঠেকিয়ে চোখের জল ফেলতে লাগলেন। ভিতরের লোহার খাটে তখন মৃত্যু আর জীবনের মাঝে ঝুলছেন এক মহাপুরুষ!
জ্বরের ঘোরেও মানুষটির মনে ছিল একটাই চাওয়া! বিড়বিড় করছিলেন,
বাড়িতে আর ফেরাবে না তো?... আমাকে যেতে দাও... আমি শুধু জানতে চাই, সাধারণ কৃষকেরা কীভাবে বাঁচে, কীভাবে মরে...
২০ নভেম্বর, ১৯১০। সকাল ছ’টা বেজে পাঁচ মিনিট।
স্টেশন মাস্টারের ঘরের টেবিল ঘড়িটার কাঁটা থমকে গেল। বিরাশি বছর বয়সে ঘর ছেড়ে পালানো সেই বুড়োমানুষটি যেন পরম শান্তিতে চোখ বুজলেন। ছিলেন তিনি জমিদার, জীবনেও, পাণ্ডিত্যেও! কিন্তু মৃত্যু তাঁর কাছে এসেছিল যেন তাঁরই ইচ্ছেমতো; তিনি জীবনকে ছাড়লেন এক নিঃস্ব, গৃহহীন পথিকের মতো! ঠিক যেমনটা তিনি চেয়েছিলেন!



পাঠকের মন্তব্য