মেয়েটা পালিয়ে যাওয়ার পর আমার মাথায় প্রথম যে কথাটা এলো, ওইটা শুনলে আপনারা আমাকে পাগল ভাববেন।
আমি ভাবলাম, বাইশ বছরে আমি নিশিকে একটা দিনও মুরগির রান দিইনি।
রানটা যেত রাফির পাতে। রাফি আমার ছোট ছেলে। নিশি পেত গলার অংশটা, নয়তো পিঠের হাড্ডিওয়ালা টুকরাটা। ও কোনোদিন এ নিয়ে একটা কথাও বলেনি। আর আমিও কোনোদিন ভাবিনি যে এইখানে বলার মতো কিছু আছে।
আমরা হতদরিদ্র ছিলাম না। উত্তরায় ছিমছাম একটা বাসায় থাকতাম। ওর বাবা একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে মধ্যমসারির চাকরি করত। ফ্রিজে মাছ-মাংস থাকত প্রায়ই।
টাকার অভাবে আমি মেয়েকে কম দিয়েছি, তা না। কম দিয়েছি নিয়ম করে, ইচ্ছা করে। কারণ আমি বিশ্বাস করতাম, এইটাই ওর জন্য ভালো।
ছোটবেলা থেকে আমি ওকে একটা কথাই শিখিয়ে এসেছি। মেয়েদের এত শখ ভালো না।
ক্লাস সেভেনে স্কুল থেকে কক্সবাজার যাওয়ার ট্রিপ হলো। ওর সব বান্ধবী গেল। আমার হাতে ছিল পর্যাপ্ত টাকা। তবু বললাম, মেয়ে মানুষের এত ঘোরাঘুরি কীসের? বিয়ার পর জামাই নিয়ে যাবি।
কলেজে ওঠার পর একদিন দোকানের সামনে একজোড়া কানের দুল দেখে ও দাঁড়িয়ে গেল। বললাম, এখন না। বিয়ার সময় একবারে বানায়া দিমু।
আরেকদিন ওর বাবা দুই বাচ্চার জন্য আইসক্রিম আনল। আমি নিশিরটা ফ্রিজে তুলে রাখলাম। বললাম, মেয়ের গলা বসে যাবে। রাফি ওরটা খেয়ে ফেলল। নিশিরটা পরদিন গলে জল হয়ে গিয়েছিল।
এইগুলার একটাও আমি রাগ করে করিনি। আমি ওকে তৈরি করছিলাম।
ক্লাস নাইনে ওঠার পর আর আমাকে কিছু বলতেও হতো না। টেবিলে খাবার দিলে ও নিজেই মাছ বা মাংসের সবচেয়ে ছোট টুকরাটা তুলে নিত। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলত, আমার এইটাই ভালো লাগে।
আমার শেখানোটা এতই ভালো হয়েছিল যে মেয়েটা নিজের ভাগের অংশ নিজেই কেটে-ছেঁটে ছোট করতে শিখে গিয়েছিল। আমি ওইটার নাম দিয়েছিলাম ভদ্রতা। আত্মীয়দের কাছে গর্ব করে বলতাম, আমার মেয়ে কিচ্ছু চায় না।
আমি ওকে ভালোবাসতাম না, এইটা দুনিয়ার কেউ বলতে পারবে না। জ্বর হলে সারারাত মাথায় পানি ঢেলেছি। রেজাল্টের দিন ওর হাত ধরে স্কুলে গিয়েছি। ওর জন্য আমি সব করেছি।
শুধু একটা কাজ কোনোদিন করিনি। কোনোদিন জিজ্ঞেস করিনি, তুই কী খাবি? কোনোদিন জিজ্ঞেস করিনি, তুই কী চাস?
আমার নিজের মা আমাকে এই কথাগুলাই বলতেন। শ্বশুরবাড়ি গিয়া কত কিছু মানায়া নেওন লাগবো! এখন থাইকা অভ্যাস কর। আমি অভ্যাস করেছিলাম। আটাশ বছরের সংসারে আমি একটা জিনিসও নিজের জন্য চাইনি। সবাই বলত, রেহানা বড় লক্ষ্মী মেয়ে।
লক্ষ্মী মেয়ে মানে যে মেয়ের কোনো চাওয়া নাই।
আমি আমার মেয়েটাকেও লক্ষ্মী বানাতে চেয়েছিলাম।
পনেরো বছর ধরে আমি আলমারিতে ওর বিয়ের গয়না জমাচ্ছিলাম। শাড়ি জমাচ্ছিলাম। বলতাম, এইগুলা তোর বিয়ায় দিমু।
সবকিছু আমি ভবিষ্যতের জন্য তুলে রাখছিলাম। মেয়েটা ভবিষ্যৎ পর্যন্ত অপেক্ষা করল না।
গত এক বছর ধরে ও বদলে গিয়েছিল। ফোন হাতে নিয়ে একা একা হাসত। রাতে দেরি করে ঘুমাত। আমি ভেবেছিলাম পড়ার চাপ।
ছেলেটাকে আমি চিনতাম। আমাদের মোড়ের ওই পাশে থাকে। পড়াশোনা ছেড়েছে বছর তিনেক আগে। রাতে চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে থাকে। চোখ দুইটা সবসময় লাল।
একবার আমি ওকে ছেলেটার কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। ও শুধু বলল, তোমরা ওরে চেনো না। বাইরে থেকে দেখতে যেমনই হোক, আসলে সে মানুষ ভালো!
আমি ভেবেছিলাম মেয়েটা বেয়াদব হয়ে যাচ্ছে। এখন বুঝি, জীবনে প্রথমবার ও এমন একটা কিছু আগলে রাখছিল, যা ওর একান্তই নিজের।
শুক্রবার সকালে ওর ঘরে ঢুকে দেখি, বিছানার চাদরটা টানটান হয়ে আছে। বালিশ ঠিক জায়গায়। টেবিলের ওপর একটা কাগজ।
সেখানে লেখা, ‘আম্মু, আমি রনির সাথে চলে যাচ্ছি। আমাকে খুঁজো না। খুঁজে লাভ নাই।’
আমার মেয়েটা পালিয়ে যাওয়ার আগেও নিজের বিছানাটা গুছিয়ে রেখে গেছে।
তিন দিন পর ওর এক বান্ধবী এলো। মেয়েটা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থেকে বলল, আন্টি, একটা কথা বলব? রাগ করবেন না।
আমি বললাম, বলো।
ও বলল, ছেলেটা প্রথম দিন নিশিকে একটা রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়েছিল। মেনুটা এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি কী খেতে চাও?
নিশি উত্তর দিতে পারেনি আন্টি। ও কাঁদতে শুরু করেছিল। রেস্টুরেন্টের মধ্যে, সবার সামনে।
নিশি পরে আমাকে বলেছিল, জীবনে কেউ ওকে এই প্রশ্নটা করে নাই।
ছেলেটা ওকে কিছুই দেয়নি। একটা দুলও না, একটা জামাও না। ছেলেটা খালি বলত, তুমি যা চাইবা, তাই হবে।
বাইশ বছরে ওই একটা কথাই ওর কানে ঢুকেছিল। গেঁথে গিয়েছিল মনে।
যে মেয়ে সারাজীবন কম পেয়ে এসেছে, তার সামনে কেউ হাত ভরে কিছু বাড়িয়ে ধরলে সে যাচাই করতে যায় না। সে খালি হাতটা ধরে ফেলে।
সেদিন বিকেলে আমি ওর আলমারি খুললাম। সব জামা ভাঁজ করা, গোছানো। এক কোণায় একটা শপিং ব্যাগ পড়ে আছে।
তিন বছর আগে চাচাতো বোনের বিয়েতে আমি ওকে একটা জামা কিনে দিয়েছিলাম। প্রাইস ট্যাগটা তখনও খোলা হয়নি।
আমি বলেছিলাম, এখন পরিস না, নষ্ট হইবো। ভালো কোনো অনুষ্ঠানে পরিস।
তিন বছরে ভালো কোনো অনুষ্ঠান আর আসেনি।
রাফি রাতে আমার পাশে এসে বসল। অনেকক্ষণ পর বলল, আম্মু, আপু একদিন আমারে জিজ্ঞেস করছিল, ভাইয়া, তুই চাইলেই পাস ক্যান?
তুই কী উত্তর দিছিলি?
কইছিলাম, জানি না তো! তারপর ভুইলা গেছিলাম।
ভেবেছিলাম, কম চাইতে শেখালে মেয়েটা সুখী হবে। আমি বুঝিনি, কম চাইতে শিখলে মানুষ কম পেয়েই খুশি হয়ে যায়। আর যে কম পেয়ে খুশি হয়, তাকে ঠকানো সবচেয়ে সহজ।
মেয়েটা ভালোবাসা চিনল না। চিনবে কীভাবে? ভালোবাসা দেখতে কেমন হয়, ওইটা তো আমি ওকে নিজের ঘরেই দেখাতে পারিনি।
রাতে খাবার টেবিলে বসে আমি চারটা প্লেটে ভাত বেড়ে ফেললাম।
রাফি কিছু বলল না। ওর বাবাও না। চার নম্বর প্লেটটা টেবিলের ওই মাথায় খালি পড়ে রইল।
আমি রানটা তুলে ওই প্লেটের ওপর রাখলাম।
তত দিনে বাইশটা বছর কেটে গেছে।



পাঠকের মন্তব্য