আমার নাম সোফিয়া নর্ডগ্রেন। আমার জন্ম বাংলাদেশে

পঠিত ... ১ ঘন্টা ৪৮ মিনিট আগে

 

 

আমার নাম সোফিয়া নর্ডগ্রেন। আমার জন্ম বাংলাদেশে।

১৯৭৬ সালে, তখন আমার বয়স প্রায় দুই বছর, আমাকে দত্তক নিয়ে সুইডেনে চলে যাওয়া হয়। তার আগে ঢাকার মিশনারিজ অব চ্যারিটির একটি চাইল্ড হোমে আমার দিন কাটছিল।

সুইডেনে আমার শৈশব কেটেছে ডালার্নার ছোট্ট এক গ্রামে। যার চারপাশে ছিল লাল কাঠের বাড়ি, বন আর খোলা মাঠ।

আমার পালক বাবা শিকার করতেন, নার্সারিতে কাজ করতেন। মা ছিলেন গৃহিণী, পরে ক্যাশিয়ার। তাদের নিজেদেরও একটা মেয়ে ছিল, আমার চেয়ে তিন বছরের বড়।

আমার বোন ছিল শান্ত, বইপড়ুয়া। আর আমি ছিলাম ঠিক তার উল্টো। বাস্কেটবল, অ্যাথলেটিক্স, জ্যাজ ডান্স, গিটার, সবকিছুতেই ছিল আমার প্রবল আগ্রহ।

বাইরে থেকে দেখলে আমার শৈশব হয়তো সুন্দরই মনে হবে। কিন্তু আমার গল্পের ভেতরটা অন্যরকম ছিল।

আমি ছিলাম সেই বাদামি মেয়েটি।

কারণ আমাদের এলাকায় আমার মতো দেখতে শিশু খুব কম ছিল। স্কুলে বহুবার আমাকে বর্ণবাদী গালাগালি শুনতে হয়েছে।

কেউ অযাচিতভাবে আমার চুলে হাত দিত, কেউ অদ্ভুত সব প্রশ্ন করত, কেউ শুধু আমার গায়ের রঙের জন্য আমাকে আলাদা করে দেখতো।

এমনকি কখনো কখনো এসব আমার মায়ের সামনেও হয়েছে। যদিও তিনি বেশিরভাগ সময়ে চুপ করে থাকতেন।

সেই বয়সে ওনার এই নীরবতার অর্থ বুঝতাম না। শুধু বুঝতে পারতাম, এই যুদ্ধে আমি একা।

আমাদের বাড়ির ভেতরেও সবসময় নিরাপদ বোধ করতাম না। মা প্রায়ই আমার সঙ্গে ঝগড়া করতেন, এমন কিছুর জন্যও দোষ দিতেন যা আমি করিনি।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় ছিল, আমি তাঁকে আমার বোনের সঙ্গে একই রকম আচরণ করতে দেখতাম না।

আমি খেলতাম, প্রতিযোগিতায় অংশ নিতাম। কিন্তু বাবা-মা খুব কমই দেখতে আসতেন।

মা আমাকে গাড়ি চালানোর প্র‍্যাকটিস করতে দিতেন না। অথচ আমার বড় বোনকে ঠিকই দিয়েছিলেন।

শিশুরা এসবের হিসাব রাখে না। কিন্তু তারা অনুভব করে, বুঝতে পারে। আমিও অনুভব করতাম, আমার জায়গাটা যেন একটু আলাদা।

আবার চলে যাও

বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর আমার বোন মায়ের সঙ্গে থেকে গেলো। ওদিকে আমার জীবন হয়ে গেল অনিশ্চিত।

কখনো থাকি বাবার কাছে, কখনো মায়ের কাছে। রাগ বা ঝগড়া হলে মা কখনো বলতেন, জিনিসপত্র গুছিয়ে বাবার কাছে চলে যাও।

আমি চলে যেতাম।

কয়েক সপ্তাহ, কখনো কয়েক মাস পর আবার বলা হতো, এখন ফিরে আসতে পারো।

একটা বাচ্চাকে বারবার ঘর থেকে বের করে দিলে সে শুধু ঘর হারায় না। ঘরের ভেতরে নিজের মূল্য নিয়েও সন্দেহ করতে শেখে।

মা কি আমাকে ভালোবাসেন?

আমি কী ভুল করেছি?

আমি কি যথেষ্ট ভালো নই?

এসব প্রশ্ন আমার ভেতরে থেকে গেল।

আমি শিখলাম মানিয়ে নিতে। নিজের কথা চেপে রাখতে। অন্য মানুষ কী চায়, তা আগে বুঝতে। ঝামেলা এড়িয়ে চলতে।

অনেক পরে বুঝেছি, শৈশবের এসব শিক্ষা বড় হয় আমাদের সঙ্গে। আত্মবিশ্বাস, সম্পর্ক আর নিজের অনুভূতিকে বিশ্বাস করার ক্ষমতার ভেতর তারা জায়গা করে নেয়।

আমার মা কে?

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দত্তক হওয়ার প্রশ্নটাও বড় হতে লাগল। আমি কে? কোথা থেকে এসেছি? কেন আমাকে আমার প্রথম পরিবার থেকে আলাদা করা হয়েছিল?

আমার কাগজপত্রে একটি উত্তর ছিল, আমার জন্মদাত্রী মা মারা গেছেন। আমি সেটাই বিশ্বাস করতাম।

১৯৯৯ সালে নার্সিংয়ের প্রশিক্ষণ শেষ করে স্টকহোমে নিজের একটা জীবন গড়ে তুলছিলাম। এই সময়ে কী মনে করে কিছু টাকা জমিয়ে বাংলাদেশে ফিরে এলাম।

আমি বাংলা একদমই জানতাম না। কাগজপত্রে দেওয়া ঠিকানা ধরে এর সাহায্য নিয়ে এক গ্রামীণ এলাকায় গেলাম। কিছুদিন খোঁজাখুঁজি করলাম।

তারপর একদিন একজন অচেনা নারীকে আমার সামনে এনে দাঁড় করানো হলো।

কেউ একজন আমাকে এসে বলল, এই তোমার মা।

আমি তো হতবাক। আমার মা না মারা গেছেন! কিন্তু এই মহিলা তাহলে কে? তিনি কি সত্যিই আমার মা?

তখন DNA পরীক্ষা করার সুযোগ ছিল না। ভাষাও জানতাম না। অন্যের কথা আর অনুবাদের ওপর নির্ভর করেই আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত কোনো কিছু না শেষ করেই সুইডেনে ফিরে এলাম। কিন্তু সঙ্গে করে নিয়ে গেলাম নতুন একটি প্রশ্ন, যদি তিনি সত্যিই আমার মা হন?

প্রশ্নটি আমার সঙ্গে রয়ে গেল আরও বহু বছর।

নিজের জীবন

এদিকে আমার জীবন কিন্তু থেমে থাকেনি।

ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি নার্স হিসেবে কাজ করেছি। পরে লেখক ও পাবলিক স্পিকার হয়েছি। সুইডিশ টেলিভিশনে গিয়েছি, স্ট্যান্ড-আপ করেছি, নিউইয়র্ক ও বেলগ্রেডে গিয়ে কথা বলেছি।

আমি নিজের একটা আলাদা জগত তৈরি করতে পেরেছিলাম। তবু আমার ভেতরের সেই ছোট মেয়েটি কখনো হারিয়ে যায়নি। সে শুধু অপেক্ষা করেছে।

২০২৪

২০২৪ সালে আমার পালক বাবা ও মা দুজনেই মারা গেলেন। মাত্র দশ দিনের ব্যবধানে।

শোকের সঙ্গে পুরোনো অনেক স্মৃতিও ফিরে এল, ভালোবাসা আর কষ্ট, দুটোই।

আর বাংলাদেশের কোথাও একজন বৃদ্ধা নারী তখনও বেঁচে ছিলেন। তিনি হয়তো আমার মা।

এটা আমাকে নিশ্চিত হতেই হবে।

সত্য

২০২৫ সালে আমি দুইবার বাংলাদেশে গেলাম।

এবার কারও কথায় বিশ্বাস করতে চাইনি। DNA পরীক্ষা করালাম। ফলাফল এল।

ওই মহিলা-ই আমার মা। আমার জন্মদাত্রী মা।

তিনি মারা যাননি। তিনি বেঁচে ছিলেন। অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে।

আমি জানতাম না তিনি কোথায়। তিনি জানতেন না তাঁর মেয়ে কোথায়।

সত্যটা জানার পর মনে হলো, জীবনের একটা দরজা খুলে গেছে। কিন্তু ভেতরে ঢুকে দেখলাম, সেখানে আরেকটি দরজা।

কারণ কাউকে খুঁজে পাওয়া আর হারানো সময় ফিরে পাওয়া এক জিনিস নয়।

মা ও মেয়ে

আমাদের ভাষা এক নয়। আমাদের জীবনও এক নয়।

তিনি আমাকে জীবনের পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেখেননি। আমার সুইডিশ জীবন, দত্তক হয়ে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা, আমার ভেতরের কষ্ট, এসব হয়তো তিনি কোনোদিন পুরোপুরি বুঝবেন না।

তাঁর বয়স হয়েছে। স্বাস্থ্যও ভালো নয়। সম্ভবত তিনি কোনোদিন সুইডেনে এসে আমার জীবন দেখতে পারবেন না।

এই সত্যের মধ্যে এক ধরনের আনন্দ আছে। আবার দুঃখও আছে। আবার কখনো প্রচণ্ড রাগও হয়।

কারণ হারিয়ে যাওয়া পঞ্চাশ বছর কি শুধু DNA-এর মিল দিয়ে ফেরানো যায়?

কোথায় আমার বাড়ি?

বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি। সুইডেন আমার জীবন।

কিন্তু জন্মভূমি মানেই ঘর নয়। আর যেখানে সারাজীবন কাটিয়েছি, সেটিও সবসময় নিঃশর্ত আপন মনে হয় না।

কখনো কখনো দুটি ছবির কথা আমার মনে হয়।

সুইডেনে আমার পালক বাবা-মায়ের সঙ্গে তাঁদের বায়োলজিক্যাল মেয়ের একটা ছবি।

আরেকদিকে বাংলাদেশে আমার জন্মদাত্রী মায়ের সঙ্গে তাঁর আরেক মেয়ের অন্য একটা ছবি।

দুটি পরিবার।

দুটি দেশ।

দুটি ছবি।

কিন্তু কোনো ছবিতেই আমি নেই।

আমার সেই একটি ছবির অভাব আছে, যে ছবির দিকে তাকিয়ে কেউ প্রশ্ন করবে না, আমি কে ওই ছবিতে?

যেখানে আমাকে ব্যাখ্যা করতে হবে না, কেন আমি ওখানে। যেখানে আমার জায়গাটা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকবে না।

এজন্য মাঝেমধ্যে নিজেকেই জিজ্ঞেস করি, পরিবারের ছবিতে আমি কোথায়?

শেষ কথা

আমার জন্মদাত্রী মাকে খুঁজে পাওয়া আমার জীবনের একটি অন্যতম সত্য ঘটনা।

কিন্তু শুধু রক্তের সম্পর্ক মানুষকে ঘর এনে দেয় না। DNA হয়তো বলতে পারে কে আমার মা।

কিন্তু DNA এটা বলতে পারে না, একটি মা ও মেয়ের মাঝখান থেকে পঞ্চাশ বছর কীভাবে হারিয়ে গেল।

এখন আমি জানি, আমার গল্পের কোনো একটিমাত্র শেষ নেই।

একটি অংশ বাংলাদেশে। একটি সুইডেনে।

একটি আমার পালক পরিবারের স্মৃতিতে। আর একটি অংশ সেই ছোট্ট মেয়েটির মধ্যে, যে সারাজীবন শুধু একটা নিরাপদ জায়গা খুঁজেছে নিজের জন্য।

আজ আমি আর সেই জায়গাটা অন্য কারও হাতে খুঁজি না। আমি নিজেই নিজের জন্য সেটি বানাতে চাই।

কারণ একটা সময় বুঝেছি, পরিবারের ছবিতে আমার জায়গা না থাকলেও, আমার জীবনের ছবিতে আমার জায়গাটা কেউ মুছে দিতে পারবে না।

ওখানে আমি কারও হারানো সন্তান নই। ওখানে আমি কারও অসম্পূর্ণ গল্প নই।

আমি সোফিয়া।

আমার গল্পের প্রতিটি টুকরো, বাংলাদেশ, সুইডেন, দত্তক হওয়া, হারিয়ে যাওয়া, খুঁজে পাওয়া, ভালোবাসা, রাগ, কষ্ট আর ক্ষমা, সব মিলিয়েই আমি।

হয়তো এতদিন আমি একটা পরিবারের ছবিতে নিজের জায়গা খুঁজছিলাম।

আজ বুঝি, আমাকেই আমার ছবিটা আঁকতে হবে।

আর সেই ছবিতে, প্রথমবারের মতো, আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি।

পঠিত ... ১ ঘন্টা ৪৮ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top