দ্রৌপদীদের একাল-সেকাল

পঠিত ... ২ ঘন্টা ৫৫ মিনিট আগে

আমি দ্রৌপদীকে দেখলাম।

মহাভারতের রানী। কৌরব-পাণ্ডবদের মধ্যে চলছে পাশা খেলা। হেরে গেলেন যুধিষ্ঠির। বাজি ধরতে ধরতে সবশেষে বাজি রাখলেন পাঁচ ভাইয়ের স্ত্রী দ্রৌপদীকে। হারলেন আবারও। কৌরবদের বিচারে দ্রৌপদী তখন আর রানী নন, জাস্ট একজন দাসী!

চুল ধরে হিঁচড়ে তাকে আনা হলো ভরা রাজদরবারে। টেনে খোলার চেষ্টা করা হলো তাঁর বস্ত্র। সেখানে ছিলেন সবাই—জ্ঞানী, বীর, মুরব্বি, এমনকি তাঁর স্বামীরাও। কিন্তু এগিয়ে এলেন না কেউ। দয়া করলেন শ্রীকৃষ্ণ। বস্ত্রহারা হতে হলো না তাঁকে। প্রতিজ্ঞা করলেন তিনি—যার হাতে তাঁর অপমান হয়েছে, তার রক্তে চুল না ধুয়ে আর চুল বাঁধবেন না। বাঁধেনওনি।

একে তো তিনি ছিলেন রাজকন্যা, তার ওপর মহাযজ্ঞের আগুন থেকে জন্ম। শক্তিমতী, স্বাবলম্বী ছিলেন। কিন্তু সমাজের ব্যবহার তাঁর সঙ্গেও ছিল এক সাধারণ অসহায় নারীর মতোই।

এ তো গেল পুরাণের কথা।

কিন্তু আবার দেখলাম আরেক দ্রৌপদীকে। মহাশ্বেতা দেবীর দ্রৌপদী। সবাই তাকে ডাকে ‘দোপদি মেঝেন’। জাতে সাঁওতাল। বড় সাধারণ এক নারী। জোতদারদের বিরুদ্ধে নিজের জাতির পানির অধিকার আদায়ের লড়াই তাঁর। স্বামীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই সেই সংগ্রাম। কিন্তু এই সর্বহারাদের তো জিততে দেবে না শোষকগোষ্ঠী। তাই শক্তি খাটিয়ে ধরে ফেলে তারা স্বামী-স্ত্রীকে। স্বামী দুলনাকে হত্যা করে, আর দোপদিকে ধরে আনে। সারারাত চলে গণধর্ষণ। এখানেই তো কাবু হয়ে যাওয়ার কথা!

কিন্তু না! নাম যে তাঁর দ্রৌপদী!

সকালে যখন সেনাকর্তার সামনে দাঁড় করানোর জন্য তাঁকে কাপড় পরতে বলা হয়, তিনি অস্বীকার করেন। কাপড় পরেন না। নিজের ক্ষতবিক্ষত, নগ্ন শরীর নিয়েই দাঁড়িয়ে যান সেনাকর্তার সামনে। তাঁর নারীত্বই হয়ে ওঠে তাঁর প্রতিবাদের ভাষা। কাপড় পরতে বলা হলে তিনি সেনাকর্তার গায়ে থুথু ছুড়ে বলেন—

‘তোরা কাপড় পরাবি? মেলা মর্দ তোরা! কাপড় পরাবি কি? ইখানে কোনো মর্দ আছে যে আমাকে কাপড় পরাবে?’

দিন বদলেছে। পাণ্ডবরানী নিজের নারীত্ব বাঁচাতে বস্ত্র আঁকড়ে ধরেছিলেন, আর সাঁওতাল মেয়ে সেই বস্ত্রের প্রয়োজনকেই পায়ে মাড়িয়ে গেল। কিন্তু জিতল সে-ই। তাকে দেখে ভয় পেল ক্ষমতাধরেরা। হারাবার তো কিছুই নেই তার। তাই সহজেই বলতে পারল—

‘দুলনাকে তোরা মারলি, এখন দোপদিকে মারবি? মেঝেন মেয়ে ভয় পায় না রে। ল্যাংটা শরীর দেখে কিসের এত ডর তোর?’

এবার দেখলাম আরেক দ্রৌপদীকে। এই তো দিন তিনেক আগে। এবার কার দ্রৌপদী? ভারতেরই। দেখলাম তাঁকে ইন্টারনেটে। একা দুহাতে আটকে দাঁড়িয়ে আছেন একটি প্রিজন ভ্যান।

এই একই ছবি আমরাও দেখেছিলাম আমাদের '২৪-এ। আমাদেরই কোনো আপনজন—কারও বোন, কারও মেয়ে, কারও সহপাঠী, কারও সহযোদ্ধা—ছিলেন সেই দ্রৌপদী। এমনই এক জালিম দানবের গাড়িকে দুহাত দিয়ে ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। কিছু তো ছিল এই দ্রৌপদীদের! এত শক্তিধর শোষকশ্রেণিরও সাহসে কুলায়নি সেই হাত মাড়িয়ে সামনে এগোতে।

দিন তো আরও অনেক বদলেছে। সঙ্গে বদলেছে দ্রৌপদীদের আচরণ, প্রতিবাদের ভাষা। আমরা যুগে যুগে দেখে যাব দ্রৌপদীদের নানা রূপ।

কথায় কথায় এটা বলা হয়নি—‘দোপদি মেঝেন’-এর স্রষ্টা মহাশ্বেতা দেবী নিজেও ছিলেন দ্রৌপদীদের কাতারে। সারাজীবন নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়ে নিজেকে বিজয়িনী রেখেছিলেন তিনি। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা।

সাধারণের ভেতরে অসাধারণ সব জানা-অজানা দ্রৌপদীদের প্রতি সালাম।

 

পঠিত ... ২ ঘন্টা ৫৫ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top