আমি কেন আর কোনোদিন দাড়ি কাটিনি

১০ পঠিত ... ১১ ঘন্টা ৩ মিনিট আগে

(ডিসক্লেইমার: eআরকিতে প্রকাশিত এই লেখাটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। লেখার কোনো অংশকে কেউ ঐতিহাসিক সত্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী বা তাঁর প্রকৃত বক্তব্য বলে বিশ্বাস করলে, সেটি একান্তই তাঁর নিজস্ব ব্যাপার। এ বিষয়ে eআরকি বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—কারোরই কোনো দায় নেই।)

আমার জন্ম এক সন্ধিক্ষণে। শেষরাতের সেই স্তব্ধ প্রহর, যখন অন্ধকারের বক্ষ চিরে আলোর উন্মেষ ঘটে—ঠিক সেই শুভক্ষণে জোড়াসাঁকোর এই সুবিশাল জঠরে আমার আবির্ভাব। শৈশব কেটেছে ভূত্যরাজের কড়া শাসনে, একপ্রকার বন্ধ খাঁচার বন্দিদশায়।

যৌবনের প্রারম্ভে আমার চিবুকে আড়ম্বরপূর্ণ কোনো দাড়ি ছিল না। কেবল পরিপাটি করে ছাঁটা একজোড়া গোঁফই ছিল আমার মুখমণ্ডলের প্রধান অলংকার। মৃণালিনীর সঙ্গে যখন শুভপরিণয় সম্পন্ন হলো, তখনও আমার অবয়ব ছিল এক দাড়িহীন সুপুরুষ তরুণের।

অতঃপর, বয়স যখন জীবনের ছাব্বিশ কিংবা সাতাশের কোঠায় পৌঁছাল, মনান্তরে এক বিচিত্র খেয়াল চাপল। সিদ্ধান্ত নিলাম, এবার সুদীর্ঘ দাড়ি প্রসাধন করব।

কেন এই স্পর্ধা? কোনো বৈরাগ্য কিংবা আধ্যাত্মিক ভাবালুতা থেকে কিন্তু এই রূপান্তর ঘটেনি।

প্রকৃতপক্ষে, যে সৌন্দর্য উন্মুক্ত এবং অতি সহজে পাঠযোগ্য, সমাজ তাকে অতি সাধারণ মনে করে তুচ্ছ জ্ঞাপন করে। মুখচ্ছবি যদি খোলা বইয়ের ন্যায় সবার সামনে প্রকট থাকে, তবে তাকে জানার কোনো ব্যাকুলতা অন্তরে অবশিষ্ট থাকে না। আমার মনে হলো, আমার ভেতরের কাব্যিক ব্যক্তিত্বের প্রচ্ছন্নতার জন্য একটি অন্তরালের প্রয়োজন। মুখের ওপর এক মায়াবী আবরণের উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি।

দাড়ি যখন সবেমাত্র দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে, সেই সময়ে বোম্বাই শহর থেকে এক অচেনা অনুরাগিণী মহিলার পত্র হস্তগত হলো। তিনি অত্যন্ত ব্যথিত চিত্তে অনুরোধ জানালেন—আপনি অবিলম্বে এই দাড়ি অপসারণ করুন। আপনাকে ইহাতে জঘন্য ও শ্রীহীন দেখাইতেছে।

পত্রখানি পাঠ করে মনে মনে কৌতুক বোধ করলাম। মনে মনে সংকল্প করলাম—না, এই দাড়ি আর কোনোদিন কর্তন করব না। যে বস্তু মানুষের দৃষ্টি বিভ্রান্ত করে এবং সাধারণকে লেখনী ধারণে বাধ্য করে, তাহার নিশ্চয়ই এক রূপান্তরের শক্তি রহিয়াছে।

ধীরে ধীরে কাঁচা-পাকা কেশরাশি দীর্ঘ রূপ ধারণ করল। জোড়াসাঁকোর প্রশস্ত অলিন্দে দাঁড়িয়ে যখন বাতাসের পরশে দাড়ি দোল খেত, আমি অনুভব করতাম—জগৎ আর কেবল সাধারণ এক রবীন্দ্রনাথকে দেখছে না, তারা প্রত্যক্ষ করছে এক পরম রহস্যময় অবয়ব।

দাড়ি যখন বক্ষস্পর্শী রূপ ধারণ করল, উপলব্ধি করলাম—ইহা কেবল অঙ্গের কতিপয় রোমকূপের সমষ্টি নয়, ইহার একটি নিজস্ব ব্যক্তিসত্তা ও গাম্ভীর্য রহিয়াছে। কোনো এক অদৃশ্য শিল্পী যেন আমার চিবুকতলে এক অপার্থিব মায়াজাল বিস্তার করে চলেছে।

মনুষ্য চিত্তের স্বভাব বড়ই বিচিত্র। যা অনাবিষ্কৃত ও দুর্গম, তার প্রতি মানবজাতির আকর্ষণের অন্ত নেই। একজন মসৃণ গালবিশিষ্ট যুবকের বাণী লোকে যেভাবে অবহেলায় শ্রবণ করে, সেই একই বাণী যখন এক দীর্ঘ ও সুবিন্যস্ত ধবল দাড়ির আড়াল থেকে নির্গত হয়, তখন বিশ্ববাসী থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হয়। তাদের কৌতূহলী নেত্রে বিস্ময় ফুটে ওঠে।

এই আড়াল আমাকে এক পরম মনস্তাত্ত্বিক শান্তি এনে দিয়েছিল। আমার দীর্ঘশ্বাস, আমার মৃদু হাস্য, কিংবা আমার অন্তরের গভীর বিষাদ—সবকিছুই এই ঘন অরণ্যতুল্য আড়ালের অন্তরালে নিরাপদ সুষুপ্তিতে ঢাকা থাকত। বহির্বিশ্ব কেবল আমার এক প্রশান্ত গম্ভীর মুখচ্ছবি দর্শন করত, কিন্তু ভেতরের আলোড়নের সংবাদ সে পেত না। রূপের এই রহস্যময়তাই আমার চিত্ত হরণ করেছিল।

তবে কেবল বাসনা থাকলেই তো চলে না, এই প্রকাণ্ড কেশরাশির পরিচর্যাও এক দুরুহ কর্ম। শান্তিনিকেতনের ধুলোবালি ও রৌদ্রতাপে ইহাকে সুসজ্জিত রাখা কোনো সহজ ব্যাপার ছিল না।

অদ্য একটি নিভৃত সত্য প্রকাশ করি। আধুনিক সুশীল সমাজ হয়তো বিবিধ কৃত্রিম সুগন্ধি কিংবা তৈল ব্যবহারে অভ্যস্ত, কিন্তু আমার পদ্ধতি ছিল সম্পূৰ্ণ শান্তিনিকেতনি ও ঘরোয়া।

প্রত্যুষে উঠেই রিঠা ভিজানো জলে দাড়ি প্রক্ষালন করতাম। আর ইহার মসৃণতা ও উজ্জ্বলতা বজায় রাখার জন্য নিয়মিত ব্যবহার করতাম খাঁটি সর্ষে বাটা। ক্ষেত্রবিশেষে সেই সর্ষে বাটার সাথে মসুর ডাল বাটা মিশ্রিত করে এক বিশেষ প্রলেপ প্রস্তুত হতো—যাতে চর্ম ও দাড়ি উভয়ই নমনীয় ও কান্তিময় থাকে।

দাড়িতে করতল বুলাতে বুলাতে যখন উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়াতাম, বাতাসের দোলায় যখন সেই কেশরাশি আন্দোলিত হতো—তখন মনে হতো, বিধাতা কবির হস্তে কেবল লেখনী তুলে দিয়েই ক্ষান্ত হননি, অবয়বের মধ্যেও খানিকটা অলৌকিক সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছেন।

দাড়ির সৌন্দর্য পূর্ণতা লাভ করে তখনই, যখন তাহার সহিত পোশাকের এক অপূর্ব সামঞ্জস্য ঘটে।

প্রথমাংশে আমিও ধুতি-পাঞ্জাবি এবং বিলাতি কোট-প্যান্ট পরিধান করেছি। কিন্তু বয়সের ভার যখন বৃদ্ধি পেল, যখন জোড়াসাঁকোর ইটের খাঁচা ত্যাগ করে শান্তিনিকেতনের ধূলিময় খোয়াইয়ের পথ ধরে হাঁটতে শুরু করলাম, তখন বুঝলাম—এই শক্ত কলার বা আড়ষ্ট ওয়েস্টকোট আমার মুক্ত ভাবনার প্রতিবন্ধক। কবির আত্মা ঢিলেঢালা, সুতরাং তাহার পরিধেয় বস্ত্রও হওয়া উচিত বাতাসের ন্যায় অবারিত।

সেই তাগিদ থেকেই গ্রহণ করলাম সুদীর্ঘ জোব্বা বা আলখেল্লা।

জাপানের কিমোনো আর তিব্বতের লামাদের পরিধেয় বাকুর সমন্বয়ে আমি নিজস্ব এক পোশাক শৈলী তৈরি করলাম। ভেতরে বুকঢাকা কুর্তা, আর তাহার ওপর পরিহিত কাঁধ থেকে একদম পদযুগল স্পর্শকারী দীর্ঘ আলখেল্লা। কখনো শুভ্র, কখনো পীত, আবার কখনো বা বর্ষার মেঘের ন্যায় ধূসর।

একবার বিলেতের এক রাজকীয় নৈশভোজে উপস্থিত হয়েছিলাম। চতুর্দিকে তৎকালীন অভিজাতবর্গ আড়ষ্ট বিলাতি স্যুটে সজ্জিত হয়ে বিরাজ করছিল। সেই জনসমুদ্রের মাঝে আমি গিয়ে দাঁড়ালাম আমার ঢোলা রেশমি আলখেল্লা আর বক্ষজোড়া ধবল দাড়ি নিয়ে। উপস্থিত সকলেই বিস্ময়বিমূঢ় নেত্রে চেয়ে রইল। কেউ একজন ফিসফিস করে বলে উঠল—ইনি কি প্রাচ্যের কোনো প্রাচীন ঋষি, নাকি বাইবেলের কোনো জ্যান্ত চরিত্র?

অন্তরে ঈষৎ হাস্য সংবরণ করলাম। ফ্যাশন তো সাময়িক মুখচ্ছবি, আর নিজস্ব শৈলীই হলো মানুষের চিরন্তন পরিচয়। আমার এই ঢোলা জোব্বা আর সুদীর্ঘ দাড়িই হয়ে উঠেছিল আমার পরম সত্তা—যা আমাকে সাধারণের কোলাহল থেকে এক স্বতন্ত্র মহিমায় পৃথক করে রাখত।

জীবনের অন্তিম লগ্নে পৌঁছে যখন ব্যাধিগ্রস্ত হলাম, তখন চিকিৎসকের প্রয়োজনে একবার আমার দাড়ি সামান্য ছাঁটাই করা হয়েছিল। দর্পণালয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে সেদিন পরম অচেনা মনে হয়েছিল নিজেকে। মনে হয়েছিল, মুখচ্ছবি যেন রিক্ত হয়ে গিয়েছে, আমার সারাজীবনের কাব্যময় আবরণের কিয়দংশ যেন কে ছিনিয়ে নিয়েছে!

আজ পশ্চাতে ফিরে তাকালে অনুধাবন করি—আমার দাড়ি কিংবা জোব্বা, কোনোটাই লোকদেখানো কোনো পরিকল্পিত নাটকের অংশ ছিল না। জীবনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় এক সাধারণ বাঙালি তরুণ যেভাবে অন্তরের সত্যকে আবিষ্কার করে, আমার এই রুপালি দাড়ি ও ঢোলা আলখেল্লা ছিল কেবল সেই সত্যেরই বাহ্যিক প্রকাশ।

আলো ও ছায়ার এই বিচিত্র লীলা অদ্য সমাপ্ত হলো। যবনিকাপাত ঘটল।

১০ পঠিত ... ১১ ঘন্টা ৩ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top