লালমাই পাহাড়ের বোটানিক্যাল সাইড না, সানন্দার চিপা জঙ্গলে ঘটনাটা ঘটছে।
তেরো বচ্ছরের পোলা। নামটা ভারী। ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। ক্লাসে পড়ে সেভেনে, অথচ ওঠাবসা চালচলন সগগলেই বাইশ-পঁচিশের গ্যাং চিলারের লগে। টিকটকে সাড়ে চার হাজার ফলোয়ার, বাইকের হ্যান্ডেল ছাইড়া স্ট্যান্ট মারে, আবার বাপের লাল-নীল শার্ট পইড়া ফেসবুকে ফটোশুট হানে। পোলাপানের বুকের ভেতর একখান ‘হিরো হিরো’ খাউজানি থাকে না? ঐটাই আছিল আরকি।
কিন্তু আসল কারবার হইলো আইফোন। মায়ের আইফোনখান পকেটে পুরিয়া পোলা রওনা দিছিল পাহাড়ের দিকে। ছবি তুলবো, রিল বানাইবো।
লগে ছিল তিন কারিগর।
উনিশ বছরের তুহিন—যে আবার সিটি কলেজে পইড়া ড্রপআউট মারা ডাঁট ব্যাটা; লগে পনেরো আর ষোলোর দুই নবম শ্রেণির খুদে মাস্টার। উনারা তো আর বন্ধু না, উনারা হইলো সাইজ করার কারিগর। পোলার পকেটে লাখ টাকার অ্যাপল ব্র্যান্ড, আর এই গাবদা মালগুলার চোখে খিদের ঝিলিক।
চা-দোকানের মোড় থাইকা ফুসলাইয়া নির্জন ঝোপের ভিতর নিয়া যাওয়া হইলো। কাড়াকাড়ি, জবরদস্তি। তেরো বছরের পিচ্চিডা ভাবছিল বোধহয় দোস্তদের লগে খুনসুটি চলতাছে। কিন্তু যখন বাঁশের শক্ত লাঠিডা সটান আইসা মাথায় পড়লো, লালমাই পাহাড়ের বালুমাটি এক চোট লাল হয়া গেল।
ফোন উদ্ধার হইছে, মার্ডারাররা ধরা খাইছে, পুলিশও কেস ক্লিয়ার লাল ফিতা বাইন্ধা দিছে। কিন্তু কথা তো অন্য জায়গায় ভাই। ফোনের লোভে পোলার মাথা ফাটায়া মারাটা তো আসল সিন না; আসল সিন হইলো—আমরা কোন জংলা জমানায় পইড়া আছি, যেখানে তেরো বচ্ছরের একটা ছাওয়াল আইফোনের লোভে লাশ হয়া জঙ্গলে পইড়া থাকে?!
২
আমরা তো খালি পেপারে পড়ি—কিশোর গ্যাং। জিনিসটা কী ভাই? জিনিসটা হইলো পাড়া-মহল্লার উঠতি রসিক চ্যাঙ্গাদের একখান বিচিত্র কারবার। বয়স চোদ্দ থাইকা বিশের চিপায়, কিন্তু ডাঁটখানা খাস চম্বল উপত্যকার ডাকাত সর্দারদের মতো! মোড়ের চা-দোকানে বইসা ধোঁয়া ছাড়া, বাইক নিয়া প্যাঁ-প্যাঁ সাইরেন বাজানো, আর ফেসবুকে ‘ডন’, ‘কিং’, ‘রয়েল’ লেখা কভার ফটো মারা—এই হইলো প্রাথমিক সিলেবাস।
কুমিল্লার শহরটারেও এই কারিগররা গিলা খাইতাছে। রয়্যাল গ্যাং স্টার, ইগল, রতন গ্রুপ—নাম শুনলে মনে হইবো হলিউডের কোনো নেটফ্লিক্স সিরিজ চলতাছে! বাস্তবে এডি হইলো এলাকার কিছু ঝরে পড়া, ফাঁকিবাজ, ফালতু পোলার গ্যাং। রাজনীতিওয়ালার ছায়া আছে, পাড়ার বড় ভাইদের বখরা আছে, আর আছে হাতের মুঠায় সস্তা গ্যাঞ্জা আর স্মার্টফোন।
অপ্রতিম পোলাডার কথা চিন্তা করেন। তেরো বচ্ছরের বাচ্চা। তার চোখে এই গ্যাংয়ের বড় ভাইরা আছিল একেকটা জ্যান্ত ‘সুপারহিরো’। বড় ভাই বাইক টান দেয়, বড় ভাই পকেটে চাকু রাখে, বড় ভাইরে সবাই ডরায়! তো তেরো বছরের অবোধ ছাওয়ালের তো মনে হইতেই পারে, এই ভাইদের সাথে হাঁটলে আমারেও সমাজ ডরাইবো! সে তো আর জানত না, এই ডর দেখানের বেপারটাই একদিন তারে লালমাইয়ের গহীন জঙ্গলে নিয়া সাইজ করিয়া দিবে।
এই যে উনিশ বচ্ছরের তুহিন, পনেরো-ষোলোর ফাহাদ আর কামরুল। এরা কি আসমান থাইকা নাজিল হইছে? না ভাই। এরা আপনার-আমার ঘরের পাশের মহল্লাতেই ডালপালা মেলছে। পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া, কোনো কাজকাম নাই, সারাদিন গ্যাং চিল মারা আর টিকটকে হিরোগিরি ফালানো। রাষ্ট্র নীরব, সমাজ বধির, অভিভাবক অন্ধ।
আর এই অন্ধত্বের সুযোগেই মোবাইল ছিনতাই এখন পুরা পুরদস্তুর ইন্ডাস্ট্রি! দিনে হাজার হাজার ফোন হাওয়া হয়া যায়। একটা আইফোন পকেটে টানা মানেই গ্যাংয়ের বড় ভাইদের কাছে এক রাতের ফুর্তি, কয়েক হাজার টাকার কেরামতি। অপ্রতিমের হাত থাইকা ফোনডা নেওয়ার সময় এই উনিশ বচ্ছরের তুহিনের হাত কিন্তু একটুও কাঁপে নাই। কারণ তার মাথার ভেতর সমাজ বা আইন কোনোটারই ভয় আছিল না, আছিল কেবল একটা অ্যাপল ফোনের লোভে জ্যান্ত ছাওয়ালরে মাটির লগে মিশাইয়া দেওয়ার হিংস্রতা।
ঘটনা কেবল এক অপ্রতিমের না, ঘটনামাত্রই দেশের আনাচে-কানাচে ছড়ানো এমন হাজারটা গ্যাংয়ের, যারা সুযোগ পাইলেই আরেকটা অপ্রতিম বানাইতে রাজি আছে।
৩
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সিসিটিভি মিলাইয়া আসামি ধরছে, ফোন উদ্ধার মারছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও প্রেস মিটে ১২ ঘণ্টার বাহবা কুড়াইয়া নিছেন; সবই কারেক্ট। কিন্তু এই যে ঘটনা ঘটার পর পুলিশি অ্যাকশন আর পত্রিকার প্রথম পাতায় কালো হরফে হেডলাইন, এইডা দিয়া কি ১৩ বছরের মরা পোলাটারে জীবিত ফেরত আনা যাইবো? সম্ভব না।
আমাদের এই জমানার সবচেয়ে বড় রোগ হইলো ‘ভিকটিম ব্লেমিং’।
পোলা কেন তেরো বছর বয়সে বাইক চালাইতো? পোলা কেন টিকটকে চার হাজার ফলোয়ার বানাইছিল? পোলা কেন এত রাতে বড় ভাইদের সাথে ঘুরতো? পোলা কেন মায়ের এত দামি আইফোন নিয়া বের হইছিল?—সামাজিক যোগাযোগের অনলাইন আদালতে এই জাতীয় ফালতু প্রশ্নের পাহাড় জমা হইয়া যাইতেছে।
কথা পরিষ্কার ভাই—প্যারেন্টিংয়ে ভুল থাকতে পারে, পোলাডা বিভ্রান্ত হইতে পারে, কিন্তু কোনো কিছুর কারণেই একটা ১৩ বছরের বাচ্চারে লাঠি দিয়া পিটায়া মাইরা ফেলার জাস্টিফিকেশন তৈয়ার হয় না। ভিকটিম ভিকটিমই। দোষটা ঐ উনিশ বছরের গ্যাংবাজ তুহিনের, দোষটা ঐ পনেরো-ষোলোর খুদে মার্ডারারগুলার, আর দোষটা এই পচা সমাজব্যবস্থার।
১৮ বছর বয়সের নিচে হইলে ‘শিশু আইন’-এর ফাঁকফোকর দিয়া পার পাওয়া যায়। এই হিসাবটা এই উঠতি মাস্তানগুলাও ভালোই জানে। গ্যাং কালচারের পেছনে যেসব পাড়ার বড় ভাই আর রাজনৈতিক নেংটি ইঁদুরেরা ছায়া দিয়া রাখে, উনাদের গায়ে কিন্তু কখনোই ডিজিটাল পুলিশের লাল আলো পড়ে না। ফলে আইনের ফাঁক গলাইয়া বের হইয়া এরা আবার দুই দিন পর মহল্লায় একই কারবার চালায়।
রাষ্ট্র যখন নিজের নাগরিকরেম বিশেষ কইরা একটা শিশুকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন মূল কোপটা আইসা পড়ে সাধারণ বাপ-মায়ের ঘাড়ে। ঘর, বাইর, স্কুল আর হাতের ওই অভিশপ্ত ডিজিটাল স্ক্রিন।এই চারডা জিনিসরে ব্যালেন্স কইরা ছাওয়ালপেলেদের বাঁচায়া রাখাটাই এখন এই জমানার সবচেয়ে বড় যুদ্ধ।
আইফোনটা পুলিশ উদ্ধার করছে ঠিকই, কিন্তু ডক্টর নাহিদা বেগমের কোলের যে তেরো বছরের ছেলেটা হারাইয়া গেল, সেই শূন্যতা উদ্ধার করার মতো কোনো নেটওয়ার্ক কিংবা ট্র্যাকিং ডিভাইস কি এই দুনিয়ার কোনো ল্যাবে তৈরি হইছে? উত্তর হইলো, নাই।
৪
সব গল্পেরই একটা আখেরি চ্যাপ্টার থাকে। কিন্তু অপ্রতিমের গল্পের শেষটায় কোনো সুন্দর টুইস্ট নাই, কোনো মিরাকল নাই। আছে কেবল একখান ঠান্ডা কবর, দুই জোড়া শুকায়ে যাওয়া চোখ আর একটা নিথর আইফোন।
লালমাইয়ের জঙ্গল থাইকা যখন লাশের সুরতহাল শেষ কইরা খাটিয়া নামানো হইল, কুমিল্লা শহরের আকাশটাও বোধহয় একটু ধোঁয়ামাখা হইছিল। বিশে সেপ্টেম্বর দুই দফা জানাজা শেষে তেরো বচ্ছরের ছাওয়ালটারে মাটির গভীর তলদেশে শুয়াইয়া দেওয়া হইল। বাপের নাম কেএম ফিরোজ শাহরিয়ার, মায়ের নাম ডক্টর নাহিদা বেগম। একমাত্র সন্তানরে মাটির সোপর্দ কইরা ওনারা যখন খালি হাতে কোটবাড়ির ভাড়া বাসায় ফিরলেন, তখন সেই ঘরের প্রত্যেকটা কোণ থাইকা কেবল একটাই আওয়াজ আইতাছিল—‘অপ্রতিম, অপ্রতিম!’
কিন্তু অপ্রতিম তো আর নাই। সে এখন সিসিটিভি ফুটেজের একটা ঝাপসা ছায়া, পেপারের চার কলামের সস্তা নিউজ, আর পুলিশের কেস ফাইলের এক নম্বর ভিকটিম।
আজকে অপ্রতিম গেছে, কালকে হয়তো অন্য কোনো পাড়ার অন্য কোনো রকি কিংবা জনি যাইবো। একটা আইফোনের দাম লাখ দেড়েক টাকা হইতে পারে, কিন্তু এই দেশের বাজারে তেরো বছরের একটা জীবনের আসল দাম কত? জবাব হইলো, একদম জিরো।
আমরা রাষ্ট্ররে গালি দিমু, পুলিশরে কোশ্চেন করমু, কিশোর গ্যাংয়ের স্পন্সরদের অভিশাপ দিমু, সবই ঠিক আছে। কিন্তু আসল ভয়টা অন্য জায়গায়। ঘর, বাহির, ইন্টারনেটের স্ক্রিন আর স্কুলের ক্লাসরুম এই চারডা দরজার মাঝখানে বইসা আমাদের ছাওয়ালপেলেরা যে দিনে দিনে হিংস্র আর অন্ধ হয়ে যাইতেছে, সেই খবর নেওয়ার সময় কি আমাদের আসলেই আছে?
ডিজিটাল দুনিয়ায় হাজার হাজার লাইক-ফলোয়ারের চক্করে পইড়া যে বাচ্চাটা বড়দের গ্যাংরে ‘হিরো’ ভাবতে শেখে, সে তো একদিন এই অন্ধকারের গর্তেই তলিয়ে যাইবো। যদি না অভিভাবক আর সমাজ মিলা লাগামটা এখনই শক্ত কইরা টেনে ধরা হয়।
পুলিশ হয়তো কয়দিন পর চার্জশিট জমা দিয়া দিবেক, আসামি তুহিন আর তার দুই চ্যালা হয়তো জেলখানার চার দেয়ালে পচবেক। কিন্তু ডক্টর নাহিদা বেগমের বুকের ভেতর যে লালমাইয়ের জঙ্গলটা তৈরি হইয়া গেল, সেই জঙ্গলে কি আর কোনোদিন সকালের রোদ উঠবেক?
উঠবেক না ভাই। অপ্রতিমের ডিজিটাল আইডি হয়তো থেকে যাইবো, টিকটকে তার বাইক স্ট্যান্টের ভিডিওতেও ফলোয়ার বাড়তে থাকবো, কিন্তু সেই তেরো বছরের আসল অপ্রতিমটা—যে মায়ের আইফোন নিয়া ছবি তুলতে গিয়া আর বাড়ি ফেরে নাই—সে চিরকালের জন্য হারাইয়া গেল।



পাঠকের মন্তব্য