একটা বোরকা পরা মেয়ের গান

২২ পঠিত ০ ... ১২ ঘন্টা ১৩ মিনিট আগে

 

যতদূর মনে পড়ে, ২০১০ সালের দিকে হুট করে ভাইরাল হয় একটা গান, ‘একটা বোরকা পরা মেয়ে পাগল করেছে’। এই গানটা সেসময় দোকানে দোকানে, জনপ্রিয় হওয়া বাটন ফোনে, রেডিওতে কিংবা বিভিন্ন জায়গায় বাজত। অনেকের কাছে যেটা ছিল শুধুই একটা মজার গান, আমার কাছে সেটা হলো একটু অন্যরকম একটা অভিজ্ঞতা।

আমি ২০০৫ সাল থেকে বোরকা পরি। আমি মোটামুটি লাকি যে আমাকে রাস্তাঘাটে ব্যাড সাউন্ড, হ্যারাজিং একটু কম হতে হয়েছে। এটার কারণ বোধহয় শুধু বোরকা পরা না, ভালো লেভেলের মোটাসোটা ছিলাম দেখে পোলাপান আমাকে বেশি ঘাটাত না। তাছাড়া আমি একা একা কোথাও তেমন যেতাম না। একা গেলেও আমার চলার সময়ে চোখমুখ এমন থাকত, আর এত দ্রুত হাঁটতাম যে আমাকে দেখে মনে হতো, হয় আমি একটা মার্ডার করে এসেছি, না হলে যাচ্ছি করতে।

তো এই গান যখন ভাইরাল হলো, তখন আমি পড়ি ক্লাস টেনে। একদিন কোথাও যাচ্ছি আব্বার সাথে। আব্বা আমাকে দাঁড়া করায় রেখে গেছে দোকানে কিছু একটা নিতে। আমার পেছনে তিন-চারটা চ্যাংড়া টাইপ পোলাপান। হঠাৎ জোরে গান গেয়ে উঠল, ‘একটা বোরকা পরা মেয়ে পাগল করেছে...’

আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি, এটা আমাকে উদ্দেশ্য করে গাওয়া হচ্ছে। কিন্তু বারবার আমার দিকে তাকিয়েই যখন গাওয়া হচ্ছে, আমি বুঝলাম আমাকে দেখেই তারা এটা গাইছে। গার্লস ইনস্টিংক্ট বলে যে, সেটা ইমিডিয়েটলি কাজ করল। আমি দ্রুত আব্বুর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। তখনও যে তারা থেমে গিয়েছিল, এমন না। তারা তখনও গাচ্ছিল, সাইকেল ছিল, সেটার বেল বাজাচ্ছিল। আমার আব্বু ব্যাপারটা খেয়াল করেনি, আমিও কিছু বলিনি। আমরা জাস্ট একটা রিকশা নিয়ে গন্তব্যে গেলাম।

এটা ছিল প্রথমবার। এরপর বহু জায়গায় এই জিনিসের আমি সম্মুখীন হয়েছি। আমার বান্ধবীরা, বোনেরা হয়েছে। অথচ এমন না যে কেউ কাউকে চেনে, পরিচিত এলাকা। না, শুধুমাত্র বোরকা পরা মেয়ে দেখলেই মিলিয়ে একটা গানের লাইন বলা যায় দেখেই মেয়েটার উদ্দেশে লাইনগুলো ছুড়ে দেওয়া! তাদের কাছে এটা ভীষণ মজার, কিন্তু মেয়েটার কাছে? ভয়াবহ ট্রমাটিক।

আরেকটা গানও একইভাবে বহুবার মেয়েদের উদ্দেশে ব্যবহার হতে দেখেছি, ‘চুমকি চলেছে একা পথে’।

গানটা হয়তো অনেকের কাছে নিছক আনন্দের, মজার কিংবা পরিচিত একটা সুর। কিন্তু রাস্তায় একা হেঁটে যাওয়া কোনো মেয়েকে লক্ষ্য করে যখন একদল ছেলে এই গান গেয়ে ওঠে, তখন সেটার অর্থ আর আগের মতো থাকে না। মেয়েটির একা চলাটাই যেন তাদের কাছে গান গাওয়ার উপলক্ষ হয়ে ওঠে।

একটা মেয়ে একা রাস্তায় হাঁটছে, আর তাকে দেখেই কেউ গান গেয়ে উঠছে, ‘চুমকি চলেছে একা পথে’। গানের কথাটা এমনভাবে ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে, যেন মেয়েটি কোনো গানের চরিত্র, আর তাকে নিয়ে মন্তব্য করাটা খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।

আমাদের দেশের যে পরিবেশ, তাতে মেয়েদের বাবা-মায়েরা এমনিতেই দুশ্চিন্তায় থাকে। ধর্ম মানুক আর না মানুক, মেয়ে একটু বড় হলেই তাকে বোরকা পরানো হয়। As a security! যেন বোরকা একটা শিল্ড! আমি আমার লাইফে এমন হিন্দু মেয়েদেরও দেখেছি, যারা বোরকা-হিজাব পরে Just to avoid a daily harasser!

কিন্তু একটা পোশাক কি সত্যিই কাউকে নিরাপত্তা দিতে পারে? আর যদি সেই পোশাক পরেও একজন মেয়েকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কোনো গানের লাইন শুনে অস্বস্তিতে পড়তে হয়, তাহলে সেই গানের দায়টা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের একটু পেছনে ফিরতে হবে। শুধু একটা গান বা তার গায়ককে নিয়ে নয়, বরং গান কীভাবে মানুষের জীবনে ঢুকে পড়ে, মানুষের আচরণে প্রভাব ফেলে, কখনো প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে, আবার কখনো অন্যের জন্য অস্বস্তি আর অপমানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, সেই জায়গাটায়।

গান কি শুধুই বিনোদন?

গান মানুষের জীবনের এমন একটা অংশ, যার সঙ্গে স্মৃতি, আবেগ আর অভিজ্ঞতা অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে থাকে। কোনো গান শুনলে আমাদের শৈশবের কথা মনে পড়ে, কোনো বিশেষ মানুষের কথা মনে পড়ে, আবার কোনো গান একটা নির্দিষ্ট সময়ের স্মৃতি হয়ে থেকে যায়। কখনো গান আমাদের আনন্দ দেয়, কখনো দুঃখের সময়ে সঙ্গী হয়, কখনো এমন অনুভূতির ভাষা হয়ে ওঠে, যা হয়তো আমরা নিজেরা ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারি না।

কিন্তু গান কি শুধুই ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম? নাকি এর সামাজিক প্রভাবও আছে?

একটা গান যখন মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেটি শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। গানের কথা, তার সুর, এমনকি কোনো বিশেষ লাইনও মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তার অংশ হয়ে উঠতে পারে। কখনো তা মানুষের মধ্যে আনন্দ তৈরি করে, কখনো কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে আরও দৃঢ় করে, আবার কখনো অন্যের প্রতি অসম্মান প্রকাশের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।

অবশ্য কোনো গান জনপ্রিয় হলেই সেটি মানুষের আচরণ বদলে দেয়, এমন নয়। কিন্তু যখন সেই গানের কথাকে ব্যবহার করে কাউকে উদ্দেশ্য করে মন্তব্য করা হয়, তখন গানটি আর নিছক বিনোদনের জায়গায় থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে একটি সামাজিক আচরণের অংশ।

‘একটা বোরকা পরা মেয়ে পাগল করেছে’ গানটির ক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতা ঠিক এমনই। গানটি হয়তো অনেকের কাছে ছিল একটা চেনা সুর, কিন্তু কিছু মানুষের কাছে সেটি হয়ে উঠেছিল অপরিচিত বোরকা পরা মেয়েদের উদ্দেশে মন্তব্য করার একটা সহজ উপায়।

এখানে গানটির চেয়ে বড় হয়ে ওঠে সেটিকে ব্যবহার করার ধরন। একজন মেয়েকে তার পোশাকের মাধ্যমে আলাদা করে চিহ্নিত করা, তাকে লক্ষ্য করে গান গাওয়া, তারপর সেই আচরণে আনন্দ খুঁজে পাওয়া। হ্যারাসারদের কাছে যেটা কয়েক সেকেন্ডের মজা, মেয়েটার কাছে সেটা হয়ে উঠতে পারে ভয়, অস্বস্তি কিংবা অপমানের স্মৃতি।

গান যখন প্রতিবাদের ভাষা

গানের সামাজিক প্রভাবের কথা বলতে গেলে এর আরেকটি দিকও সামনে আসে। গান শুধু কাউকে অস্বস্তিতে ফেলার মাধ্যম নয়, বরং বহুবার এটি মানুষের অধিকার আদায়, প্রতিবাদ এবং ঐক্যের ভাষা হয়ে উঠেছে।

ইতিহাসে এমন অনেক গান আছে, যেগুলো নির্দিষ্ট কোনো আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে আন্দোলনের পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে ‘We Shall Overcome’ গানটির সম্পর্ক তেমনই। ইতালির ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিরোধের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘Bella Ciao’। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি বহন করে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। কিংবা এই ২৪-এর ফেব্রুয়ারির ‘শোনো মহাজন, কত প্রাণ হলো বলিদান…’ এমন আরও অজস্র গান!

এই গানগুলো শুধু সুরের জন্য মানুষের মনে জায়গা করে নেয়নি। এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের অধিকার, আত্মত্যাগ, আশা, সংগ্রাম এবং একসঙ্গে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা।

একটি গান যখন অনেক মানুষের অভিন্ন অনুভূতির ভাষা হয়ে ওঠে, তখন সেটি ব্যক্তিগত গণ্ডি ছাড়িয়ে সমষ্টিগত পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়। মানুষ একসঙ্গে গান গেয়ে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করে, প্রতিবাদের শক্তি খুঁজে পায়, নিজেদের একে অন্যের কাছাকাছি অনুভব করে।

এখানেই গানের একটা বিস্ময়কর ক্ষমতা আছে। যে গান একজন মানুষের একান্ত অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে, সেই গানই আবার হাজারো মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠ হয়ে উঠতে পারে।

ভাষার সীমানা পেরিয়ে গানের যাত্রা

গানের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি ভাষা ও ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। যে মানুষ কোনো গানের ভাষা বোঝে না, সেও তার সুর, ছন্দ কিংবা আবেগের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারে।

একটি গান তার জন্মের সময় ও জায়গার বাইরেও নতুন অর্থ তৈরি করতে পারে। কোনো দেশের প্রতিবাদী গান অন্য দেশের মানুষের কাছেও প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠতে পারে। কোনো বিশেষ সময়ের গান বহু বছর পরেও নতুন প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে।

তবে গান যখন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন তার অর্থও বদলে যেতে পারে। যে গান একসময় কোনো নির্দিষ্ট অনুভূতি প্রকাশের জন্য তৈরি হয়েছিল, সেটি অন্য কোনো প্রেক্ষাপটে গিয়ে ভিন্নভাবে ব্যবহৃত হতে পারে। কখনো সেই ব্যবহার আনন্দের, কখনো প্রতিবাদের, আবার কখনো অন্যের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

গান তাই শুধু গীতিকার, সুরকার কিংবা শিল্পীর তৈরি কোনো শিল্পকর্ম নয়। মানুষের ব্যবহার, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও তার নতুন অর্থ তৈরি হয়।

শেষ পর্যন্ত গানটা কার?

একটা গান কীভাবে মানুষের মনে জায়গা করে নেয়, কীভাবে একটা সময়ের স্মৃতি হয়ে ওঠে, কিংবা কীভাবে একটা আন্দোলনের ভাষা হয়ে যায়, তা নিয়ে অনেক কথা বলা যায়। কিন্তু আমার কাছে ‘একটা বোরকা পরা মেয়ে পাগল করেছে’ গানটার স্মৃতি অন্য রকম।

গানটা শুনলে আমার কোনো প্রেমের গল্প মনে পড়ে না। মনে পড়ে একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরীর কথা। মনে পড়ে কয়েকটা ছেলের সাইকেলের বেল, তাদের হাসাহাসি আর আমার দ্রুত পায়ে আব্বার পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর কথা।

হয়তো তারা বহুদিন আগেই ঘটনাটা ভুলে গেছে। হয়তো তাদের কাছে সেটা ছিল কয়েক সেকেন্ডের একটা মজা। কিন্তু আমার কাছে সেটা একটা ট্রমা, যা এত বছর পরেও মনে আছে।

একটা গান মানুষের মনে কতটা জায়গা করে নিতে পারে, তার একটা হিসাব হয়তো করা যায়। কিন্তু সেই গানের কারণে কারও মনে কতটা অস্বস্তি, ভয় কিংবা অপমান জমে থাকে, তার হিসাব কে রাখে?

গান মানুষের অনুভূতির ভাষা। কিন্তু সেই অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আমরা যখন অন্য কাউকে অনিচ্ছায় সেই গানের অংশ করে ফেলি, তখন বিনোদন আর হয়রানির মধ্যকার সীমারেখাটা কোথায় থাকে?

হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই বোঝা যাবে, একটা গান শুধু কী বলছে, সেটাই নয়, গানটিকে আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

২২ পঠিত ০ ... ১২ ঘন্টা ১৩ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top ​