দেশের জনগণ বিএনপির ওপর আস্থা রেখে দলটিকে ব্রুট মেজরিটি দিয়েছে। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র সাত মাস অতিবাহিত না হতেই দলটি জনআস্থায় চিড় ধরিয়েছে।
এর কারণ হচ্ছে, বিএনপি শুরু থেকেই স্বকীয়তা হারিয়ে শেইপ শিফটিং করে আওয়ামী লীগের চেহারা নিয়েছে।
২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের পরপরই আওয়ামী লীগের ফেলে যাওয়া চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য দখল করেছে বিএনপি। সেই যে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা মানেই চাঁদাবাজির লাইসেন্স; সেই আউটডেটেড চিন্তার ওপর দাঁড়িয়ে ‘পাঁচ বছর আওয়ামী লীগ খাবে তো পাঁচ বছর বিএনপি খাবে’; এই যে দেশ খাওয়ার ডকট্রিন; ২৪-এর জুলাই বিপ্লবের পরে সেই অচল সূত্র আর চলবে না; বিএনপির অধিকাংশ নেতা-কর্মী সেটা বুঝতে পারেনি।
আওয়ামী লীগ ঠিক যেসব কারণে আজ জনধিকৃত; বিএনপি ২৪-এর ৫ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে ঠিক তাই করে চলেছে। আওয়ামী লীগকে অপছন্দনীয় করে তুলেছিল এর লোয়ার আইকিউ সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার আর টকশো গাতকেরা। সেটা দেখেও বিএনপি লোয়ার আইকিউ লোকজন নিয়োগ করেছে বিএনপির পক্ষে কথিত বয়ান তৈরির জন্য। তারিখ মুছে দিয়ে আওয়ামী লীগ আমলের লোয়ার আইকিউয়ের বয়ান আর বিএনপি আমলের লোয়ার আইকিউয়ের বয়ান পাশাপাশি রাখলে বোঝার উপায় নেই, এগুলো দুটি সময়ে দুটি দলের টকারের বয়ান।
আওয়ামী লীগ যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিসি নিয়োগে যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যকে গুরুত্ব দিয়েছে; বিএনপি হুবহু তাই করেছে। আওয়ামী লীগের এইচ টি ইমাম যেভাবে বলেছিলেন, ছাত্রলীগের ছেলেরা রিটেনে পাশ করো, ভাইভাটা আমরা দেখব; বিএনপির ফজলুর রহমান একইভাবে দলীয় প্রার্থীদের জন্য ফোন করার আশ্বাস দিয়েছেন।
আওয়ামী লীগ স্কুলের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ভালো শিক্ষকের পরিবর্তে দলীয় পোলিং অফিসার খুঁজেছে রাতের ভোটের ব্যালট সৈনিক হওয়ার জন্য; বিএনপির সাম্প্রতিক স্কুল শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে একই প্রবণতার অভিযোগ উঠেছে।
আওয়ামী লীগ আমলে গোয়েন্দা সংস্থা সরকারি চাকরির নিয়োগের জন্য ভেরিফিকেশন করতে গিয়ে আওয়ামী রক্ত খুঁজেছে; বিএনপি আমলের গোয়েন্দা বিএনপির রক্ত খুঁজছে। অথচ লীগ বা বিএনপির রক্ত বলে কিছু নেই। রক্ত মূলত দুই প্রকার, বিশুদ্ধ ও দূষিত। বিশুদ্ধ রক্তের লোকেরা নিজ যোগ্যতায় কাজ করে খায়। আর দূষিত রক্তের লোকেরা দলীয় প্রীতি ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে যোগ্যতা না থাকার পরেও সরকারি পদ দখল করে খায়। এই দূষিত রক্তের অযোগ্য লোকেদের কারণে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও বাংলাদেশ কল্যাণরাষ্ট্র হতে পারেনি।
গতকাল বিএনপির ক্যাডারেরা মিরপুরে অর্ধশতকের পুরোনো ক্লিনিক গুঁড়িয়ে দিয়ে দখল করেছে। সালমান মুক্তাদীর নামের ইনফ্লুয়েন্সারের স্টুডিও ভাঙচুর করেছে চাঁদা না পেয়ে, এমন অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। ২০২৪-এর জুলাইয়ের আগে একই ভূমিকায় দেখা গেছে আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের। এসব শতবর্ষ পুরোনো ডিএনএ; যারা জমিদারি আমলে কৃষক-কারিগরের কাছে চাঁদা খেয়েছে, ১৯৪৭ সালের পর হিন্দুদের বাড়ি ও জমি দখল করেছে, ১৯৭১ সালের পর অবাঙালিদের বাড়ি-জমি দখল করেছে। আর বাংলাদেশ আমলে পালা করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি হয়ে দেশের নাগরিকদের কাছে চাঁদা খেয়েছে, তাদের বাড়ি-জমি দখল করেছে। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘শত বর্ষের নীরবতা’ উপন্যাসের চেয়ে বেশি জাদুবাস্তব আর মর্মান্তুদ বাংলাদেশে এই একেকবার একেক আদর্শের ঝুঁটি ধরে লুণ্ঠন-ত্রাস-ধর্ষণ-হত্যার ইতিহাস।
এখানে বিশুদ্ধ রক্তের কৃষক-শ্রমিক উদয়াস্ত পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরায়। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে দেশের স্বাধীনতা আর কালচারাল সার্বভৌমত্বের জন্য প্রাণ দেয় মেহনতি মানুষের সন্তানেরা। আর প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মাথায় পতাকা বেঁধে পরিবর্তন উপভোগ করতে বেরিয়ে আসে দূষিত রক্তের ঠগীরা। চাঁদাবাজি, দখল, স্বজনপ্রীতি ও দলীয় গ্যাটিসের মাধ্যমে সরকারি পদ দখল করে কথিত ‘অভিজাত সমাজ’ রচনা করে। চাঁদাবাজি, ঘুষ, দখল, দলীয় পদায়ন যে সমাজে সাফল্যের সূচক; সেখানে সমাজের আর ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি অবশিষ্ট আছে কি না; তা দেখার বিষয়।
আওয়ামী লীগ আমলে দলটির মন্ত্রী-এমপি-বুদ্ধিজীবী-যুবলীগ নিজেদের অপরাধ ঢাকতে যেকোনো ঘটনার জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করত। বিএনপির মন্ত্রী-এমপি-বুদ্ধিজীবী-যুবদল নিজেদের অপরাধ ঢাকতে যেকোনো ঘটনার জন্য এনসিপি-জামায়াতকে দায়ী করতে শুরু করেছে।
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর লীগের এক মন্ত্রী বলেছিলেন, বিএনপি স্তম্ভ ধরে নাড়াচাড়া করেছে। গতকাল মিরপুরের ক্লিনিক ভাঙার ঘটনায় বিএনপির এক এমপি এর পেছনে জামায়াতের ষড়যন্ত্রের কথা বলছিলেন।
বিএনপি এই শেইপ শিফটিং করে আওয়ামী লীগের চেহারা ও বুদ্ধি ধারণ বন্ধ না করলে ইতিহাস তাদের একই রকম নেমেসিসের দিকে টেনে নিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করি। জুলাই বিপ্লবের পথ ধরে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে। তাই বিরোধী জোট এনসিপি-জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক অতীতের লীগ-বিএনপি তিক্ততার রসায়নে নিয়ে যাওয়া বিএনপির উচিত হবে না। যতই মিষ্টি করে বলুক, ‘হে বিএনপি, তোমাকে লীগের জায়গাটা দিয়েছি আমাদের বুকে’; ফ্যাসিস্ট-ফ্যাসিস্টের দোসর ও কালচারাল ফ্যাসিস্টদের বিশ্বাস করে জুলাই ঐক্য বিনষ্ট করা বিএনপির ঠিক হবে না। কালচারাল ফ্যাসিস্টেরা হরিণ সেজে এলে; সেই ছলনায় ভুলে জুলাই ঐক্যের লক্ষ্মণরেখা অতিক্রম করলেই ধরে রাবণের গুহায় নিয়ে যাবে ওরা।



পাঠকের মন্তব্য