ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর! বাঙ্গালির জীবনে এক অতি পরিচিত নাম। একদম ছোট্টবেলাতেই আমাদের এই নামটির সাথে পরিচয় হয়-আর সারাজীবনেই নামটা আমাদের আশেপাশে ঘুরেই বেড়াতে থাকে! এমনই এই নামটার মালিকের কৃতিত্ব। আমাদের বর্ণপরিচয়টা বাংলা গদ্যের জনকের হাত দিয়েই হয়! আর নিজের পরিচয়ের ঝোলাটা তার বিশাল বড়! বিধবা বিবাহ আইন, বাল্য ও বহুবিবাহ বন্ধ, মেয়েদের শিক্ষার প্রসার ছাড়াও সমাজ রিফর্মেশনে তার ছিল বিশাল ভুমিকা।
আসল নাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের এমনই পন্ডিত তিনি ছিলেন যে তাকে উপাধি দেয়া হল ‘বিদ্যাসাগর’! সাগরই তিনি- জ্ঞান, দয়া আর মাতৃভক্তির সাগর!
নানা সময়ের বিভিন্ন মনীষীর সাথে তার দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। মেন্টালিটির ডেপথ খুবই বেশি হলেও একই সাথে মজার মানুষও ছিলেন তিনি। আর অন্যদের প্রতি ছিল তার অগাধ মায়া-ভালোবাসা। চলুন, আজ বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিদের সাথে তার কিছু সুন্দর ঘটনা দেখে আসি-
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
বাংলা উপন্যাসের জনক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বয়সে বিদ্যাসাগরের ছোটো ছিলেন। একবার বঙ্কিমচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সাথে দেখা করতে যান। বিদ্যাসাগর তখন একা ঘরে বসে কাজ করছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রকে দেখে তিনি রসিকতা করে বললেন, কী হে বঙ্কিম (বাঁকা), তোমার নাম তো বঙ্কিম, তা বুদ্ধিটা সোজা তো?
বঙ্কিমচন্দ্রও একটুও কম ছিলেন না, তিনি হেসে উত্তর দেয়েছিলেন, আজ্ঞে হ্যাঁ, বুদ্ধি সোজাই আছে। তবে নদী যেমন বাঁকা হলেও তার জল মিষ্টি হয়, আমার বুদ্ধিটাও তেমনই!
বিদ্যাসাগরবাবু তার এই চমৎকার উত্তরে খুব খুশি হয়েছিলেন।
রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব
সেইসময়ে ভারতে রামকৃষ্ণদেবের খুবই প্রভাব। কিন্তু তিনি শুনেছেন বিদ্যাসাগরের কথা। তার দেখতে ইচ্ছা করল এই মহান মানুষটিকে। ব্যস, আর কথা নেই। ১৮৮২ সালের আগস্ট মাসে শ্রী রামকৃষ্ণ নিজে বিদ্যাসাগরের কলকাতার বাড়িতে তার সাথে দেখা করতে গেলেন। বিদ্যাসাগরের সাথে দেখা হলে রামকৃষ্ণদেব এক চমৎকার রসিকতা করলেন। তিনি বললেন, এতদিন তো শুধু খাল-বিল, নদী-নালা দেখেছি। আজ একেবারে 'বিদ্যাসাগরে' (বিদ্যার সাগরে) এসে পড়লাম!
বিদ্যাসাগরবাবুও হেসে উত্তর দিলেন, তা হলে তো ভালোই হলো মহারাজ, তবে লোনা জল একটু সাথে করে নিয়ে যান!
রামকৃষ্ণদেব তৎক্ষণাৎ বলেন, না না, লোনা জল কেন হবে? আপনি তো অবিদ্যার সাগর নন, বিদ্যার সাগর। আপনার জল তো মিষ্টি জল। আপনি হলেন ক্ষীরের সাগর!
এই সাক্ষাৎকারে রামকৃষ্ণদেব বিদ্যাসাগরের পরোপকার ও দয়ার হাতকে ঈশ্বরীয় গুণের সাথে তুলনা করেছিলেন।
দীনবন্ধু মিত্র
দীনবন্ধু মিত্র! বাংলা সাহিত্যের আরেক দিকপাল। তার সাথে বিদ্যাসাগরের গভীর বন্ধুত্ব ছিল। নীল চাষীদের ওপর ইংরেজদের অত্যাচারের কথা যখন দীনবন্ধু নাটকে তুলে ধরেন, তখন ইংরেজরা ক্ষেপে যায়। দীনবন্ধু তখন তার নাটক ‘নীল দর্পণ'' নিয়ে ভীষণ বিপদে! এই কঠিন সময়ে বিদ্যাসাগর পর্দার আড়াল থেকে দীনবন্ধুকে মানসিকভাবে এবং আর্থিকভাবে বড় ধরনের সাপোর্ট দিয়েছিলেন। দীনবন্ধু প্রায়ই বিদ্যাসাগরের বাড়িতে এসে তার দুঃখের দিনগুলোর গল্প শেয়ার করতেন এবং বিদ্যাসাগর কেঁদে ফেলতেন।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
মাইকেল মধুসূদন দত্ত তখন ফ্রান্সে। প্রচন্ড ইকোনমিকাল সাফারিংস চলছে তার। যেকোন সময় জেলে যাবেন! তখন তিনি বিদ্যাসাগরকে চিঠি লেখেন। জানান, যদি বিদ্যাসাগর তাঁকে সাহায্য না করেন তবে তিনি মারা যাবেন। বিদ্যাসাগর কোনদিকে তাকালেন না। নিজের জমানো টাকা এবং অন্যের কাছ থেকে ধার করে মোট ১০,০০০ টাকারও বেশি ফ্রান্সে পাঠিয়ে দিলেন।
মাইকেল তার এই ঋণ কখনোই পুরোপুরি শোধ করতে পারলেন না। বিদ্যাসাগর কখনও সেজন্য তাকে তাগাদা দিলেন না। মধুসূদন বিদ্যাসাগরের এই উপকারের কথা মনে রেখে বলেছিলেন, বিদ্যাসাগরের জিনিয়াস বা মেধা একজন খাঁটি ইংরেজ পুরুষের মতো, কিন্তু তার বুকটা একজন দয়ার্দ্র বাঙালি মায়ের মতো।
এদিকে, কোন একবার মাইকেল তার একটি তৈলচিত্র (ছবি) বিদ্যাসাগরকে উপহার দেন। বিদ্যাসাগর সেটি তার বসার ঘরে টাঙিয়ে রাখেন। একদিন এক ধনী ব্যক্তি বিদ্যাসাগরের ঘরে এসে ছবিটি দেখে উপহাস করে বলেন, মধুসূদনের মতো এক মদ্যপ আর ঋণগ্রস্ত মানুষের ছবি আপনি ঘরে রেখেছেন?
বিদ্যাসাগর শান্তভাবে উত্তর দিয়েছিলেন, মধুসূদনের ভেতরের মানুষটিকে দেখার মতো চোখ আপনার নেই। ওর ঋণ আর ভুলগুলো ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ওর রেখে যাওয়া সাহিত্য বাঙালি জাতির জন্য চিরস্থায়ী।
স্বামী বিবেকানন্দ
স্বামী বিবেকানন্দ তখন বয়সে তরুণ। তখনো তার নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি যখন চরম মানসিক ও পারিবারিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি একবার বিদ্যাসাগরবাবুর সাথে দেখা করতে যান। বিদ্যাসাগরের মানবসেবা এবং পরোপকারের মানসিকতা নরেন্দ্রনাথের ওপর খুবই প্রভাব ফেলেছিল। পরে কোন এক সময় বিবেকানন্দ বলেছিলেন, বিদ্যাসাগরের মতো বিশাল হৃদয়ের মানুষ বাংলায় আর দুটি জন্মায়নি। তিনি কেবল বিদ্যার সাগর ছিলেন না, তিনি ছিলেন দয়ার সাগর!
শ্রীহট্ট বা সিলেটের পীরসাহেব
তখনকার দিনের কলকাতার একজন বিখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত ও পীর সাহেব বিদ্যাসাগরের পাণ্ডিত্যের কথা শুনে তাঁর সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। বিদ্যাসাগর তাকে খুব আদর করে বরণ করলেন। দুজনে মিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আরবি, ফারসি এবং সংস্কৃত সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করলেন। বিদ্যাসাগর বিদায়বেলায় পীর সাহেবকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। এই পীর সাহেব পরে বলেছিলেন, আমি কলকাতায় একজন খাঁটি সুফি দরবেশ দেখে এলাম, যাঁর নাম বিদ্যাসাগর।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যসাগর ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হিরো। সেই ছোট্টবেলায় বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয়েই হয়েছিল তার হাতেখড়ি! বিদ্যাসাগরের ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে'-ই ছিল বিশ্বকবির প্রথম ছন্দের অনুভূতি।
তিনি চিনেছিলেন এই সৎ, সহজ-সরল জ্ঞানী মানুষটিকে! তার মনুষ্যত্ব আর পৌরুষ ভীষণ প্রভব ফেলেছিল রবীন্দ্রনাথের ওপর। বিশ্বকবি বলেছিলেন, ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাঙালি জাতির মধ্যে যদি কোনো খাঁটি 'মানুষ' জন্মে থাকেন, তবে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।
বিদ্যাসাগর মশাইকে, হ্যাপি বাড্ডে!



পাঠকের মন্তব্য