মারিও রয়ম্যানস: বাংলাদেশের জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন যিনি, তবুও চেনেনি কেউ

৭৯ পঠিত ... ১১ ঘন্টা ৪০ মিনিট আগে

 

বিখ্যাত ডাচ শিল্পী জোহানস্‌ ভারমিরের ১৭ শতকের দিকে আঁকা ‘দ্য লাভ লেটার’ খুবই বিখ্যাত এক ছবি। নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামের রাইখস মিউজিয়ামে আর্টওয়ার্কটি সে সময় সংরক্ষিত ছিল। যে সময়ের কথা বলছি, সে সময়েই এটার দাম ছিল প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ফ্রাঁ। ঘটনা ঘটার ঠিক পরদিনই মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস কর্তৃপক্ষের নজরে আসে যে তাদের সংগ্রহ থেকে উধাও হয়ে গেছে এই অমূল্য চিত্রকর্ম ‘দ্য লাভ লেটার’। খবর পেয়েই গোয়েন্দা দল সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছে যায় জাদুঘরে। তদন্তে নেমে গোয়েন্দা দল জানায়, এটি কোনো সাধারণ চুরি নয়, বরং কোনো এক সুসংগঠিত ও দুর্ধর্ষ পেশাদার অপরাধী চক্রের কাজ। ছবিটির হদিস পেতে বেলজিয়াম সরকার বিপুল অঙ্কের অর্থ পুরস্কারের ঘোষণা দেয়, আর অন্যদিকে অপরাধীদের জালে তুলতে শুরু হয় সাঁড়াশি চিরুনি অভিযান।

১ অক্টোবর ১৯৭১, ঘড়িতে তখন বাজে আটটার মতো। বেলজিয়ামের ব্রাসেলস থেকে প্রকাশিত ‘লা সোয়েরে’ পত্রিকার সাংবাদিক ওয়াল্টার শুল্ডেনের টেলিফোনটি হঠাৎ বেজে উঠল। অচেনা নম্বর থেকে আসা ফোনটি তুলতেই ওপার থেকে এক অজানা কণ্ঠ ভেসে এলো, আমি থিল ফন লিমবার্গ। দিনকয়েক আগে ব্রাসেলসের মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস থেকে জোহানস্‌ ভারমিরের বিখ্যাত ‘দ্য লাভ লেটার’ চিত্রকর্মটি আমিই সরিয়েছি।

ওয়াল্টারের বিস্ময় কাটার সুযোগ না দিয়ে ওপাশ থেকে কণ্ঠটি বলতে থাকল, মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ যদি চিত্রকর্মটি অক্ষত অবস্থায় ফেরত চায়, তবে তাদের ২০০ মিলিয়ন ফ্রাঁ, যা সে সময়ে প্রায় চার মিলিয়ন ডলারের সমান, মুক্তিপণ গুনতে হবে। তবে এই টাকা আমার পকেটে যাবে না। শর্ত হচ্ছে, এটা দিতে হবে আন্তর্জাতিক রোমান ক্যাথলিক সাহায্য সংস্থা কারিতাসকে। যুদ্ধের বিভীষিকায় ক্ষতিগ্রস্ত পূর্ব পাকিস্তানের অসহায় শরণার্থীদের সহায়তায় এই অর্থ ব্যয় করা হবে। আমি কোনো পেশাদার অপরাধী নই, স্রেফ একজন আর্ট লাভার।

চিত্রকর্মটি আসলেই তার কাছে আছে কি না, তা নিয়ে ওয়াল্টার সন্দেহ জানান। তারপর উপযুক্ত প্রমাণ দিতে বলেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, যদি সশরীরে গোপনে চিত্রকর্মটি তাকে দেখানো হয়, কেবল তবেই তিনি বিষয়টি বিশ্বাস করবেন। ওপাশের মানুষটি শর্তে রাজি হয়ে পরদিন ভোরের আগেই ওয়াল্টারকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় উপস্থিত থাকতে বলেন।

পরদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই লিমবার্গের গভীর জঙ্গলের ঠিক করা জায়গায় গাড়ি নিয়ে পৌঁছে যান ওয়াল্টার। মুখ ঢেকে আগে থেকেই সেখানে অপেক্ষা করছিলেন অজ্ঞাত সেই মানুষটি। এরপর ওয়াল্টারের চোখ বেঁধে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় একটি গির্জার সামনে। সেখানে মারিও অবশেষে বের করে আনেন সেই বিখ্যাত চিত্রকর্মটি। ছবির সত্যতা নিশ্চিত করতে ওয়াল্টার তার গাড়ির হেডলাইটের আলো জ্বালিয়ে বাঁধাই করা চিত্রকর্মটির বেশ কয়েকটি ছবি তুলে নেন।

পরদিন, মানে ৩ অক্টোবর, ‘লা সোয়েরে’ পত্রিকায় সেই চিত্রকর্মের ছবি আর দাবির খবরটি নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ হতেই পুরো বেলজিয়ামজুড়ে হৈচৈ পড়ে যায়।

তবে চুরিটা আসলে থিল ফন লিমবার্গ নামের কেউ করেনি। ফ্লেমিশ লোকগাথার অন্যতম বিখ্যাত ও নীতিবান চরিত্র হলো ‘থিল ফন লিনবার্গ’। ফ্লেমিশ লোককাহিনিতে তাকে সবসময় নীতি-আদর্শ ও ন্যায়বিচারের এক প্রতীকী চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কাজেই এটা যে ছদ্মনাম ছিল, তা সবাই ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলেন। এই চুরিটা যিনি করেছিলেন, তার নাম ছিল মারিও রয়ম্যানস।

এবার প্রশ্ন আসে, তিনি চুরিই বা করেছিলেন কেন আর মুক্তিপণের টাকাই বা কেন শরণার্থী শিবিরে দান করার কথা বলেছিলেন?

আগস্টের এক অলস সকালে বিছানায় শুয়ে ঢুলুঢুলু চোখে টিভি দেখছিলেন ২১ বছর বয়সী ফ্লেমিশ তরুণ মারিও পিয়েরে রয়ম্যানস। হঠাৎই স্ক্রিনের এক দৃশ্যে তার নজর আটকে গেল। টিভিতে দেখানো হচ্ছিল, পূর্ব পাকিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী দমনের দোহাই দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তা কীভাবে নৃশংস গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে।

পর্দার দৃশ্যে দেখা যাচ্ছিল, প্রাণ বাঁচাতে দিশেহারা মানুষ সীমান্তের দিকে ছুটছে, একটাই আশায়, একটু আশ্রয়ের। আরও ভেসে উঠল অনাহারে মারা যাওয়া আর পচে যাওয়া লাশের সারির ওপর ক্ষুধার্ত কুকুর আর শকুনের দলবল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার বীভৎস দৃশ্য।

সাত হাজার ৫০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে বসে থেকেও এই তরুণ ফ্লেমিশের মন সেই রক্তাক্ত মানুষগুলোর জন্য কেঁদে উঠল। নিজেকেই প্রশ্ন করলেন, আমার কি সত্যিই কিছু করার নেই? সেই মুহূর্তেই মারিও প্রতিজ্ঞা করলেন, হাত গুটিয়ে বসে থাকা যাবে না। তিনি এমন কিছু করবেন, যা কেবল সেই নিপীড়িত অঞ্চলের মানুষের জন্য সহায়তাই আনবে না, বরং তাদের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বজুড়ে জনমত গড়ে তুলবে! এই অদম্য ভাবনাই শেষমেশ তাকে ঠেলে দিয়েছিল এক দুঃসাহসিক শিল্পকর্ম চুরির পথে।

কীভাবে করলেন চুরি? সে আরেক দুঃসাহসিক অভিযানের মতোই!

২৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় চিত্র প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বেলজিয়ামের রাজকন্যা প্রিন্সেস পামেলা। দর্শনার্থীর ছদ্মবেশে প্রদর্শনী দেখার বাহানায় জাদুঘরে পা রাখেন তরুণ মারিও রয়ম্যানস। শিল্পপ্রেমী হওয়ার সুবাদে ‘দ্য লাভ লেটার’-এর প্রকৃত কদর ও অধরা মূল্যের কথা তার বেশ ভালোভাবেই জানা ছিল।

 

WhatsApp Image 2026-09-23 at 16.42.49

এই সেই বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘দ্য লাভ লেটার’

জাদুঘরে ঢোকার আগে ও পরে নিখুঁতভাবে পুরো এলাকা দেখে নিলেন মারিও। চোখে পড়ল, জাদুঘরের ভেতরে ও বাইরে পাহারা দিচ্ছেন চারজন অস্ত্রহীন পুলিশ কর্মকর্তা। আর জাদুঘরের একটি দেওয়ালে সগর্বে ঝুলছে জোহানস্‌ ভারমিরের সেই জগৎখ্যাত চিত্রকর্ম। পরিকল্পনা গুছিয়ে নিয়ে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই চুপিচুপি একটি কাঠের আলমারির ভেতর লুকিয়ে পড়লেন তিনি।

১৭ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য আর ১৫ ইঞ্চি প্রস্থের এই চিত্রকর্মটি অক্ষত অবস্থায় সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে বাইরে বের করে আনা সহজ কথা নয়। তাই জাদুঘর রাতে বন্ধ হওয়ার প্রহর গোনা ছাড়া উপায় ছিল না। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর একসময় জাদুঘর জনশূন্য হয়ে নিঃশব্দে বন্ধ হলো। রাত গভীর হতেই আলমারিটি থেকে বেরিয়ে এলেন মারিও। পকেট থেকে ধারালো ছুরি বের করে অত্যন্ত সাবধানে ফ্রেম কেটে ক্যানভাসটি আলাদা করে ফেললেন। তারপর মূল ছবিটিকে ভাঁজ করে যত্ন করে ঢুকিয়ে নিলেন নিজের পকেটে। ভেন্টিলেটর দিয়ে বের হয়ে গেলেন তিনি। বাইরের অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন। কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পেল না কী ঘটে গেছে।

চিত্রকর্মটি হাতছাড়া না হলেও টঙ্গারেনে নিজের বাড়িতে ফিরে চরম বিপাকে পড়লেন মারিও। বহুমূল্য এই শিল্পকর্মটি কোথায় নিরাপদে লুকিয়ে রাখা যায়, তা নিয়ে শুরু হলো ভীষণ দুশ্চিন্তা। কোনো উপায় না দেখে অবশেষে বাড়ির পাশের জঙ্গলে গর্ত খুঁড়ে ছবিটি মাটিচাপা দিয়ে রাখলেন। কিন্তু রাতে ভারী বৃষ্টি নামায় পরদিন ভোরেই তড়িঘড়ি করে সেটা তুলে আবার ঘরে নিয়ে আসতে হলো।

এরপর কাজ খুঁজতে শুরু করেন মারিও। ভাগ্যক্রমে হিউসডেন-জোল্ডারের ‘সিতেওয়েতে’ নামের একটি হোটেলে ওয়েটার হিসেবে কাজ পেয়েও যান তিনি। হোটেল থেকে তার থাকার জন্য যে ঘরটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, সেই ঘরের বিছানার তোশকের নিচেই ঠাঁই হলো বিশ্বখ্যাত ‘দ্য লাভ লেটার’-এর।

শেষ পর্যন্ত কী হলো?

‘লা সোয়েরে’ পত্রিকায় সেই চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশের পর তা আমস্টারডামের রাইখস মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের চোখ এড়ায়নি। তারা মারিও রয়ম্যানসের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করে জানায়, এটি সত্যিই মূল চিত্রকর্ম কি না, তা বিশেষজ্ঞ দিয়ে যাচাই করে নিতে চায় তারা। যদি তা আসল বলে প্রমাণিত হয়, কেবল তবেই তারা মুক্তিপণ মিটিয়ে দেবে। এমনকি এই প্রক্রিয়ায় পুলিশের কোনো ঝামেলা থাকবে না বলেও মারিওকে আশ্বস্ত করে রাইখস মিউজিয়াম। তবে মারিও তাদের সেই টোপ গেলেননি।

এদিকে মারিও ‘হট ফেক’ নামের আরেকটি পত্রিকার কাছে জানান, ৬ অক্টোবরের মধ্যে ২০০ মিলিয়ন ফ্রাঁ পরিশোধ না করা হলে এই পেইন্টিংটি বিক্রি করে দেওয়া হবে; ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন ক্রেতা তার সঙ্গে দেখাও করেছেন। এবার তিনি আরও দুটি নতুন শর্ত জুড়ে দেন, মুক্তিপণ দেওয়ার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি টিভিতে সরাসরি সম্প্রচার করতে হবে এবং চুক্তির সময় বিমা কোম্পানির প্রতিনিধিকেও উপস্থিত থাকতে হবে। কিন্তু এত কম সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগাড় করা একপ্রকার অসম্ভব দেখে ডাচ জাদুঘর কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত মুক্তিপণ দিতে রাজি হয় না।

মুক্তিপণের টাকা না পাওয়ায় ৬ অক্টোবর সকালে জনপ্রিয় রেডিও শো ‘টু বেড অর নট টু বেড’-এ ফোন করার সুযোগ পেয়ে মারিও সরাসরি তার পুরো পরিকল্পনার কথা দেশবাসীকে জানান। একই সঙ্গে তুলে ধরেন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার চালানো সেই পৈশাচিক গণহত্যার চিত্র। তার সাহসিকতা আর আবেগঘন বয়ানে স্তম্ভিত ও মুগ্ধ হন অনুষ্ঠানের উপস্থাপক থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রোতারা।

তবে মারিও ফোনটি করেছিলেন হ্যাসেল্টের একটি পেট্রোল পাম্প থেকে। এই পাম্প মালিকের স্ত্রী পুরস্কারের লোভে তাকে চিনে ফেলে দেরি না করে পুলিশে খবর দেন। বিপদ আঁচ করতে পেরে মারিও মোটরসাইকেল নিয়ে চম্পট দেওয়ার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। পুলিশের তাড়া খেয়ে মোটরসাইকেল থেকে লাফিয়ে পাশের হেরকেনরোথ আবদে খামারে আশ্রয় নেন তিনি। শেষমেশ সেই খামারের এক গোবরের স্তূপ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সেখান থেকে মারিওকে নিয়ে যাওয়া হয় হিউসডেন-জোল্ডারের ‘সিতেওয়েতে’ হোটেলে। হোটেলের ঘরে মারিওর বিছানার তোশকের নিচ থেকেই পরম যত্নে লুকিয়ে রাখা জোহানস্‌ ভারমিরের ‘দ্য লাভ লেটার’ উদ্ধার করে পুলিশ।

একই বছরের ২০ ডিসেম্বর মারিও রয়ম্যানসকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি ব্রাসেলসের আদালত তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন।

 

আদালতে মারিও রয়ম্যান্স

 

তবে মারিওর এই নিঃস্বার্থ চুরির পেছনে পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের জন্য মানবীয় আকুতি ছড়িয়ে পড়েছিল আমজনতার মাঝে। তার আকস্মিক মুক্তি এবং দাবিকৃত অর্থ পূর্ব পাকিস্তানের অসহায় মানুষের সহায়তায় খরচের দাবিতে রাজপথে নেমে আসে সাধারণ মানুষ, আয়োজন করা হয় গণস্বাক্ষর কর্মসূচিরও। মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে শিল্পী-সাহিত্যিকেরা একযোগে মারিওর পক্ষে অবস্থান নেন। জনমতের প্রবল চাপ আর অপরাধের মানবিক উদ্দেশ্য বিবেচনা করে ১৯৭২ সালের ১২ জুলাই, মাত্র ছয় মাস কারাভোগের পর মুক্তি পান মারিও রয়ম্যানস।

গ্রেপ্তার হলেও, একটি চুরির ঘটনার মধ্য দিয়ে ইউরোপের মাটিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন এবং হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যার চিত্র বিশ্বমঞ্চে ফুটিয়ে তুলতে মারিওর এই অদম্য প্রচেষ্টা এক অভূতপূর্ব ভূমিকা রেখেছিল।

মারিওর জীবনে এরপরে কী হলো?

কারাগারে থাকার দিনগুলোতেই প্রচণ্ড মানসিক আঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন মারিও রয়ম্যানস। একপর্যায়ে তিনি মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। কারামুক্তির পর এক ফ্লেমিশ তরুণীকে বিয়ে করেন মারিও, তাদের কোল আলো করে আসে এক কন্যাসন্তানও। তবে মানসিক অসুস্থতা তীব্র আকার ধারণ করলে তিনি পুরোপুরি ভবঘুরে হয়ে পড়েন। জীবন কাটাতেন রাস্তায়, আর রাতের বেলা ঘুমাতেন পার্ক করা গাড়িতে।

১৯৭৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর, বক্সিং ডের সকালে লিয়েজের রাস্তার পাশে পার্ক করা একটি গাড়িতে মারিওকে মুমূর্ষু অবস্থায় পাওয়া যায়। হাসপাতালে নেওয়া হলেও মস্তিষ্কে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার অবস্থার মারাত্মক অবনতি হয়। টানা ১০ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ১৯৭৯ সালের ৫ জানুয়ারি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলাদেশের এই নিঃস্বার্থ বন্ধু। পরবর্তীতে বেলজিয়ামের টঙ্গারেনের নেরেম গ্রামের এক ছোট্ট কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।

জোহানস্‌ ভারমিরের ‘দ্য লাভ লেটার’ চুরির বিষয়টি কেবল বেলজিয়ামেই নয়, আলোড়ন তুলেছিল গোটা ইউরোপে। ‘লা সোয়েরে’ ছাড়াও বেলজিয়ামের দ্য স্ট্যান্ডার্ড, লা লিব্রে বেলশিক, হেট নিউজব্লাড, উসডাইনফিস ও হেট বিলাং ফান লিমবুর্গ-এর মতো শীর্ষ পত্রিকায় ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। এমনকি প্যারিসের ‘লে ফিগারো’ ও বার্সেলোনার ‘লা ভ্যানগার্দিয়া’ পত্রিকাও দুদিন পর এ নিয়ে প্রতিবেদন ছাপে। পরবর্তীতে ২০২১ সালে ‘হেট বিলাং ফান লিমবুর্গ’-এ প্রকাশিত এক ফিচারের মাধ্যমেই জানা যায় মারিও রয়ম্যানসের করুণ ও বীরত্বপূর্ণ শেষ জীবনের কথা।

তবে কেউ মনে রাখেনি মারিওর কথা

না বেলজিয়াম, না বাংলাদেশ মারিও রয়ম্যানসের এই অনন্য বীরত্বকে মনে রাখেনি কোনো দেশই। নিজ দেশ বেলজিয়ামে তিনি চিরকাল একজন সাধারণ অপরাধী হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে রইলেন। আর যে বাংলাদেশের জন্য তিনি নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন, সেই বাংলাদেশের চিত্রও ভিন্ন কিছু নয়!

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১১ সালের ২৫ জুলাই থেকে ২০১৩ সালের ২ অক্টোবর পর্যন্ত সাতটি ধাপে ২১টি দেশের ৩৩৯ জন বিদেশি বন্ধু ও সংগঠনকে ‘বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা’, ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করে তৎকালীন সরকার। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সেই দীর্ঘ তালিকার কোথাও মারিও রয়ম্যানসের নাম ওঠেনি। এমনকি পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ৩৩টি দেশের ৩৪৮ জন বিদেশি বন্ধুর তালিকায় খোঁজ নিয়েও জানা যায়, সেখানেও স্থান পাননি এই নিঃস্বার্থ বীর মারিও।

তথ্যসূত্র: আহমাদ ইশতিয়াকের 'মুক্তিযুদ্ধের ভুলে যাওয়া এক বিদেশি বন্ধুর খোঁজে' নামক ফিচার, দ্য ডেইলি স্টার

৭৯ পঠিত ... ১১ ঘন্টা ৪০ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top