মাসকাওয়াথ আহসানের ধারাবাহিক নভেলা (অষ্টম পর্ব)

পঠিত ... ১২ ঘন্টা ১৭ মিনিট আগে

 

 

সকাল সকাল চিত্তরঞ্জন কচুক্ষেতের ম্যানেজার জুলফিকারকে নিয়ে পাল মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে জলখাবার খেতে যায়। গরম গরম লুচির সঙ্গে বুন্দিয়া আর পাঁচফোড়ন দেওয়া সুস্বাদু তরকারি গোগ্রাসে গিলছে পাশের টেবিলগুলোর লোকেরা।

পাল মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মালিক অসিত পাল চিত্তরঞ্জনকে দেখেও না দেখার ভান করে। চিত্ত সেটা বুঝতে পারে। চিত্ত কটাক্ষ করে বলে, পাকিস্তান আমল হইয়া অসিত দাদার টেকাটুকার গরম হইছে মনে হয়। চিনতে পারতেছে না লোকজনরে।

অসিত হিসেবের খাতার দিকে তাকিয়ে বলে, আমাগোরে তো কাজ কইরা খাইতে হয়। গায়ে ফুঁ দিয়া ঘুরলে যদি টেকাটুকা আইতো, তাইলে খোশগল্প কইরা বেড়াইতাম স্থানে স্থানে।

--যতই আপনা মনে করো অসিতদা, এই দেশ কখনো তোমার হইবে না।

--তা তুমি কবে আপনা দেশে যাইতেছো! যাওয়ার সময় খবর দিও, দুই ভাই একলগে যামু গিয়া।

অন্যান্য টেবিলের লোকেরা হেসে ফেলে অসিতের কথা শুনে। চিত্তরঞ্জন বিরক্ত হয়ে বলে, দিলা তো সকাল সকাল মেজাজটা বিলা কইরা!

--আমি তো চুপচাপ কাম করতেছিলাম, তুমিই তো কুঁচকুঁচানি শুরু করলা।

অসিত পাল উঠে এসে বলে, দেখো চিত্ত; খোঁজখবর আমিও রাখি। সোহরাওয়ার্দি-শরত বসুরা যখন অখণ্ড বাংলা স্বাধীন করতে চাইলেন; জিন্নাহ পরিষ্কার বললেন, আমার তাতে আপত্তি নাই। আপত্তিটা করলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি আর বল্লভভাই প্যাটেল। নেহরু বললেন, কলকাতাটা আমাদের লাগবেই। তা ১৯০৫ সালে পূর্ব বাংলা আর আসাম নিয়া আলাদা দেশ যখন হইলো; ঢাকা যখন রাজধানী হইলো; তখন তো নাকের পানি চোখের পানি এক কইরা ১৯১১ সালে সেইটা বানচাল করলা তোমরা। আবার ১৯৪৭-এ আইসা তোমরা পশ্চিমবঙ্গ কাইটা নিয়া ভারত মাতা কি জয় বইলা কোলে উঠলা। সবই করলা তোমরা; আর দোষ হইলো পূর্ব বাংলার; কেন সে পাকিস্তানের সঙ্গে গেলো!

চিত্তরঞ্জন রেগে গিয়ে বলে, ৬ বছরে যদি ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ রদ করা যায়; কত বছরে ১৯৪৭-এর বঙ্গভঙ্গ রদ করা যাবে; সেইটা ঐকিক নিয়মে বাইর করো।

--ঐ আশায় থাকো চিত্ত। এখন তাড়াতাড়ি খাইয়া দাইয়া বিদায় হও দেহি। বিল দেওন লাগবো না।

চিত্ত গ্লাসের মধ্যে হাত ধুয়ে দ্রুত উঠে পড়ে। ম্যানেজার জুলফিকার মুখে একটা বড় রসগোল্লা পুরে হাপুস হুপুস করে খেতে খেতে চিত্তর পেছনে পেছনে আসে।

চিত্ত রাগে গজগজ করতে করতে বলে, এই নিম্নবর্গের হিন্দুগুলো নিজের ভালো বোঝে না। সব দেখো কেমন ঘাড় গুঁজ করে দোকানদারি করছে। এদের কোন দেশের চিন্তা নেই। বরং চাষাভুষোর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়া মুছুম্মান ছেলেগুলোই ভালো। ওদেরকে কিছু বোঝালে বোঝে। অভিজাত সংস্কৃতি শেখার আগ্রহ আছে তাদের। বঙ্কিম পাঠচক্রে তারা কত আগ্রহভরে তাকিয়ে থাকে। অথচ ক্ষুদে দোকানি হিন্দুর ছেলেদের অভিজাত সংস্কৃতি শেখার কোনো আগ্রহ নেই। খালি দোকানদারি করে আর টাকা গোনে।

কচুক্ষেতের ম্যানেজার জুলফিকার বলে, মন্দিরে গরুর হাড় এসে না পড়া পর্যন্ত এদের হুঁশ হবে না। বাড়িতে ডাকাত না পড়া পর্যন্ত এরা সজাগ হবে না। রেল কোয়ার্টারে নতুন গড়ে ওঠা বিহারি পাড়ার সঙ্গে পালপাড়ার দাঙ্গা না হওয়া পর্যন্ত এই হিন্দুরা ভারত মাতার মর্যাদা বুঝবে না।

স্কুলের কাছাকাছি যেতেই শিক্ষক শ্যামাপদের সঙ্গে দেখা হয়। চিত্ত জুলফিকারের সঙ্গে আলাপ থামিয়ে দিয়ে শ্যামাপদকে বলে, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে তোমারে তো একটা কথাও কইতে দেখলাম না চিত্ত।

--আমি শিক্ষক মানুষ, প্রয়োজনীয় কথা শ্রেণিকক্ষে ছাত্রদের বলি। তোমার মতো বিশিষ্ট ব্যক্তি তো নই যে পয়সার হাটের স্থানে স্থানে চোঙ্গা ফুঁকে বেড়াবো।

--মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার দাবিতে কথা বলা আমাদের কর্তব্য।

--পূর্ব বাংলার সৌভাগ্য, তোমার মতো ভাষাপ্রেমী জন্ম দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে তো ভাষাপ্রেমী নাই; তাই ভারতের রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবিতে কেউ চোঙ্গা ফুঁকে বেড়াচ্ছে না। ভারত স্বাধীন হবার অনেক আগেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গান্ধীজী-নেহরুর সঙ্গে একমত হয়েছেন, ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের যোগাযোগে হিন্দি ভাষাই যথার্থ হবে।

--তবে কিন্তু না কইরা নিজের অবস্থান স্পষ্ট করো; হ্যাঁ-না'তে উত্তর দিবা শ্যামা; রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাও কিনা!

--তোমার কাছে উত্তর দিতে হবে কেন! তুমি কি বাংলা ভাষার মালিক; নাকি আমার চাইতে ভালো বাংলা জানো। তোমরা অন্যান্য পূজার মতো বাংলা ভাষা পূজার যে প্রচলন করতে চেষ্টা করছো; ঐটার সঙ্গে আমি নাই। আমি আমার ছাত্রদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাই। শিল্প-সাহিত্য বিকাশের জন্য বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী দেখতে চাই। আবার পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজনে ইংরেজি ও উর্দু শেখা জরুরি মনে করি। একজন মানুষ যত বেশি ভাষা জানবে; বিশ্বের জ্ঞানজগতের জানালাগুলো ততো খুলে যাবে তার সামনে।

--আমি উর্দু ভাষাকে ঘৃণা করি। ঐ ভাষা বহিরাগতদের ভাষা। অত্যাচারী শাসক ও সৈনিকের ভাষা। মধ্যযুগীয় বর্বরদের ভাষা।

জুলফিকার জিজ্ঞেস করে, ও চিত্তদা, আমারে কি কিছু কইলেন!

--আরে নাহ, তুমি তো অসাম্প্রদায়িক চেতনার লোক। শ্যামাপদ হচ্ছে মুঘল সেনাপতি মান সিংহ আর নবাবদের সেনা মোহনলালের মতো লোক। যে স্বজাতিকে ভুলে মধ্যযুগীয় বর্বরদের সহযোগিতা করে।

শ্যামাপদ বলে, চিত্ত, তোমার পণ্ডিত মশাইয়ের অভিধান থেকে নতুন নতুন শব্দ শেখা দরকার। বহু ব্যবহারে জীর্ণ শব্দের চর্বিত চর্বনে বড্ড একঘেয়ে শোনায় তোমাকে।

চিত্তরঞ্জন জুলফিকারকে নিয়ে প্রধান শিক্ষক প্রণব মুখুজ্জের কাছে যায়। পণ্ডিত মশাই ধ্যানস্থ। সামনে খোলা কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র। বইটাতে গুরুত্বপূর্ণ লাইনের নিচে নীল পেন্সিলের দাগ।

ধ্যান ভেঙে পণ্ডিত মশাই বলেন, শুনেছো চিত্ত, শ্যামাপদ অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার হিসেবে প্রমোশন পেয়েছে। সার্কেল অফিসার আর সলিম খান মিলে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমাকে একপাশে সরিয়ে দেবার ষড়যন্ত্র আরকি।

জুলফিকার উত্তেজিত হয়ে ওঠে। আপনি অনুমতি দিলে এই ষড়যন্ত্রের বিষদাঁত ভেঙে দিতে পারি পণ্ডিত মশাই। নারীঘটিত একটা স্ক্যান্ডাল দিয়ে মধুমতীর আলোকে দিয়ে রিপোর্ট করে শ্যামাপদকে জেলে পাঠাতে পারি। দারোগা সাহেব রজনীগন্ধার সুঘ্রাণ নিতে নিয়মিত নীলকমল মহলে যাতায়াত করেন। আমার বড্ড খাতিরের লোক।

পণ্ডিত মশাই বিরক্ত হয়ে বলেন, জুলফিকার, তুমি এখন যেতে পারো। কার সামনে কী বলা যায় আর কী বলা যায় না; সেই বোধ তোমার একেবারেই নেই।

--আমায় ক্ষমা করুন পণ্ডিত মশাই।

মধুমতীর আলোর সম্পাদক মুকুল শর্মা আর ডাক্তার কালিদাস হন্তদন্ত হয়ে কক্ষে ঢোকে। কালিদাস বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, খেলা জমে গেছে পণ্ডিত মশাই। ঢাকায় খাজা নাজিমউদ্দিনের পুলিশ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্রদের মিছিলে গুলি চালিয়েছে। বেশ কয়েকজন তরুণ নিহত হয়েছে।

পণ্ডিত মশাই কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকেন। তাঁর চোখের দু'পাশ দিয়ে দুই বিন্দু জল গড়িয়ে পড়ে। তারপর শোকাহত ফ্যাসফেসে গলায় বলেন, পাকিস্তানের নাগপাশ ছিন্ন করতে না পারলে আমরা এইরকমভাবে পুত্রহারা হতে থাকবো। এরা সেই বখতিয়ার খিলজি আর আওরঙ্গজেবের মতোই মধ্যযুগীয় বর্বর শাসক।

শ্যামাপদ কক্ষে ঢুকে বলে, পণ্ডিত মশাই, ঢাকায় মিছিলে পুলিশের গুলিতে ছাত্রেরা নিহত হওয়ায় আমরা একটি প্রতিবাদী শোকসভার আয়োজন করেছি। আপনি যদি অনুগ্রহ করে একটু আসেন।

--আমায় ডেকো না শ্যামাপদ। পুলিশের গুলিতে স্বজন হারানোর বেদনায় আমি ভারাক্রান্ত। তুমি ছাত্রদের নিয়ে একটা শোকসভা করে ওদের ছুটি দিয়ে দাও।

মুকুল শর্মা জিজ্ঞেস করে, মধুমতীর আলোর জন্য আপনি কি একটি অভিমত কলাম লিখবেন পণ্ডিত মশাই।

--আমার আজ কিছুই ভালো লাগছে না মুকুল। যাই দেখি একটু ধনঞ্জয় বাবুর শয্যাপাশে বসি গিয়ে। জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব ব্যর্থ হয়েছে; ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদই মুক্তির একমাত্র পথ। হিন্দু-মুসলমান নয়; বাঙালিই আমাদের একমাত্র আত্মপরিচয়।

মুকুল শর্মা খসখস করে নোট নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যায়। পণ্ডিত মশাই এবার চিত্তরঞ্জনের দিকে তাকিয়ে বলেন,

মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা।

চিত্তরঞ্জন দ্রুত ছুটে যায় নিখিল বঙ্গ কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রের দিকে। পয়সার হাট বাজারে তখন শোকের ছায়া। ব্রিটিশ পুলিশ আর জমিদারের পাইক-পেয়াদার হাতে জীবন খোয়ানোর বিষাদসিন্ধু পার হয়ে; পাকিস্তান পুলিশের গুলিতে আজ বাংলা মায়ের সন্তানের লাশ পড়েছে ঢাকার রাজপথে। ঘষাকাঁচের চশমা পরা নবতিপর এক বৃদ্ধ ঘড়ি মেরামতের দোকানে রেডিওর পাশে মাথায় হাত দিয়ে বসে; অস্পষ্ট স্বরে বলেন, হে খোদা, আজাদির পথ আর কত দূর!

সপ্তম পর্বের লিংক

পঠিত ... ১২ ঘন্টা ১৭ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top