প্রণব মুখুজ্জের অভিধান
পয়সারহাটের যে ছেলেরা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েছিল; তারা ছুটিতে ফিরে সারাক্ষণ শার্ট-প্যান্ট-পাজামা-ঘড়ি পরে ঘোরাফেরা করে। কেউ আর কৃষক পিতার কৃষিকাজে সাহায্য করে না; কুমার পিতার মাটির পাত্র তৈরিতে একটু হাত লাগায় না; জেলে পিতার জাল ফেলতে সাহায্য করে না। শিক্ষিত হওয়া ব্যাপারটা অনেকটা উচ্চবর্গের হওয়ার মতো। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে 'ভদ্রলোক' হয়েছে; কাজেই ছোটলোক চাষা-কুমার-জেলের কাজ কি করা যায়! এমন একটা বিস্ময়বোধক চিহ্ন ঝুলিয়ে তারা দিনমান মন্দিরের পাশে বটগাছের নীচে ক্যারাম বোর্ড ও দাবা খেলে। রেডিওতে ক্রিকেট ম্যাচের ইংলিশ কমেন্ট্রি শোনে।
সাঁঝ হলে অনেকে জমিদার ধনঞ্জয় সাহার মতো সেজেগুঁজে সুগন্ধি লাগিয়ে নীল কমল মহলে যায়। খানিকটা ভেসে আসা হারমোনিয়ামের সুর, নুপুরের শব্দ, বেশ খানিকটা আলো-আঁধারিতে রহস্যময় এই নীল কমল মহল। এই বহু প্রাচীন কুঠিবাড়িতে এককালে ইংরেজ নীলকর সাহেবদের আনাগোনা ছিল। ধনঞ্জয় সাহার পিতামহ কলকাতা থেকে বাঈজি আনিয়ে ঠুমরির তালে নাচিয়ে ইংরেজদের মনোরঞ্জন করত। সেই থেকে নীল কমল মহল হয়ে পড়ে সাহা পরিবারের আনন্দ ব্যবসার প্রাসাদ।
হালে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া নতুন সাহেবদের আগমনে নীল কমল মহলের ঝাড়বাতি মুছে, পর্দার ধুলো ঝেড়ে, ছাদের কড়িকাঠের মাকড়সার জাল পরিষ্কার করে জলসাঘর নতুন করে সেজে ওঠে।
নিশাত সিনেমা হল বন্ধ করতে ব্যর্থ হওয়ার পর আব্বাস শাহের চোখ পড়ে এবার নীল কমল মহলের দিকে। এবার মসজিদে সে মুসল্লিদের ক্ষেপিয়ে তোলে, উস্কানি দেয়, জমিদারের ঐ বেবুশ্যেখানা বন্ধ করতে হবে। আমাদের তরলমতি ছেলেরা সেইখানে ভিড় জমিয়েছে, ইসলাম খাতরে মে হ্যায়। শুক্রবার জুমার নামাজের পরে নীল কমল মহল অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেয় আব্বাস।
কান টানলে যেমন মাথা আসে; তেমনি জমিদারের নীল কমল মহলের আনন্দ ব্যবসা বিপদাপন্ন হতেই চিত্তরঞ্জন ছুটে যায় মুসলিম লীগ নেতা সলিম খানের কাছে। সঙ্গে নীল কমল মহলের ম্যানেজার জুলফিকার।
ঘটনার বিবরণ শুনে সলিম খান উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, শূয়োর চরার জন্য যেমন কচুক্ষেত লাগে; তেমনি শিক্ষিত শূয়োরগুলির জন্য ঐ রকম চরার জায়গা দরকার আছে। তা না হলে শূয়োরগুলি আমাদের সমাজের মা-বোনদের দিকে নজর দেবে।
উপস্থিত জনতার বড্ড পছন্দ হয় কচুক্ষেত নামটি। নীল কমল মহল সংলগ্ন এলাকাটার নাম কচুক্ষেত হিসেবে সুচিহ্নিত হয় উপস্থিত শ্রোতাদের মনে।
কচুক্ষেতের ম্যানেজার জুলফিকার মোচ পাকাতে পাকাতে বলে, শুনেছি আব্বাস মোল্লা নাতনির বয়সী এক মাইয়ার সর্বনাশ করেছে।
পরদিন মধুমতীর আলোয় সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। 'ইনুর সঙ্গে তিনুর কিসের সম্পর্ক'। আব্বাসের সঙ্গে এক কিশোরীর ছবি।
গোটা পয়সারহাটে ছ্যা ছ্যা পড়ে যায়। কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্র প্রীতিলতা ব্রিগেড গড়ে ওঠে। মুক্ত মঞ্চে কল্পনা ও সুলতানা মুক্তি নৃত্য পরিবেশন করে।
জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা।
জাগো স্বাহা সীমন্তে রক্তটিকা॥
দিকে দিকে মেলি তব লেলিহান রসনা,
নেচে চলো উন্মাদিনী দিগ্বসনা,
জাগো হতভাগিনি ধর্ষিতা নাগিনি,
বিশ্ব-দাহন তেজে জাগো দাহিকা॥
চিত্তরঞ্জন তার বক্তৃতায় বলে, এই কিশোরীটি আপনার মেয়ে ও আমার বোন হতে পারতো। এরকম কত কিশোরী যে মধ্যযুগীয় বর্বরতার শিকার হয়ে চলেছে; তার ইয়ত্তা নাই।
চিত্তরঞ্জনের কথা শুনে আড়ষ্ট হয়ে পাউডার মাখা ঘাড় চুলকায় গানের শিক্ষক ভবতোষ। মুচকি মুচকি হাসে তবলচি মাকসুদুজ্জামান।
মধুমতীর আলো'র সবগুলো কপি বিক্রি হয়ে যায়। সম্পাদক মুকুল শর্মা দৌড়ে প্রণব মুখুজ্জের পায়ের ধুলো নিতে যায়। মুখুজ্জে গালে সুপারি পুরে ঠোঁট টিপে হাসে।
মসজিদের মুসল্লিদের চাপাচাপিতে আব্বাস স্বীকার করে, তরুণীটি তার দ্বিতীয় স্ত্রী। কিন্তু এরই মাঝে পাতকুয়াতলায় জোবাইদা খালা, অরুণা মাসিদের কানাকানি, হাসাহাসি, ফিসফিসানি মাতম তোলে। আব্বাসের দ্বিতীয় স্ত্রী, অল্পবয়সী তরুণীটি এত কলঙ্কের চাপ আর নিতে পারে না।
সহানুভূতি দেখানোর ছলে বৈচিত্র্যহীন জীবনের খালা-মাসি-দিদি ও বুবুদের পুলক খেলার আতিশয্যে নিজেকে ঘরবন্দী করে ফেলে মেয়েটি।
কচুক্ষেতের ম্যানেজার জুলফিকার সবাইকে খবর দেয়, আব্বাসের দ্বিতীয় স্ত্রীর ঝুলন্ত মৃতদেহ পাওয়া গেছে। অমনি মধুমতীর আলোর প্রতিবেদক ছুটে গিয়ে আব্বাসের বাড়ির চারপাশে সারমেয়র মতো করে গন্ধ শুঁকে বেড়াতে থাকে।
চিত্তরঞ্জন মন্দিরের পাশের বটতলায় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলে আব্বাসের গ্রেফতারের সম্মতি উৎপাদন করে।
থানায় দারোগার সামনে বসে দু'পাশে সলিম খান ও কলিম চৌধুরী আর মাঝখানে কালিদাস।
আব্বাস শাহ গ্রেফতার হয়ে গেলে কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রের প্রীতিলতা সংগীত বিদ্যালয়ে সমস্বরে গীত হয়,
আনন্দধারা বহিছে ভুবনে,
দিনরজনী কত অমৃতরস উথলি যায় অনন্ত গগনে॥
পান করি রবে শশী অঞ্জলি ভরিয়া—
সদা দীপ্ত রহে অক্ষয় জ্যোতি—
নিত্য পূর্ণ ধরা জীবনে কিরণে ॥



পাঠকের মন্তব্য