মাসকাওয়াথ আহসানের ধারাবাহিক নভেলা (ষষ্ঠ পর্ব)

পঠিত ... ৫৯ মিনিট আগে

21 (29)

জামায়াত নেতা আব্বাস শাহর নেতৃত্বে একদল মুসল্লি নির্মীয়মাণ সিনেমা হল ভাঙচুর করতে গেলে পার্শ্ববর্তী থানা থেকে পুলিশ এসে বাধা দেয়। ফাঁকা ফায়ার করে দঙ্গলটিকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

দ্রুত সিনেমা হলের কাজ শেষ করে উর্দু ছবি ‘তেরি ইয়াদ’ প্রদর্শন শুরু হয় সেখানে। বোয়ালমারী, চিতলমারী, আলফাডাঙ্গা থেকে দর্শক এসে প্রতিটি শো-কে হাউজফুল করে তোলে।

নিখিল বঙ্গ কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রে জরুরি প্রতিবাদ সভা আয়োজিত হয়। জমিদার বাড়ির বারান্দায় স্থাপিত মুক্তমঞ্চে দাঁড়িয়ে কালিদাস বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ তোলে, ঢাকায় যেখানে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আওয়াজ উঠেছে, পয়সারহাটে সেখানে উর্দু ছায়াছবি প্রদর্শিত হচ্ছে। এ আমাদের অস্তিত্বের ওপর আঘাত। এ আঘাত আমরা মেনে নিতে পারি না।

নিশাত সিনেমা হলের ম্যানেজার শংকর মেহেতা দৌড়াতে দৌড়াতে সেখানে আসেন। তিনি হাত জোড় করে বলেন, আমরা নিশাত সিনেমা হলে পরের সপ্তাহে কলকাতার বাংলা চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা করব। আপনারা আমাকে এই সপ্তাহটি সময় দেন।

উর্দু শিক্ষক রজব আলী আজকাল পকেটে জিন্নার ছবি নিয়ে ঘোরে; যেন সে প্রয়োজনের মুহূর্তে ওই ছবি ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানাতে পারে। সে শংকর মেহেতার সামনে এসে জিন্নার ছবি ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলে, যে সিনেমা হলের পর্দায় উর্দু ছবি চলে, সেই হলের পর্দা ছিঁড়ব এবার।

চিত্তরঞ্জনের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল নিশাত সিনেমা হলের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। মফিজ স্লোগান দেয়, উর্দুর আস্তানা ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও। মিছিলটা সিনেমা হলের সামনে পৌঁছাতেই সেখানে অপেক্ষমাণ শত শত দর্শক প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে পড়ে।

এই পরিস্থিতিতে কালিদাস মিছিলকারী দঙ্গলকে মাটিতে বসে পড়তে বলে। চিত্তরঞ্জন পেছনে তাকিয়ে দেখে, সিনেমা দেখতে আসা শত শত দর্শক সেখানে দাঁড়িয়ে। সামনে ও পেছন থেকে ঘেরাও হয়ে গেছে বুঝে চিত্তরঞ্জন বলে, আমাদের মিছিলে দুজন নারী সদস্য রয়েছেন। নারীর প্রতি সম্মান জানিয়ে আমাদের চলে যেতে দিন।

পেছনের লোকেরা চিত্তরঞ্জন গংকে চলে যাওয়ার রাস্তা করে দেয়। তারা মিয়া রাগে গজগজ করতে করতে বলে, মধ্যযুগীয় বর্বর কতগুলো। এরপর সে নিজেকে শূন্যে আবিষ্কার করে। নিশাত সিনেমা হলের দর্শকেরা তাকে মাথার ওপর তুলে ভলিবল খেলতে খেলতে নিয়ে গিয়ে স্টেশন রোডে আছাড় মারে। কালিদাস কল্পনার হাত ধরে কোনোমতে ভিড় থেকে বের করে আনে। চিত্তরঞ্জন সুলতানাকে প্রয়োজনের অধিক আলিঙ্গন করে বের করে আনে। আলম ও মফিজ গায়ের তিন পকেটওয়ালা জামা খুলে বস্ত্রহীন তারা মিয়াকে ঢেকে চ্যাংদোলা করে কালিদাসের ডিসপেনসারিতে ব্যান্ডেজ করাতে নিয়ে যায়। রজব আলী বিপদ বুঝে টিকিট কেটে সিনেমা হলে ঢুকে পড়ে দর্শক সেজে।

খবর পেয়ে গওহরডাঙ্গা থেকে আনন্দবাজারের প্রতিনিধি মুকুল শর্মা এসে জামায়াতের সিনেমা হল ভাঙতে যাওয়ার ঘটনাকে মব বা দঙ্গল, আর কার্ল মার্কস পাঠচক্রের উর্দু চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বন্ধ করতে যাওয়াকে মাতৃভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসা, আর তাদের ওপর উগ্র মুসলিমদের মব বা দঙ্গল—এমন অ্যাট্রিবিউশন দিয়ে মনের মাধুরী মিশিয়ে রিপোর্ট করে।

প্রণব মুখুজ্জে চিত্তরঞ্জনকে ডেকে বলেন, শুধু আনন্দবাজার আর আকাশবাণী দিয়ে হবে না। পয়সারহাটের নিজস্ব গণমাধ্যম প্রয়োজন। মুকুল শর্মাকে সম্পাদক করে ‘মধুমতীর আলো’ প্রকাশ করো। দেখবে, আমাদের প্রগতিশীলতার লড়াইটা সহজ হয়ে যাবে। আর প্রীতিলতা লাইব্রেরিতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ পাঠচক্র শুরু করো। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটিতে ফেরা কৃষকের ছেলেদের বঙ্কিম বাবুর মতো ভদ্রলোক হিসেবে গড়ে তোলো।

পণ্ডিতমশাইয়ের বাড়ি থেকে দ্রুত পায়ে হেঁটে মধুমতী নদীর ধারে কাশবনের পাশে পাখি ডাকা বাবলা অরণ্যে পৌঁছে যায়। সেখানে সুলতানা অপেক্ষা করছে। সেদিন সিনেমা হলের সামনে ভিড়ের মাঝ থেকে উদ্ধার করে আনার পর থেকে সুলতানা চোখ বুঁজলেই দেখে, তেপান্তর থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে রাজকুমারের বেশে চিত্তরঞ্জন ছুটে আসছে রাজকুমারী সুলতানাকে উদ্ধার করতে। দুজন অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। একে অন্যের চোখের দিকে তাকাতে সংকোচ বোধ করে। হঠাৎ কী ভেবে সাদা কাশবনের মাঝ দিয়ে ভোঁ দৌড় দেয় সুলতানা। চিত্তরঞ্জন তার পেছনে পেছনে দৌড়াতে থাকে।

পঞ্চম পর্বের লিংক

 

পঠিত ... ৫৯ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top