প্রণব মুখুজ্জের অভিধান
পয়সার হাটের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যাতে বিনষ্ট না হয়, সেই লক্ষ্যে এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করেন সার্কেল অফিসার শুকচান মণ্ডল।
বৈঠকে তরুণ শিক্ষক শ্যামাপদ বলে, পয়সার হাটের মানুষ সতত শান্তিপ্রিয়। মধুমতীর পারে বোয়ালমারী, চিতলমারী ও আলফাডাঙ্গায় কৃষক, কামার, কুমার, তাঁতী, জেলে শত বছর ধরে পরিশ্রম করে অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে। জমিদারি ব্যবস্থার নির্যাতন ছাড়া তাদের জীবনে আর কোনো সমস্যা ছিল না। জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদের কারণে এখন মেহনতি মানুষ জমির মালিক হয়েছে। তাদের ছেলেরা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যেতে শুরু করেছে।
চিত্তরঞ্জন রেগে গিয়ে বলে, পাকিস্তান শ্যামাপদের জন্য স্বর্গ হলেও, আমাদের জন্য নরক ছাড়া আর কিছু নয়।
মফিজ শ্যামাপদকে কটাক্ষ করে বলে, জিন্নার পরিবেশিত সোমরস পান করে শ্যামাপদ ভালোই মাতাল হয়েছেন দেখছি।
সার্কেল অফিসার বলেন, আলোচনার সময় এমন কিছু বলবেন না, যাতে সম্প্রীতি বিনষ্ট হয়।
সলিম খান হাত দুখানি জোড় করে বলেন, মুসলিম লীগ আপনাদের জন্য স্বাধীনতা এনেছে; এখন আমরা দেশের সমৃদ্ধির জন্য কাজ করছি।
কালিদাস প্রশ্ন তোলে, কার স্বাধীনতা! কিসের স্বাধীনতা!
কলিম চৌধুরী বলেন, মুসলিম লীগকে আমরা ওয়ালাইকুম আস সালাম বলেছি। এখন আওয়ামী লীগেই মুক্তি। ভাসানী আমাদের সেই মুক্তির পথ দেখাবেন।
সার্কেল অফিসার বলেন, গণতন্ত্রে একাধিক রাজনৈতিক দল থাকবে। কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধিতা যেন শত্রুতায় পর্যবসিত না হয়।
চিত্তরঞ্জন চিৎকার করে, শ্যামাপদ বলছে মেহনতি মানুষ সুখে আছে! মেহনতি মানুষের খবর আমরা রাখি; আমাদের রাজনীতিই মেহনতি মানুষকে নিয়ে; আমরা জানি তারা কেমন সুখে আছে। সুখে আছে কেবল সলিম খান আর শ্যামাপদ।
শ্যামাপদ উত্তর দেয়, আপনারাই একমাত্র মেহনতি মানুষের প্রতিনিধি; যারা জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদের আন্দোলনে একটি শব্দও বলেননি। জমিদারের কোলে বসে বিপ্লব হয় নাকি! এখনো তো জমিদার বাড়িতে কাশিম বাজার কুঠি বানিয়ে সারাদিন শলা-পরামর্শ করছেন; কী করে জমিদারি উদ্ধার করা যায়।
সভাকক্ষে মৃদু উত্তেজনা তৈরি হলে উর্দু শিক্ষক রজব আলী ক্ষেপে ছুটে গিয়ে জিন্নার ছবি ভাঙচুর করে বলতে থাকে, জিন্না বাঙালির শত্রু। মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়।
চিত্তরঞ্জন পুলক প্রকাশ করে, সাহসী মানুষ একজন হলেই চলে। আসেন রজবদা, বুকে আসুন। আলম, তারা মিয়া, মফিজ দৌড়ে গিয়ে রজবকে পাঁজাকোলা করে তুলে ‘রজব আলী কি জয়’ স্লোগান দিতে দিতে বাইরে বেরিয়ে যায়।
সভা এভাবে পণ্ড হয়ে গেলে, সাঁঝে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য রজব আলীর সংবর্ধনা আয়োজিত হয় নিখিল বঙ্গ কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রে। পণ্ডিত প্রণব মুখুজ্জে মঙ্গলঘট প্রজ্বলন করে বলেন, সূর্য সেনের যোগ্য উত্তরসূরি এই রজব আলী। আমরা তাকে নিয়ে গর্বিত।
রজব আলী উত্তেজিত হয়ে বিস্ফারিত চোখে বলে, জিন্নার দালাল খাজা নাজিম ও মুনেম খাঁকে উড়িয়ে দিতে বোমা তৈরি করেছি; দরকার হলে আত্মঘাতী হবো।
অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন প্রণব মুখুজ্জে। রজব আলীকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন। হারমোনিয়ামে বেজে ওঠে গান।
নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়, খুলে যাবে এই দ্বার—
জানি জানি তোর বন্ধনডোর ছিঁড়ে যাবে বারে বার॥
খনে খনে তুই হারায়ে আপনা, সুপ্তিনিশীথ করিস যাপনা—
বারে বারে তোরে ফিরে পেতে হবে বিশ্বের অধিকার॥
প্রণব মুখুজ্জের ছোট মেয়ে কল্পনা মঞ্চে এসে রাখী বেঁধে দেয় রজব আলীর হাতে। এরপর কল্পনা ও কলিম চৌধুরীর মেয়ে সুলতানা মৃদু মুদ্রায় নৃত্য পরিবেশন করে,
মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে
তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ।
তারি সঙ্গে কী মৃদঙ্গে



পাঠকের মন্তব্য