পয়সারহাটের কৃষক-প্রজারা সন্ধ্যা নাগাদ বিজয় মিছিল বের করে। স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয় শতবর্ষ পুরোনো অশ্বত্থগাছ, রেলস্টেশন, মধুমতী নদী আর বাজার এলাকা।
জমিদার ধনঞ্জয় সাহার ডানহাত ও বাঁহাত বলে প্রসিদ্ধ সলিমুদ্দি ও কলিমুদ্দি মাথায় টুপি পরে, হাতে পতাকা নিয়ে বিজয় মিছিলে যোগ দেয়। গণি মিয়ার ছেলে আপত্তি তোলে, অরা আমার বাপেরে খুন করছে। অগো কামই ছিল খাজনা দিতে রাজি না হইলে বাঁইন্ধা জমিদারবাড়ি নিয়া যাওয়া। পিটাইয়া জমিদারের শখ মিটলে পরে সলিমুদ্দি আর কলিমুদ্দি নৌকায় তুইলা পেট কাইটা মধুমতীত ভাসাইয়া দেওয়া। আমার বাপে আত্মহত্যা করে নাই। অরা নিয়া গিয়া মারছে।
সলিমুদ্দি বলে, এইসব কী কও বাজান, তুমি না ইশকুলে পড়ো; তোমার ইশকুলের বেতন ক্যাডায় দেয়। এই আমি গিয়া দিয়া আসি।
কলিমুদ্দি ঘোষণা করে, ইশকুল মাঠে আজ রাইতে স্বাধীনতার ভোজ হইবো। আমি গরু ফেলতেছি। আর সলিমুদ্দি তিনটা খাসি ফালাইতেছে। অহন ঝগড়া-বিবাদের দিন না; আমোদ-ফূর্তির দিনে মুখ ভার করতে নাই। সলিমুদ্দি আর্তস্বরে স্লোগান ধরে, পাকিস্তান পাকিস্তান। পয়সারহাটের সবাই বলে, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ।
দূর থেকে স্লোগানের শব্দ শুনে পণ্ডিত প্রণব মুখুজ্জে কানে তুলো দেন। রাগে গজগজ করতে করতে বলেন, আবার মুছুম্মান ডাকাতগুলো রাজ্য দখল করলো। রান্নার ঠাকুর ঘনা বলে, পণ্ডিত মশয়, আজ আমার স্বাধীনতার ভোজের নেমন্তন্ন আছে। আপনার নৈশভোজ হয়ে গেলে আমি যেতে পারি।
--তুই যে দেখছি ঘরের শত্রু বিভীষণ রে ঘনা। যা, ঘ্যানঘ্যান করিসনে। আমি আজ জলস্পর্শ করব না।
রেডিওর নব ঘুরিয়ে মুখুজ্জে বাবু আকাশবাণীর খবরে কান পাতেন। জমিদার ধনঞ্জয় সাহা শয্যাগত। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছাদের কড়িকাঠে মাকড়সার জাল বোনা দেখছেন। স্ত্রী আশালতা দেবী কাঁসার গ্লাসে গরম দুধ ফুঁ দিতে দিতে প্রবেশ করেন।
--সারাদিন তো কিছুই মুখে তুললেন না। এই দুধটুকু খেয়ে নিন।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পুরাতন ভৃত্য কেশব উসখুশ করছে। আশালতা বলেন, কেশব ইশকুল মাঠে নেমন্তন্ন খেতে যেতে চায়। ওখানে নাকি স্বাধীনতার ভোজ হচ্ছে। জমিদারবাবু বিস্ফারিত চোখে তাকান। আশালতা বলেন, বাবুদের জন্য যা পরাধীনতা, ছোটখাটো মানুষের জন্য সেটাই স্বাধীনতা। ওকে যেতে দিন। কেশব চলে গেলে আশালতা রেডিওর নব ঘুরিয়ে আকাশবাণী চালু করে দেন। সেখানে ১৯৪২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘গরমিল’ চলচ্চিত্রের গান বাজছে রবীন মজুমদারের কণ্ঠে, এই কি গো শেষ দান?
বিরহ দিয়ে গেলে, এই কি গো শেষ দান
মোর আরও কথা ছিল বাকি—,
আরও প্রেম আরও গান।
এই কি গো শেষ দান?
জমিদারবাবুর চোখের কোণায় জল গড়িয়ে পড়ে। আশালতা দেবী আঁচল দিয়ে চোখ মুছে দেন।
আশালতা চলে গেলে জমিদারবাবুর মনে হয়, যেন গণি মিয়া জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে। অন্য জানালাগুলোতে কাসেম, রহিমুদ্দি, গেদু মিয়া, বাহারুদ্দি। সবার পেটের জায়গাটা চিরে দেওয়া; সেখানে রক্তজবার মতো ফুটে থাকা ফুল। কারও কাঁধে ফলার আঘাত; কারও গাল ছুরি দিয়ে চিরে ফেলা, কারও চোখের কোটরে চোখ নেই।
ওদিকে ইশকুল মাঠে অনুষ্ঠান চলছে। মঞ্চে চেয়ারে উপবিষ্ট সলিমুদ্দি ও কলিমুদ্দি। গলায় তাদের ফুলের মালা। দর্শকের সারি থেকে এক বৃদ্ধ বলেন, ক্যাবা, সলিমুদ্দি-কলিমুদ্দি জমিদারের পেয়াদা থাইকা আইজ দেখতেছি পাকিস্তানের বরকন্দাজ হইছো।
দর্শকের সারিতে হাসির রোল পড়ে যায়। বরুণের কার্ল মার্কস পাঠচক্রের ছেলেরা পাকিস্তান মুর্দাবাদ স্লোগান দিতে থাকে। বিশৃঙ্খলা সামলাতে সলিমুদ্দি ঘোষণা করে, এখন সবাইকে ভোজসভায় অংশ নিতে অনুরোধ জানাচ্ছি।
কার্ল মার্কস পাঠচক্রের চিত্তরঞ্জন প্রতিবাদ করে, যে ভোজসভার জন্য গো-হত্যা হয়েছে, আমরা তা বয়কট করছি।
স্কুলের তরুণ শিক্ষক শ্যামাপদ বলে, খাওয়া-দাওয়ার পৃথক ব্যবস্থা রয়েছে। অযথা বিভেদ তৈরি করবেন না।
চিত্তরঞ্জন গ্রুপের শামসুল আলম দাঁত কেলিয়ে বলে, শ্যামাপদ স্যার, দেখতেছি পাকিস্তানের হিন্দু পেয়াদা হইছেন। হুইস্কি খাওয়া সাচ্চা মুসলমান জিন্নার দাওয়াত পাইছেন নাকি!
তারা মিয়া ওরফে মিজান বাবরি দুলিয়ে বলে, ঐ যে পতাকা দেখছো না, শ্যামা; সবুজ হইলো মুছুম্মান আর সাদা অংশ হইলো হেঁদু। বাঁশটা ঠিক ফিট করছে হেঁদুর পেছনে।
ভিড়ের মধ্যে থেকে কে একজন বলে, এতো অস্থির হইয়ো না শামসু-মিজান; বরুণ বাবুর জমিদারি উদ্ধারের কাজ কয়দিন পরে শুরু কইরো। এখন খাসির মাংস দিয়া গাপশিলাও। তোমাগো জন্য রসগোল্লা, দইও আছে। খাইয়া চিত্তরঞ্জনের চিত্ত ঠান্ডা হউক।



পাঠকের মন্তব্য