কলিমুদ্দি ও সলিমুদ্দি জমিদার ধনঞ্জয় সাহার ডান হাত ও বাম হাত হিসেবে বিরাজ করত পয়সার হাটে। খরার কারণে কৃষক কর দিতে রাজি না হলে কলিমুদ্দি ও সলিমুদ্দি গিয়ে গণি মিয়াকে কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে আসত। বৈঠকখানার পাশে কড়ই গাছের সঙ্গে বেঁধে চাবুক দিয়ে পিটিয়ে দিত সাহা বাবু।
কলকাতা থেকে আগত সাহা বাবুর সুপুত্র বরুণ সাহা তখন মধুমতী নদীতে বজরা সাজিয়ে কবিতার খাতা জুড়ে মধুমতীর অপার রূপ বর্ণনা করত। পয়সার হাটের মানুষের মুখে মুখে কোমল স্বভাবের কবি বরুণ সাহার দয়া-দাক্ষিণ্যের গল্প রূপকথা হয়ে ফিরত।
পয়সার হাট ধনঞ্জয় সাহা বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক প্রণব মুখুজ্জে ছাত্রদের বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রজাদরদী ধনঞ্জয় ও তাঁর সুপুত্র বরুণকে অন্ধকার পয়সার হাটে আলোর দিশারী বলে বর্ণনা করতেন।
জ্যোৎস্না রাতে বজরা নিয়ে মধুমতী নদীতে কাব্যবিলাস করার ক্ষণে হঠাৎ একটা লাশ বৈঠায় বাড়ি খেলে; বরুণ সাহা সেই মৃতদেহ উদ্ধার করে গ্রামে নিয়ে এলে মুখে মুখে রটে যায়, গণি মিয়া আত্মহত্যা করেছে।
জমিদার বাবু ঘোষণা করেন, গণি মিয়ার পরিবারের দায়িত্ব আমি লইলাম। উহার ছেলেটিকে আপনি ইশকুলে ভর্তি কইরা লন, মুখুজ্জে বাবু।
গণি মিয়ার আত্মহত্যার চেয়ে সাহা বাবুর প্রজাদরদী রূপকথাটিই মুখুজ্জে বাবুর বয়ানে ছড়িয়ে পড়ে গ্রামময়।
দুর্গাপূজা এসে পড়লে কলকাতা থেকে অর্ডার দিয়ে রাণী ভিক্টোরিয়া সদৃশ মুখমণ্ডলের দেবীপ্রতিমা নৌকাযোগে পয়সার হাটের ঘাটে ভিড়ে। জমিদার বাবুর বাড়িতে এক লক্ষ পিদিম জ্বেলে তাঁর লাখপতি হওয়ার জানান দেওয়া হয়। সাহা বাবু নিজ হাতে প্রজাদের পাতে রসগোল্লা তুলে দেন। জমিদার গৃহিণী ধামায় করে দরিদ্র কৃষাণী ও জেলেনিদের চাল ও ডাল বিতরণ করেন।
মুখুজ্জে বাবু জমিদারের মহানুভবতার প্রশস্তি রচনা করেন। কীভাবে বহিরাগত মুসলমান ডাকাত বখতিয়ার খলজি, সুলতানি, মুঘল, নবাবি আমলের অত্যাচারীদের পরাজিত করে মহারাণী ভিক্টোরিয়ার কৃপায় ধনঞ্জয় দেবতা পয়সার হাটের এই শান্তির গ্রাম সৃজন করলেন; ইতিহাসের সেই সুললিত চারুপাঠ দেন ছাত্রছাত্রীদের।
নতুন কবিতা নিয়ে মুখুজ্জে বাবুকে শোনাতে গিয়ে তাঁর কবিতার মতো কন্যাটি আলপনার সঙ্গে দৃষ্টিবিনিময় হয় বরুণের। এরপর বরুণ প্রেমের কবিতা লিখে লুকিয়ে লুকিয়ে আলপনাকে শোনাতে থাকে।
দেবীর মুখমণ্ডল কেন মহারাণী ভিক্টোরিয়ার মতো, এই নিয়ে কানাঘুষা কৃষক-প্রজাদের মাঝে ও জেলেপল্লিতে চলতে থাকে। বরুণ টের পায়, একটা কৃষক আন্দোলন দানা বাঁধছে। গণি মিয়ার আত্মহত্যার গল্পটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে বাতাসে ভাসছে।
বরুণ তখন ধনঞ্জয় বিদ্যাপীঠের ওপরের ক্লাসের ছাত্রদের নিয়ে কার্ল মার্কসের গ্রন্থের পাঠচক্র গড়ে তোলে। আলপনা তার কয়েকজন বান্ধবীকে নিয়ে সেই পাঠচক্রে অংশ নিতে থাকে।
পয়সার হাটে জমিদারবিরোধী কৃষক-প্রজা আন্দোলনের ঢেউ আসে। ফজলুল হকের পোস্টারে ছেয়ে যায় স্কুলঘরের দেয়াল। আর বরুণের নেতৃত্বে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন চলতে থাকে।
মুখুজ্জে বাবু তার ছাত্রছাত্রীদের বোঝান, সব নষ্টের গোড়া ওই ব্রিটিশেরা। নেহাত জমিদার বাবু আছেন বলে আমাদের গায়ে আঁচ লাগতে দেন না। অথচ মূর্খ ইতরগুলো জমিদারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে।
জমিদার ধনঞ্জয় বাবু তখন স্নায়ুচাপে ছ-আনা পাঁচ-আনা করছেন। প্রধান শিক্ষক মুখুজ্জে বাবু আশা দেন, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি আমাদের নেতা। তিনি নিশ্চয়ই একটা বন্দোবস্ত করবেন। পয়সার হাট নিশ্চয়ই ভারতের সীমানায় পড়বে।
জমিদার বাবু হুংকার দিয়ে ওঠেন, কলকাতার কসাই সুরাবর্দী আর শূয়োরখেকো জিন্না হলো গিয়ে যত নষ্টের গোড়া। ওদের উসকানিতে দেখো, এ গ্রামের অশিক্ষিত ছোটলোকগুলো স্লোগান দিয়ে বেড়াচ্ছে, ঠোঁটে বিড়ি, মুখে পান; লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান!
ব্রিটিশ কেরানির কলমের খোঁচায় পয়সার হাট পাকিস্তানের সীমানার মধ্যে পড়ে যাওয়ায় জমিদার ধনঞ্জয় বাবু স্ট্রোক করেন; শ্যামাপ্রসাদের ছবির দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। প্রধান শিক্ষক মুখুজ্জে বাবু বলেন, নেহরু বলেছেন, ফর দ্য টাইম বিইং এটা মেনে নেওয়া হলো। আপনি বেশি চিন্তা করবেন না, জমিদার বাবু।
আলপনাকে বিয়ে করে তাকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত কলকাতার দ্বিতীয় নিবাসে পাড়ি দেয় বরুণ সাহা। দেশভাগের বেদনা নিয়ে শোকের পদাবলি লিখতে থাকে।
এরপর প্রায় আশি বছর চলে গেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫ বছর গড়িয়ে গেছে। কলিমুদ্দি ও সলিমুদ্দির নাতি-নাতনি ধনঞ্জয় বাবু হওয়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে জমিদারের মতো সেজেগুজে ঘোরে। গণি মিয়ার ছেলেটি পড়ালেখা শিখে পুলিশে গিয়েছিল। তার মেয়ে ঠিকই প্রধান শিক্ষক প্রণব মুখুজ্জের মুখে মুখে প্রচারিত ইতিহাসের বয়ান ফেরি করে। কাকে কসাই বলতে হবে, কাকে শূয়োরখেকো বলতে হবে, কাকে মূর্খ, ইতর ও ছোটলোক বলতে হবে, তা প্রণবের অভিধানে নির্দিষ্ট। আর বরুণের ছেলেটি কলকাতায় বসে দ্য লস্ট হাভেলি, ইনশাল্লাহ বাংলাদেশ গ্রন্থ প্রণয়ন করে জমিদারি উদ্ধারে জান লড়িয়ে দেয়। অখণ্ড ভারতের মানচিত্র, শ্যামাপ্রসাদের ছবি সেই লড়াইয়ের সবাক অনুপ্রেরণা হিসেবে মানসপটে চিরজাগরুক থাকে। বুকের মধ্যে জয় শ্রীরাম শব্দবন্ধ দুকূল ছাপিয়ে জোয়ার আনে।



পাঠকের মন্তব্য