ভোরের আলো ফুটেছে। সারারাত এপাশ-ওপাশ করে শেষ রাতে একটু চোখ বুঁজে এসেছে জমিদার বাবুর। দরজার পর্দার ওপাশে একটি ছায়ামূর্তি ঠায় দাঁড়িয়ে; জমিদার বাবুর ঘুম ভাঙার অপেক্ষায়।
আশালতা দেবী তাকে একটা চেয়ারে বসতে বলেন। লোকটা কাঁচুমাচু করে। আশালতা দেবী বলেন, বইসো বইসো; অনেক দূরের পথ পাড়ি দিয়া আইছো। তা তোমার নামখানা কী!
-আজ্ঞে, কালিদাস।
-তা কী করা হয়!
-কলিকাতায় ডাক্তারি করি। তা সেইখানে বড় বড় ডাক্তার আসিয়া পড়ায়, আমার মতোন ছোট ডাক্তারের কাছে আর কেউ আসে না। বরুণ বাবু তাই পরামর্শ দিলেন, পয়সার হাটে চলিয়া যাও; বাবার সেবাশুশ্রূষাও করিলে, অবসরে কিছু রোগীও দেখিলে।
--ভালো করছো। আমাগের একটা গুদামঘর আছে বাজারে। কেশব সেইখানে তোমার ডিসপেনসারি বানাইয়া দেবেনে।
আঁচলের খুঁট খুলে কিছু টাকা দিয়ে বলেন, গওহরডাঙ্গা থেকে ওষুধপত্রাদি আনাইয়া নিও।
--ডিসপেনসারি শুরু করার মতো ওষুধপত্র আমার সঙ্গে আছে, মাসিমা। জমিদার মশায়ের নাড়ি পরীক্ষা করিয়া আমি বাজারের দিকে যাইতেছি।
--জমিদার বাবুর রোগ আর সারবার নইগো, কালিদাস। বেচারার অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন ভাইঙ্গা যাবার পর থেকেই উনি শয্যা নিয়াছেন।
--আবার অখণ্ড ভারত হইবো, মাসিমা; এইখানে তেরঙ্গা পতাকা উড়বে। চানতারাকে আমরা বেশিদিন সহ্য করবো না।
--তুমি ডাক্তার মানুষ; মন দিয়া রোগীর চিকিৎসা করো। এইসব নিয়া বেশি মাতামাতি করার দরকার নাই। মন চাইলে এইসব কথা জমিদার বাবুকে কইবা। তার চিত্ত শান্ত হইবো।
সলিমুদ্দি একখানা শেরওয়ানি পরে, চোখে সুরমা দিয়ে, মাথায় একটা মুসলিম লীগের টুপি পরে চেয়ারে বসে থাকে। আশেপাশে তার অনেক লোক। পেছনের দেয়ালে জিন্নাহর ছবি। কেরামত তাকে হুঁকো সেজে দিতে দিতে লোকজনকে বলে, তোমরা এখন থিকা হুজুররে সলিম খান বইলা ডাকবা।
এক মুরুব্বি প্রশ্ন করেন, ও সলিমুদ্দি, তুমি খান হইলা কেমনে!
কেরামত সবাইকে বোঝায়, উনার পূর্বপুরুষ কান্দাহার হইতে দিল্লি হইয়া ঘোড়ায় চড়িয়া বঙ্গাল মুল্লুকে আইসা হাজির হইছিলো। দিল্লির শাসক ইব্রাহিম খান লোদির পানিপথের যুদ্ধে বাবরের নিকট পরাজয় ঘটিলে, প্রাণ বাঁচাইতে হুজুরের পূর্বপুরুষ বঙ্গাল মুল্লুকে আইসা পড়েন। মধুমতী নদীর গর্ভে হুজুরের পূর্বপুরুষের কবর বিলীন হইয়া গেছে।
অতীতে পয়সার হাটের লোকদের মুখস্থ করতে হয়েছিলো, জমিদার ধনঞ্জয় সাহার পূর্বপুরুষ আর্যবংশোদ্ভূত। রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজসভায় উনার পূর্বপুরুষ স্বরচিত কবিতা পাঠ করতো। তারপর মধ্য এশিয়ার হুনদের আক্রমণে গুপ্তবংশ লুপ্ত হবার জোগাড় হলে, উনার পূর্বপুরুষ প্রাণরক্ষার্থে পরিচয় গোপন করে পয়সার হাটে এসে স্বর্ণালংকার তৈরির কাজ শুরু করে। কথিত আছে, খ্যাতিমান ব্যবসায়ী জগতশেঠ তাদের কাছে স্বর্ণালংকার কিনতেন। বহু পরে সেই স্বর্ণালংকারের নিপুণ কারুকাজে ব্রিটিশ সাহেবের স্ত্রী মুগ্ধ হলে, আবার আর্যবংশের হৃত মর্যাদা ফিরে আসে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি লাভের পর, নেহাত এলাকার লোক সাহা নামে চেনে বলে আর টাইটেল পরিবর্তনের দরকার হয়নি। প্রণব মুখুজ্জের মতো কতো উচ্চবর্ণের লোকই তো জমিদার সাহার আনুকূল্যে বেঁচে আছে।
সলিমুদ্দির খান বংশের ঠিকুজি মুখস্থ করতে করতে পেরেশান পয়সার হাটবাসীর সামনে আবার কলিমুদ্দির বংশলতিকা এসে পড়ে। নেহাত গরিব ছিলো বলে চৌধুরী পরিচয় লুকিয়ে এতদিন নাকি কলিমুদ্দি হয়ে বেঁচে ছিলো সে। এখনো মধুমতী নদীর নিচে প্রত্নখনন করলে পূর্বপুরুষের শানবাঁধানো পুকুরভরা মাছ, গোয়ালভরা গরু আর গোলাভরা ধান পাওয়া যাবে। চৌধুরী বংশের এক লোকের কলিকাতায় গিয়ে জুয়া খেলার বদভ্যাস থাকায় এই অভিজাত বংশটি নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলো।
প্রথমে ধনঞ্জয় সাহা ও পরে সলিমুদ্দি-কলিমুদ্দির বংশীয় আভিজাত্যের গল্প শুনে শুনে কার্ল মার্কস পাঠচক্রের আলম, তারা, মফিজ মুখ ভার করে চিত্তরঞ্জনকে জিজ্ঞেস করে, আমাদের অভিজাত হবার উপায় কী!
--তোমরা জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের বেশভূষা ধারণ করো। প্রত্যহ আকাশবাণী শুনে প্রমিত বাংলা ভাষা শেখো। আর ফর্সা দেখিয়া মেয়ে খুঁজিয়া দ্বারপরিগ্রহ করো। তাহাদিগকে সাজাইবে রবীন্দ্র ছোটগল্পের নায়িকার মতোন। কথা বলার সময় আরবি-ফারসি বাদ দিয়া সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করিবে। গোশত না বলিয়া মাংস বলো, পানি না বলিয়া জল বলো, গোসল না বলিয়া স্নান বলো।
তারা মিয়া প্রশ্ন করে, স্নান আবার কী!
--আরে, চান করা যাকে বলে। আর সলিমুদ্দি ও কলিমুদ্দিকে কথায় কথায় মোছলা বলিয়া কটাক্ষ করো। মধ্যযুগীয় বর্বর কথাটি মুখস্থ করিয়া রাখো।
মফিজ চক্ষু কপালে তুলে জিজ্ঞেস করে, চিত্তদা, এত কথা কি মার্কসের বইয়ে লেখা আছে! তুমি এতসব শিখিলে কেমনে!
--পণ্ডিত মশাইয়ের কৃপা সবই। প্রণব মুখুজ্জের অভিধানে সব লেখা আছে!



পাঠকের মন্তব্য