প্রণব মুখুজ্জের অভিধান
পয়সার হাটে রেলস্টেশনের পাশে সিনেমা হল নির্মিত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই তরুণেরা দল বেঁধে সেই নির্মাণকাজ দেখতে যায়। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে সেই সিনেমা হলের খবর।
খবরটা পেয়ে গওহরডাঙ্গা থেকে জামায়াতের মওলানা আব্বাস শাহ ছুটে আসেন মুসলিম লীগের নেতা সলিম খানের কাছে। এই সিনেমা হল নির্মিত হলে এলাকার নারী-পুরুষ বেলেল্লাপনা শিখবে; পয়সারহাটের কেউ আর বেহেশতে যেতে পারবে না; এমন ফতোয়া দিয়ে মওলানা সাহেব সলিম খানকে এই নির্মাণকাজ বন্ধ করতে বলেন।
সলিম খান মওলানাকে সঙ্গে নিয়ে সার্কেল অফিসার শুকচান আলী মণ্ডলের সঙ্গে দেখা করতে যান। সলিম খান বলেন,
আপনি নিজেও পরহেজগার মানুষ। দয়া করে এই বেলেল্লাপনা বন্ধ করুন।
সার্কেল অফিসার কিছুক্ষণ গম্ভীর থেকে বলেন, প্রচলিত আইনে প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণে বাধা নেই। সরকারি অনুমতি নিয়েই এটি নির্মিত হয়েছে। আমার তো এখানে কিছুই করার নেই, জনাব।
মওলানা সাহেব রেগে গিয়ে সলিম খানকে বলেন, এই জন্য আমরা পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছিলাম। বিলেত থেকে বেলেল্লাপনা শিখে আসা একটা লোকের হাতে কুফরিস্তান তৈরি হবে; এটাই তো স্বাভাবিক।
মওলানা আব্বাস শাহ রাগে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে গেলে সলিম খান তাঁর পেছনে পেছনে গিয়ে তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করেন।
চিত্তরঞ্জন তাঁর সঙ্গীসাথী নিয়ে সার্কেল অফিসারের কক্ষে ঢোকে। একটি দরখাস্ত মেলে ধরে বলে,
--আমরা তো আগেই ভালো ছিলাম। ব্রিটিশ আমলে পয়সার হাটে গো-হত্যা নিষিদ্ধ ছিল। অথচ এখন প্রত্যেক শুক্রবার গো-মাংস বিক্রি হয় এখানে। বেড়াল-কুকুর ও পাখিরা গোমাতার হাড়-নাড়ি-ভুঁড়ি নিয়ে গিয়ে আমাদের বাড়ির উঠোনে ফেলে। এতে আমাদের ধর্ম নষ্ট হয়। আপনি এই গো-হত্যা বন্ধ করুন, মহোদয়।
শুকচান মণ্ডল গম্ভীরভাবে বলেন, দেশের প্রচলিত আইন বেড়াল-কুকুর ও পাখির ওপর কীভাবে প্রয়োগ করা যায়; আপনারা সে ব্যাপারে পরামর্শ দিন। কাউকে গো-হত্যায় বাধ্য করা কিংবা কাউকে গো-হত্যা বন্ধ করতে বাধ্য করার মতো কোনো আইন আমার হাতে নেই।
কালিদাস তীব্র বিবমিষা নিয়ে বলে, বুঝেছি, আপনারা দেশটাকে হিন্দুশূন্য করতে চান। আপনি ইচ্ছা করেই এই গো-হত্যার মতো মধ্যযুগীয় বর্বরতা বন্ধ করতে চান না।
--আমি বলি কী, হিন্দু-মুসলমান যে যার মতো থাকুন। আরেকজন কী খাবে, কী পরবে, কীভাবে চলবে; তা যেন আমরা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা না করি। আর সেটাই আধুনিক যুগীয় সভ্যতার পূর্বশর্ত।
রাগে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে যায় চিত্তরঞ্জন, কালিদাস প্রমুখ।
তারা মিয়া বলে, সার্কেল অফিসারের দাড়ি-টুপি দেখেই আমি বুঝেছিলাম, এ হলো মোছলা; তার কাছে সেকুলার কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে না। মফিজ দাঁত কেলিয়ে ফ্যাচফ্যাচ করে হাসে।
ধনঞ্জয় বহুমুখী বিদ্যাপীঠের ছাত্রেরা যখন রোজকার অ্যাসেম্বলিতে 'পাক সার জমিন সাদবাদ' গায়; প্রধানশিক্ষক প্রণব মুখুজ্জে তখন কানে তুলো দিয়ে নিজ কক্ষের দরজা-জানালা বন্ধ করে বসে থাকেন। শ্যামাপদ মুখার্জির ফটোর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে গাইতে থাকেন, জনগণমন অধিনায়ক জয় হে ভারত ভাগ্যবিধাতা।
হঠাৎ দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে চিত্তরঞ্জন, কালিদাস, মফিজ, তারা মিয়া ও আলম। তাদেরকে দেখে প্রণব মুখুজ্জে ধ্যানস্থ হয়ে পড়েন। সবাই তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অবশেষে তিনি চোখ খুলে সবাইকে বসতে বলেন।
চিত্তরঞ্জন অভিযোগ করে, এ দেশকে হিন্দুশূন্য করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। সার্কেল অফিসার আমাদের কোনো অভিযোগ শুনছে না।
মুখুজ্জে বাবু বলেন, ধৈর্য, ধৈর্য; রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ধৈর্য। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র গ্রন্থখানি খুলে বলেন, সলিমুদ্দি মুসলিম লীগের নেতা হওয়ায় তাঁর বন্ধু কলিমুদ্দি নেতা হতে না পেরে শত্রুতে পরিণত হয়েছে। শত্রুর শত্রু হলো তোমাদের বন্ধু। মুসলিম লীগ ভেঙে যে আওয়ামী মুসলিম লীগ হচ্ছে; দেখবে কলিম তার নেতা হবে। কাজেই কলিমের সঙ্গে সখ্য বাড়াও।
মফিজ বলে, পণ্ডিতমশাই, কলিমও তো মোছলা। মধ্যযুগীয় বর্বর।
--আমার কথা খুব মন দিয়ে শোন। জমিদারবাবু মৃত্যুশয্যায়। তাঁর বাড়ির নিচতলাটি প্রায় পরিত্যক্ত। সেইখানে নিখিল বঙ্গ কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্র গড়ে তোলো। সূর্যসেন গ্রন্থাগার, প্রীতিলতা সংগীত ও কলা বিদ্যালয় থাকবে সেখানে। আর থাকবে কার্ল মার্কস পাঠকেন্দ্র। এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক করো কলিম চৌধুরীকে। তাকে উচ্চবর্ণের সম্মান দাও। দেখবে, টাকা-পয়সার আর অভাব হবে না।
কালিদাস জিজ্ঞেস করে, পণ্ডিতমশাই, এত সংস্কৃতিচর্চার বিষয়। কিন্তু রাজনীতিটা যে আমাদের হাতের বাইরে বেরিয়ে গেল।
--ওরে বোকা, সংস্কৃতিকে শাসন করতে পারলে রাজনীতি এসে আপনাআপনি হাতের মুঠোয় ধরা দেয়। ইতিহাস আর সংস্কৃতির বয়ান নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে মানুষের চিন্তার রাজত্বে রাজা হয়ে বসা যায়। এবার যাও দেকিনি; আমার আবার জলখাবারের সময় হয়েছে। জয় হিন্দ। বন্দে মাতরম।
তারা মিয়া, আলম, মফিজ সোৎসাহে জয় হিন্দ, বন্দে মাতরম স্লোগান দেয়।
চিত্তরঞ্জন ও কালিদাস তাদের শান্ত করে আদুরে বেড়ালের ভঙ্গিতে নম্রপদে বিদ্যাপীঠ থেকে বেরিয়ে যায়।



পাঠকের মন্তব্য