রাষ্ট্রীয় রাজনীতি আর সাইবার জগতের মারপ্যাঁচে সাধারণ মানুষের জীবন যে কতটা নাটকীয় হতে পারে, তার এক অবিশ্বাস্য প্রমাণ মিলল রাজধানী ঢাকার উত্তরার এক তরুণীকে কেন্দ্র করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি পুরনো সাক্ষাৎকার—যেখানে তিনি সগর্বে বলেছিলেন, আমি মিম খুব এনজয় করি—সেটিকে এবার এক ভিন্ন এবং হাস্যকর মোড়ে নিয়ে গেছেন উত্তরা নিবাসী তরুণী মিম আক্তার। প্রধানমন্ত্রী তাকে বা তার নামকে জড়িয়ে এমন মন্তব্য করেছেন দাবি করে তিনি খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরুদ্ধেই সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করার ঘোষণা দিয়েছেন!
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে যখন আইনটির সাম্প্রতিক সংশোধনী প্রস্তাব নিয়ে চারদিকে আলোচনা শুরু হয়। আইনটির প্রস্তাবিত ২৬ক ধারায় ‘গুজব’ এবং ‘অপতথ্য’ ছড়ানোর অপরাধে অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড এবং ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানের বিধান রাখা হয়েছে। উত্তরার কলেজপড়ুয়া তরুণী মিম হঠাৎ খেয়াল করেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় তা্র নিজের নামে নানা ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন ও মিম ছড়িয়ে পড়েছে। লোকজন তাকে দেখলেই বলছে, প্রধানমন্ত্রী তো নিজেই ‘মিম’ ভালোবাসেন!
এতে মারাত্মক ক্ষুব্ধ হয়ে মিম সরাসরি সাইবার ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হন। তার অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী দেশের সর্বোচ্চ দায়িত্বে থেকে প্রকাশ্যে আই লাভ মিম বলে তার ব্যক্তিগত সুনাম ও সামাজিক মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছেন। মিমের আইনজীবীর যুক্তি আরও চমৎকার—আইন যদি গুজব ও অপতথ্যের জন্য ৪০ লাখ টাকা জরিমানের বিধান রাখতে পারে, তবে প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন তা ডিজিটাল স্পেসে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে এবং এতে সাধারণ নাগরিক মিম মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন। তাই সাইবার সুরক্ষা আইনের আওতায় অবিলম্বে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও সমন জারি করা হোক এবং ৪০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ বা জরিমানা আদায় করা হোক!
এদিকে এই মামলায় আদালত চত্বরে শুরু হয়েছে তুমুল হইচই। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা বড় বিপদে পড়েছি। প্রধানমন্ত্রী একটা রূপক অর্থে ইন্টারনেটের ফানি ছবি বা মিম (Meme)-এর কথা বলেছিলেন, আর উত্তরা থেকে নামের তরুণী এসে হাজির যে সেই মিম আসলে তিনিই! এখন আইন অনুযায়ী মিমকে তো আর ১০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া যায় না, কিন্তু মামলার কাগজপত্রে যেভাবে ধারা যুক্ত করা হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে অচিরেই meme বনাম মিম দ্বৈরথ দেখতে হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সাইবার সুরক্ষা আইনের অস্পষ্ট ধারা আর অতি-উৎসাহী মানসিকতা যখন একত্রে মিলিত হয়, তখন এমন আইনগত প্রহসন তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। যে আইন নাগরিকদের বাক্স্বাধীনতা হরণ করতে তৈরি হচ্ছে বলে টিআইবি ও ব্লাস্টের মতো সংগঠনগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করছে, সেই আইনের খড়্গ শেষ পর্যন্ত কার ঘাড়ে গিয়ে পড়বে—তার এক চমৎকার নমুনা হয়ে রইল উত্তরার মীম ও রাষ্ট্রপতির মিম প্রীতি। এখন দেখার বিষয়, ৪০ লাখ টাকার এই আইনি মারপ্যাঁচ আদালত কীভাবে সামলায়!


