প্রণব মুখুজ্জের অভিধান (নবম পর্ব)

২০ পঠিত ০ ... ৩ ঘন্টা ২০ মিনিট আগে

 

পয়সার হাটে নগরায়নের ছোঁয়া লাগে। বোয়ালমারীতে একটি চিনিকল প্রতিষ্ঠিত হয়, চিতলমারীতে হয় পাটকল আর আলফাডাঙ্গায় গড়ে ওঠে টেক্সটাইল মিল। সলিম খান ও কলিম চৌধুরী মিলে গড়ে তোলেন জিন্নাহ কলেজ। কলিম চৌধুরীর সাহায্য নিয়ে চিত্তরঞ্জন ও কালিদাস গড়ে তোলে রাণী ভবানী বালিকা বিদ্যালয়।

জিন্নাহ কলেজের প্রিন্সিপাল হয়ে আসেন আজিজুল হক। তিনি বর্ধমান থেকে এক কাপড়ে পালিয়ে আসেন। সঙ্গে করে নিয়ে আসেন বেঙ্গল রেনেসাঁর আলো। বংকিমচন্দ্র মুখস্থ তার। রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনে ঘুমিয়ে যান, আবার ঘুম থেকে ওঠেন। দেশ বিভাগের ফলে পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে শরণার্থী হওয়া মানুষের বেদনা নিয়ে গল্প-উপন্যাস লিখতে শুরু করেছেন। আনন্দবাজার ও মধুমতীর আলোয় সেসব লেখা প্রকাশিত হয়। কথায় কথায় মহাভারত আর রামায়ন থেকে উদ্ধৃতি দেন অধ্যক্ষ হক।

ফলে নিখিল বঙ্গ কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রে তিনি হার্ট থ্রব হয়ে পড়েন। অসাম্প্রদায়িকতার মূর্ত প্রতীক হিসেবে প্রণব মুখুজ্জেকে পিছে ফেলে আজিজুল হক আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর হয়ে পড়েন। খদ্দরের পাঞ্জাবির ওপর শান্তি নিকেতনী শাল জড়িয়ে জমিদারের ভঙ্গিতে তিনি চলাফেরা করেন। চলনে বলনে কথনে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘরে-বাইরে উপন্যাসের সন্দীপের মতো। ফলে রাণী ভবানী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিজয়া দত্তকে তিনি বিমলা হিসেবে আবিষ্কার করেন যেন। বিজয়া ম্যাডামের বৈঠক খানায় বসে তার কন্ঠে নজরুল সংগীত শুনতে শুনতে আজিজুল হক সুরের জগতে হারিয়ে যান।

মন্দিরের পাশে বটবৃক্ষের নীচে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটিতে আসা কৃষক ও কারিগরের ছেলেরা আজিজুল হকের মাঝে পয়সার হাটের রেনেসাঁর আলো আবিষ্কার করে। স্যারের মুখে সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টোটলের গল্প শুনে ঋদ্ধ হয় তারা।  নিজেরাও কথায় কথায় সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টোটলের নাম জপতে শুরু করে।

তারা আকুল হয়ে নিখিল বঙ্গ কলা ও সংস্কৃতিকেন্দ্রে ছুটে যায়। এই জমিদার বাড়িতে '৪৭-এর আগে ঘাসের মধ্যে বসে থাকতো তাদের পিতৃপুরুষ। নারকেলের খুলি দিয়ে তৈরি হুকোয় সস্তা তামাক আর খাজনা বাকি রাখলে জমিদার ধনঞ্জয় বাবুর চাবুকের দাগ নিয়ে বাড়ি ফেরা; পূর্বপুরুষের পিঠে সেই রক্তজবার ক্ষত বিস্মৃত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়া ছেলেরা এখন বেঞ্চিতে বসে 'আনন্দমঠ' গ্রন্থের স্টাডি সার্কেল করে।

কাঠ মিস্ত্রির ছেলে চিত্তরঞ্জন, কলকাতার ফুটপাথে হার্বাল বিক্রেতার ছেলে কালিদাস যদি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি সংস্কৃতি চর্চা করে এমন অভিজাত হতে পারে; কৃষক-কারিগরের ছেলেরাও পারবে।

বৃটিশ আমল জুড়ে বৃটিশের কোলাবরেটর হিন্দু-জমিদারের প্রথম প্রজন্মের শিক্ষিত ছেলেরা পূর্ব বঙ্গের মুসলমানকে নিম্নবর্গের হিন্দুদেরও নীচে জায়গা দিয়েছিল; যে কারণে জমিদার বাড়িতে হিন্দু প্রজাদের শেতল পাটিতে বসতে দেয়া হতো। পেতলের হুঁকোতে একটু উৎকৃষ্ট তামাক সেবন করতে দেয়া হতো। বেঙ্গল রেনেসাঁর আলোকিত হিন্দুরা মুসলমানদের বাঙালি বলে স্বীকৃতি দিতে নারাজ ছিল। কিন্তু কৃষক প্রজার আন্দোলনে জমিদারি উচ্ছেদ হলে, এখন কৃষকের ছেলেদের জমিদার বাড়িতে বেঞ্চিতে বসিয়ে অসাম্প্রদায়িকতার চারুপাঠ দেয়া চলছে।

এখন গওহরডাঙ্গায় পশ্চিম পাকিস্তান থেকে যে পাঞ্জাবি এসডিও এসেছে; তার পিতাও বৃটিশের কোলাবরেটর হিসেবে পাঞ্জাবের জমিদারি পেয়েছিলো। কল্পনায় তারা এতটাই আর্য হয়ে গেছে যে, পূর্ববঙ্গের মুসলমানকে সাচ্চা মুসলমান হিসেবে মানতে নারাজ। কলকাতা ও লাহোরের বৃটিশ কোলাবরেটরের ছেলেদের ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্সজাত যে খেলনা সুপিরিয়রিটির বোধ তা আইডেন্টিক্যাল। ঠিক ঐ মেগালোম্যানিয়া তৈরি হচ্ছে পূর্ব বঙ্গের নতুন শিক্ষিত প্রজন্মের মাঝে। গৌরবে মাটিতে পা পড়ে না তাদের। সমাজের স্বশিক্ষিত মানুষদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা ছাড়া আভিজাত্য অর্জনের আর কোন পথ জানা নেই তাদের সামনে।

জমিদারের অত্যাচার বাদ দিলে পয়সার হাটে হিন্দু-মুসলমান মায়াময় একটি সমাজ ছিলো। কিন্তু নগরায়নের অভিঘাতে বেশ কিছু লোক সেন্স অফ এনটাইটেলমেন্ট নিয়ে হাজির হওয়ায়;  কলা ও সংস্কৃতিকেন্দ্রে 'ভদ্রলোক' হবার একশোটি কৌশল আর 'ছোটলোক'-কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার একশটি কৌশল শিক্ষা হওয়ায়; এই জনপদে সরলতা ও মায়া ক্ষয়ে যেতে থাকে।

হিন্দু কৃষক ও কারিগরের ছেলেরা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটিতে এসে  বাবার কাজে সাহায্য করে। ক্ষুদে দোকানির ছেলেটি বাবাকে একটু বিশ্রামের সুযোগ দিতে দিনমান দোকানে বসে থাকে। আর মুসলমান কৃষক ও কারিগরের ছেলেদের নিজের পিতাকে 'ছোট' মনে হয়। তাই তার ছোট কাজে সাহায্য না করে ভদ্রলোক হবার জন্য কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্র, মধুমতীর আলো ইত্যাদি আলোর দোকানে দৌড়াদৌড়ি করে।

নিশাত সিনেমাহলে উর্দু-হিন্দি ও বাংলা চলচ্চিত্র দেখে, পয়সার হাটের মেয়েরা ফ্যাশান সচেতন হতে থাকে। শিল্পী ফটো স্টুডিওতে মেয়েরা হাতে ফোন হাতে, ডানে ও বামে উদাস চোখে তাকিয়ে সিনেমার নায়িকার ঢঙ্গে ছবি তোলে।

গ্রামের কোন ছেলে ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হলে, ঢাকা থেকে কোন সেকশন অফিসার, দারোগা কিংবা হাফ ইঞ্জিনিয়ারের মেয়েকে বিয়ে করে পয়সার হাটে ঘোরাতে নিয়ে এলে অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না তাদের। ঢাকার বিরাট এলিট ফ্যামিলি থেকে এসেছে; এই ভ্রান্ত অধ্যাসে সবাইকে শেখাতে থাকে কি পরতে হবে, কি খেতে হবে, কিভাবে চলতে হবে। ঢাকা শহরের ছোট্ট একটা সরকারি কোয়ার্টারে বড় হওয়া মেয়েটি এমন গপ্পো চাঁড়ে যেন, ঢাকায় সে রাজপ্রাসাদে বসবাস করে।

উনিশ শতকের কোলকাতা ও লাহোরে যেরকম ভদ্রলোক সাজার উদগ্র বাসনা তৈরি হয়েছিল; ১৯৪৭-এর পরে ঢাকায় সে একই উন্মত্ত বাসনা তৈরি হয়। আর সেই ভদ্রলোক সাজার অগ্নুতপাতে কিছু লাভা উদগীরিত হয়ে পয়সার হাটেও এসে পড়ে।

(চলবে)

৮ম পর্বের লিংক 

২০ পঠিত ০ ... ৩ ঘন্টা ২০ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top ​