প্রণব মুখুজ্জের অভিধান (দশম পর্ব)

১৯ পঠিত ০ ... ১২ ঘন্টা ৪ মিনিট আগে

মুসলিম লীগের হোমরাচোমরা লোকেরা শেরওয়ানি পরে ও মাথায় টুপি দিয়ে মজুমদার, তালুকদার, তরফদার, হাওলাদার ইত্যাদি টাইটেল বরণ করে টিনের আটচালা ঘর তুলে মেঝে পাকা করতে শুরু করেছে। এমনভাবে পালংক ও আলমিরা বানাতে থাকে; যেন বলতে পারে পূর্বপুরুষ এসব রেখে গেছে। হরিণের চামড়া, গাদা বন্দুক দেয়ালে ঝুলিয়ে গপ্পো দিতে থাকে, আমার আব্বা হুজুর শিকারে যাইতেন। তারা রেডিওতে নূরজাহানের গান আর বড়ে গুলাম আলী খাঁর গজল শুনতে শুনতে চোখে সুরমা দেয়; পান চিবিয়ে পিকদানিতে পিক ফেলতে থাকে; পেতলের হুকো টানতে টানতে 'পার্টি ইন পাওয়ারে'র গর্বে চোখ তাদের সজল হয়ে ওঠে। কন্যারা তাদের চুড়িদার পাজামার সঙ্গে সাদা কামিজের ওপর ওড়না পরে 'বেলি' চলচ্চিত্রের নায়িকা মুখতার বেগমের মতো চোখে কাজল আঁকতে শুরু করে। কেউ কেউ হারমোনিয়ামে গলা সাধে,

আমায় নহে গো ভালোবাসো শুধু

ভালোবাসো মোর গান

বনের পাখিরে কে চিনে রাখে

গান হলে অবসান।

 

মুসলিম লীগের লোকের ছেলেরা কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রের কার্ল মার্ক্স পাঠচক্র, বংকিমের 'আনন্দমঠ' পাঠ, ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো সমাজ পরিবর্তনের ডাক, প্রণব মুখুজ্জের অভিধান মুখস্থ করার মাঝ দিয়ে প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল হয়ে ওঠে। ঘরে লেনিনের ছবি ঝুলিয়ে বিপ্লবের অপেক্ষা করে। প্রগতিশীলতা এমন এক জিনিস এ গ্রামে, যেখানে চিত্তরঞ্জন পুজো আর্চা করলেও তা আধুনিক; আর সলিম খান নামাজ পড়তে গেলে তা মধ্যযুগীয়। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সূর্যসেন ও প্রীতিলতাকে উদযাপন উদারনৈতিক আর ফকির মজনু শাহ, হাজি শরিয়ত উল্লাহকে স্মরণ মৌলবাদ। কাঠ মিস্ত্রির ছেলে চিত্তরঞ্জন আর কলকাতার ফুটপাতের হারবাল বিক্রেতার ছেলে কালিদাস পয়সার হাটে সাংস্কৃতিক আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। চলায় বলায় গলায় চিন্তায় তাদের মতো হবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকে পয়সারহাটের কিছু ছেলে। কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রের প্রীতিলতা ব্রিগেডের মেয়েরা কলকাতার চলচ্চিত্রের মালা সিনহার মতো করে সাজে। কেউ কেউ হারমোনিয়ামে গলা সাধে,

ভালোবেসে, সখী, নিভৃতে যতনে

আমার নামটি লিখো– তোমার

মনের মন্দিরে।

 

প্রণব মুখুজ্জের মেয়ে কল্পনা প্রগতিশীলতার নামে সাম্প্রদায়িকতার ছলটি ধরতে পারে। সে তাই কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রে আসা বন্ধ করে দেয়। রাণী ভবানী বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় মন দেয়। ছাত্রীদের মনপ্রাণ দিয়ে পড়ায়। কালিদাস বার বার ছুটে আসে। জানতে চায়, কেন সে আর কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রে আসে না! বেশি কথায় না গিয়ে কল্পনা উত্তর দেয়, আমি ঘরের কাজ আর শিক্ষকতা নিয়ে ব্যস্ত। অন্য কিছুর সময় নেই আমার হাতে।

পয়সার হাটে হঠাৎ কিছু পাগলের উদয় হয়। তাদের উস্কোখুস্কো চুল, ময়লা জামা। কিন্তু হাত-পায়ের নখ খুব পরিচ্ছন্ন। কচুক্ষেতের নীল কমল মহলের বারান্দায় এরা রাতে ঘুমায়। ম্যানেজার জুলফিকারের দয়ার শরীর তাই এই পাগলদের খেতে দেয়। পাগলদের জ্বর সর্দি কাশি হলে কালিদাস তাদের মিক্সার খাইয়ে দেয়।

এরমধ্যে পয়সারহাটে মন্দিরের মূর্তি ভাঙা, গরুর হাড় ছুঁড়ে মারার মতো অঘটন ঘটতে থাকে। 'মধুমতীর আলো'তে একটার পর একটা উপসম্পাদকীয় লিখতে থাকেন অধ্যক্ষ আজিজুল হক। মন্দিরের পাশের বটতলা থেকে বেশ কিছু নতুন কলামিস্ট তৈরি হয় অধ্যক্ষ হকের আলোর দোকানের ইয়ং বেঙ্গল প্রকল্পের উঠতি বুদ্ধিজীবী হিসেবে। 'মূর্তি ভাঙ্গা প্রকল্প, হিন্দুশুন্য করার ছল', 'আমার ব্যথার পূজা হয়নি সমাপণ', 'মৌলবাদের উত্থান-অসাম্প্রদায়িকতার ঘোর অমানিশা', 'সময় তোর অনুকূলে নয় সুবোধ, সংখ্যালঘু নির্যাতন বাড়ছে'; ইত্যাদি শিরোনামের কলাম পয়সারহাটের হিন্দুদের সন্ত্রস্ত করে। শ্যামাপদ, অসিত পাল, কল্পনা হিন্দুদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বোঝাতে থাকে, মধুমতীর আলোর উস্কানিতে পা দিওনা। কারা মূর্তি ভাংছে, গরুর হাড় ছুঁড়ছে; তা খুঁজে দেখা হচ্ছে। আজ হোক কাল হোক এই রহস্যের উদঘাটন হবেই।

কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্র 'সংখ্যালঘু বাঁচাও' লেখা বড় ব্যানার নিয়ে পয়সার হাটের স্থানে স্থানে পথসভা ও পথনাটক করে। কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রের ছেলেরা কালো টুপি আর কালো কাপড় পরে, ঢোল বাজিয়ে চারপাশ থেকে এসে ফুলের মুকুট আর মালা গলায় দেয়া একটি মেয়ের সামনে তরবারি মেলে ধরে। মেয়েটি ভয় পেয়ে পেয়ে চমকে ওঠার ভঙ্গি করতে থাকে। বর্ধমান থেকে এক কাপড়ে পালিয়ে আসা  অধ্যক্ষ আজিজুল হক দেশ বিভাগে হিন্দুদের বেদনা আর মধ্যযুগীয় বর্বর মুসলমানদের কর্কশতা নিয়ে তার 'তুলসি গাছ ও বখতিয়ারের তরবারি' গল্পপাঠ করেন, মধুমতীর আলোর সাহিত্য পাতা খুলে। চিত্তরঞ্জন ও কালিদাস 'সংখ্যালঘু' শব্দটি প্রায় একশোবার বলে পয়সারহাটের হিন্দু জনগোষ্ঠীর মস্তিষ্কে সংখ্যালঘু শব্দটি ঢুকিয়ে দেয়।

এসব দেখে ও শুনে পয়সারহাটের কিছু মুসলমানের মনে সংখ্যাগুরুর গর্ব উতপাদিত হয়। তারা বেশ রোয়াব নিয়ে গলার রগ ফুলিয়ে কথা বলতে শুরু করে। ঠিক এসময় মসজিদ প্রাঙ্গণে আরবি লেখা একটি পৃষ্ঠা অর্ধেক পোড়া অবস্থায় পাওয়া যায়। ইমাম সাহেব নামাজিদের বোঝাতে চেষ্টা করেন, এটা কোরানের পৃষ্ঠা নয়। উর্দু কবিতার একটি পৃষ্ঠা। কিন্তু এই ঘটনার প্রতিবাদে কারাগারে অনশন শুরু করে মওলানা আব্বাস শাহ। তার শারীরিক অবস্থার  অবনতি ঘটলে জেল কর্তৃপক্ষ তাকে মুক্তি দেয়। ফুলের মালা গলায় দিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে আব্বাস শাহ পয়সার হাটে এসে নামেন। নারায়ের তাকবির আল্লাহু আকবর শ্লোগানে বাতাস মথিত হয়।

ওদিকে নিজগৃহে আবার ধ্যানস্থ হয়ে পড়েছেন পণ্ডিত প্রণব মুখুজ্জে। চিত্তরঞ্জন ও কালিদাস তার সঙ্গে দেখা করতে আসে। মুখুজ্জে মশাইয়ের ধ্যান ভাঙ্গলে তিনি বলেন, চোখ বন্ধ করে উনুনের ওপরে তাওয়ার মধ্যে ঘি ফুটতে দেখছিলাম। মনে হচ্ছে তাওয়া যথেষ্ট গরম হয়েছে, এখন এতে পরোটা ভাজা যাবে।

(চলবে)

 

৯ম পর্বের লিংক

১৯ পঠিত ০ ... ১২ ঘন্টা ৪ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top ​