প্রণব মুখুজ্জের অভিধান (একাদশ পর্ব)

১৯ পঠিত ০ ... ১৩ ঘন্টা ৪১ মিনিট আগে

পয়সারহাট জনপদটার একটা নিজস্ব সংস্কৃতি ছিলো। স্বশিক্ষিত মানুষ, মক্তব ও টোলে পড়া মানুষেরা তাদের দিনমান কৃষিকাজ, কামার, কুমার, জেলে ও জোলার কাজের পর; অবসরে পুঁথিপাঠের আসর বসাতো। জারি, সারি, মুর্শিদী, মারফতি, কীর্তন, কাওয়ালি, ভাটিয়ালি গানের আসরে প্রাণের আনন্দ খুঁজে নিতো।  মুখে মুখে কবিতা বানিয়ে কবির লড়াই হতো। এমনকি গওহরডাঙ্গার খৃষ্টীয় চার্চে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গা থেকে পাদ্রি, আলেম, পুরোহিত এসে ধর্ম সংক্রান্ত বাহাজ করতেন। ধর্ম সেখানে জীবন দর্শনের মতো আলোচিত হতো। সুলতানি আমল থেকে গড়ে ওঠা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মূল্যবোধ ধর্ম বিভাজনের কোন দেয়াল তুলতে দেয়নি এ অঞ্চলে।

বৃটিশ ম্যাজিস্ট্রেট এসে মুসলমানদের মুঘল আমলে পাওয়া লাখেরাজ সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে নব্য জমিদার সাহা বাবুকে উপহার দিয়ে যাবার পর থেকে সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানদের প্রান্তিক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়। কৃষক জমি হারিয়ে জমিদারের দাসে পরিণত হয়; কারিগরদের একটা আড়ং ছিলো পয়সার হাটে; সওদাগরের নৌকা ভিড়তো গঞ্জে; সেসব বিলুপ্ত করলে প্রথমবারের মতো ভিক্ষুক দেখা যায় পয়সার হাটে, কৃত্রিমভাবে তৈরি করা দুর্ভিক্ষে প্রতি পরিবারে তিনজনের মাঝে অন্তত একজন মারা যায়।

দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে প্রচলিত ফার্সি ভাষা সরিয়ে ইংরেজি ভাষা প্রচলন শুরু হয়। কলকাতায় হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা করে; বৃটিশদের পক্ষে বয়ান নির্মাণের জন্য বুদ্ধিজীবী তৈরি হয়। বৃটিশের সহযোগিতায় বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও গদ্যরীতি তৈরির ছলে; পাঁচশো বছর ধরে জনপদের বাংলা ভাষায় মিশে যাওয়া আরবি, ফার্সি শব্দ বাদ দিয়ে মৃতপ্রায় সংস্কৃত শব্দ ঢুকিয়ে জনপদের ভাষা থেকে বই পুস্তক ও শিক্ষাদানের ভাষাকে আলাদা করে ফেলা হয়।

পয়সারহাটে ধনঞ্জয় সাহা বিদ্যালয়ে সেই সংস্কৃত শব্দে ঠাসা বাংলাভাষা শেখানো হয়। সংস্কৃত পণ্ডিত প্রণব মুখুজ্জে পয়সার হাটে সংস্কৃতি বলে কলকাতায় তৈরি হওয়া সংস্কৃত বহুল কৃত্রিম বাংলা ভাষার জোয়াল কাঁধে তুলে দিয়ে; পয়সারহাটে আবহমান কাল ধরে প্রচলিত কবিতা ও গানকে 'ছোটলোকে'-র কালচার বলে দেন। তিনি ভদ্রলোকের সংস্কৃতি হিসেবে আকাশবাণীর কৃত্রিম 'প্রমিত' ভাষা আর সংগীতকে ছাত্রদের ওপর চাপিয়ে দেন। বংকিম চন্দ্র চট্টোপধ্যায়কে সাহিত্য সম্রাট হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।

আপাত দৃষ্টিতে ধনঞ্জয় সাহার একটি জমিদারি থাকলেও; সংস্কৃতির জমিদার হিসেবে প্রণব মুখুজ্জে পয়সারহাটের জনমনোভূমিতে সংস্কৃত ভাষার উপনিবেশ গড়ে তোলেন। বৃটিশেরা কলকাতায় বেগুণী মুখমণ্ডলের, পেটমোটা, কৃশ লোকেদের মাঝে আর্য স্বপ্ন জারিত করেছিলো। জার্মানির আডলফ হিটলার যেমন বিশ্বাস করতেন, দার্শনিক ফ্রিডেরিখ নিটসে বর্ণিত আর্য জার্মানরা উতকৃষ্ট মানব; কলকাতা রেনেসাঁর লোকেরাও তেমনি মনে করতেন, জার্মানদের একটি ট্রাইব হাজার হাজার বছর আগে ভারত বর্ষে এসেছিলো; তারাই উচ্চবর্ণের হিন্দু। প্রণব মুখুজ্জে সেই কাল্পনিক উতকৃষ্টতা বুকে নিয়ে নিজেকে নিতসের উবারম্যান বা উতকৃষ্ট মানব ভাবতে শুরু করেন। ফলে পয়সারহাটের মানুষ তার চোখে নিতান্ত সাব অল্টার্ন-সাব হিউম্যান। জমিদার ধনঞ্জয়ের অন্নে লালিত প্রণব মুখুজ্জে আসলে যে ভিখারি বুদ্ধিজীবী আর পয়সারহাটের চাষী-কারিগর যে নিজের পরিশ্রমের অন্নে আত্মনির্ভরশীল শ্রমজীবী; এই সাধারণ জ্ঞানটুকু কখনো তার হয়নি।

বৃটিশের শত্রু ছিলো যেহেতু মুর্শিদাবাদের নবাব ও দিল্লির মুঘল বংশ; সুতরাং প্রণব মুখুজ্জের কাজ ছিলো ছাত্রদের সামনে নবাব ও মুঘলদের খলনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা। এতে মুসলমান শাসকের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশের বিমল আনন্দও থাকে। এইভাবে ইতিহাসের বয়ান ও সাংস্কৃতিক শাসনের মাধ্যমে এমনকি ধনঞ্জয়ের জমিদারি হারানোর পরেও প্রণব মুখুজ্জের অভিধান রাজত্ব করে পয়সার হাটে।

কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রের প্রাত্যহিক আড্ডায় তাই শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা মানেই দাড়ি-টুপি পরা মানুষকে নিয়ে হাসাহাসি। আজকাল চিত্তরঞ্জন আর কালিদাসকে বিশেষ কিছু আর বলতে হয়না। কৃষকের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়া ছেলেরা এখন নিজেদের বাপ-দাদাকে নিয়ে হাসাহাসি করে চিত্ত ও কালিদাদুকে মুগ্ধ করে। চিত্তদাদু যদি একবার মুখ ফুটে বলে যে, বাতেন বড্ড অসাম্প্রদায়িক; অমনি বাতেন একজন বিশিষ্ট 'ভদ্রলোক' হিসেবে ঘাড় কাত করে মধুমতীর আলো পত্রিকায় কলাম লিখতে শুরু করে, আমরা কি এই পয়সার হাট চেয়েছিলাম!

কলিম চৌধুরী তার মেয়ে সুলতানার সঙ্গে চিত্তরঞ্জনের প্রেম মেনে নিতে চায় না। কিন্তু সাংস্কৃতিক জুটি হিসেবে তাদের একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যত আছে। তাই অধ্যক্ষ আজিজুল হককে নিয়ে প্রণব মুখুজ্জে কলিম চৌধুরীর বাটি অভিমুখে যান। চেয়ারে বসে খানিকটা ধ্যানস্থ হয়ে তারপর চোখ খুলে বলেন, চিত্ত আর সুলতানা হচ্ছে রাজযোটক। এই বিবাহ আপনার গৃহে রাজভাগ্য নিয়ে আসবে কলিম সাহেব। প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আপনি হিন্দু-মুসলমান সকলের ভোট পেয়ে সলিম খানকে গোহারা হারিয়ে দেবেন।

কলিম চৌধুরী উত্তর দেন, পণ্ডিত মশাই, আমাদের যুক্তফ্রন্টের যে জনপ্রিয়তা; তাতে সলিম খান এমনিতেই গোহারা হারবে। কাঠ মিস্ত্রির ছেলের সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ে দিতে মন সায় দেয় না।

অধ্যক্ষ আজিজুল হক প্রতিবাদ করেন, চিত্তরঞ্জন অত্র এলাকার বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। আর সে প্রতিষ্ঠিত।

: ধনঞ্জয় বাবুর নীল কমল মহলের দেখাশোনাকে আপনি প্রতিষ্ঠা বলছেন প্রিন্সিপাল সাহেব। ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া আমি আর কারো সাথে সুলতানার বিয়ে দেবো না।

(চলবে)

 

দশম পর্বের লিংক 

১৯ পঠিত ০ ... ১৩ ঘন্টা ৪১ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top ​