১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে কলিম চৌধুরী জয়লাভ করে। মুসলিম লীগের প্রার্থী সলিম খান হেরে গিয়ে মুখ কালো করে বসে থাকে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে ডাক্তার হয়ে ফেরা ছেলেটি তার বারবার প্রেশার মেপে দেয়। সলিম খান বলে, শেরে বাংলা, ভাসানী, সুরাবর্দী একজোট হয়ে মুসলিম লীগের হাতে হারিকেন ধরাইয়া দিলোরে রাশেদ।
রাশেদ তার পিতাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। রাশেদ পুরো ছাত্রজীবন ছাত্র ইউনিয়ন করেছে। জমিদার ধনঞ্জয় সাহার ছেলে বরুণ সাহা যেমন কার্ল মার্কস পাঠচক্র গড়ে তুলেছিল; মুসলিম লীগ নেতা সলিম খানের ছেলে রাশেদ খানও স্বাভাবিকভাবেই সেই পথের পথিক হয়েছে। ধনাঢ্য পিতার সন্তান বামপন্থী হলে ধন-সম্পদ ও ক্ষমতার নিত্যতাসূত্র তৈরি হয় বলেই বোধ হয়; দুই বঙ্গে একই কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে সম্ভ্রান্ত হিন্দু ও মুসলমান পরিবারগুলো।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা এবং পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি জনগণকে আলোড়িত করে। ফলে যুক্তফ্রন্ট যুগান্তকারী জনসমর্থন পায়। কলিম চৌধুরীর বিজয় মিছিলে ছোট ছোট নৌকা আর ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দির ছবি নিয়ে সমর্থকরা উল্লাস করতে থাকে। ঢাক ঢোল কাসর নিয়ে চিত্তরঞ্জন ও কালিদাস মিছিলের সামনে নাচতে নাচতে যায়।
কচুক্ষেতের ম্যানেজার জুলফিকার আবার নীল কমল মহলের বারান্দায় ঘুমিয়ে থাকা পাগলগুলোকে ঘুম থেকে জাগায়। যাদের উস্কোখুশকো চুল, ময়লা জামা কিন্তু পরিছন্ন হাত পায়ের নখ।
হিন্দু পাড়ায় হঠাত আগুনে কয়েকটি ঘর ভস্মীভুত হলে, মধুমতীর আলো শিরোনাম করে, ভোটে পরাজিত দলের আক্রোশের লেলিহান শিখা।
অধ্যক্ষ আজিজুল হক উপসম্পাদকীয় লিখে ফেলেন, নির্বাচনে বাঙ্গালির বিজয়, মুসলমানের পরাজয়।
প্রণব মুখুজ্জে আজ আবার অসুস্থ জমিদার বাবু ধনঞ্জয় সাহার মৃত্যু শয্যাপাশে যান । আশালতা দেবী চামচ দিয়ে বার্লি তুলে দিচ্ছিলেন সাহা বাবুর মুখে। মুখুজ্জে বলেন, জমিদার বাবু আপনাকে আরেকটু বাঁচতে হবে।
আকাশবাণীতে পূর্ববঙ্গের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ভূমিধস বিজয় আর মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয়ের খবর দিয়ে বঙ্গভঙ্গকালে রচিত গান বাজিয়ে দেয়া হয়,
আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে
আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি
তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী!
ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে॥
চিত্তরঞ্জন ও কালিদাস হিন্দু পাড়ায় গিয়ে অশ্রুসজল হয়ে পড়ে। কালিদাস কান্না জড়িত কন্ঠে বলে, ও পরিতোষ ও হরেন; এই দেশ আর তোমাগের জন্য নিরাপদ লয়গো। ভারতে চইলে গিয়ে প্রাণ বাঁচাও।
কল্পনা পেছন থেকে বলে, ক্যান নিজের দেশ ছাইড়ে অন্য দেশে যাবি ক্যা; তাতে তোমাদের পলিটিকসের সুবিধা এইতো। আমার তো এখন তোমাগের সন্দেহ হয়। চিত্তদা দুধকলা দিয়ে কয়ডা পাগল পুষতিছে নীলকমল মহলের বারান্দায়।
সে কি বলো সে কি বলো করতে করতে চিত্তরঞ্জন আর কালিদাস লেজ গুটিয়ে পালায়।
কল্পনা জোর করে কিছু টাকা পরিতোষ ও হরেনের হাতে গুঁজে দিয়ে বলে, আবার ঘর তোলো দেহি।
পরিতোষ ও হরেনের সঙ্গে মধুমতীতে মাছ ধরতে যায় যারা, সেই আক্কাছ, মজনু মাথায় করে বাঁশ-খড় এনে কাজে লেগে পড়ে।
কলিম চৌধুরী বিজয় মিছিল সংক্ষিপ্ত করে; মিষ্টির হাড়ি আর পান-সুপারী নিয়ে হাজির হয়ে যায় সলিম খানের বাড়িতে। রাশেদ খানকে জড়িয়ে ধরে সলিম খানকে বলে, আপনার এই ডাক্তার ছেলেটারে আমার চাই।
পর্দার আড়াল থেকে রাশেদের মা বলেন, আমার আপত্তি নাই। আপনি ভাইজান চারডা ডাল-ভাত না খেয়ে যাবেন না। নতুন আত্মীয় হইতে যাইতেছেন।
পয়সারহাটে আকাশে বেয়াইতন্ত্রের উজ্জ্বল এক চাঁদ দেখা যায়। এই চাঁদ শতবর্ষ ধরে আলো দেবে; প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম থেকে রক্তের আঙ্গুর লতা রাজতন্ত্রের মতো রক্তাভ হবে।
সুলতানা আর রাশেদের বিয়েতে ধনঞ্জয় বিদ্যালয়ের মাঠে প্যান্ডেল করে ভোজ চলতে থাকে। গওহরডাঙ্গা থেকে এসডিও, পুলিশের বড় কর্তার গাড়ি আসে।
কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রে আজ কেউ আর আলো জ্বালেনি। মুখ পাংশু করে অধ্যক্ষ আজিজুল হক, কলাম লেখক বাতেন ও মধুমতীর আলোর সম্পাদক মুকুল শর্মা বসে মোরগা মোসাল্লাম খায়। শ্যামাপদ বলেন, উনাগো থালায় পোলাও দাও। গোশত দিও ঠিকমতো।
অধ্যক্ষ আজিজুল হক বলেন, গোশত নয় মশয়, মাংস বলুন। শিক্ষক হয়ে এই ব্যাকরণগত ভুল হয় কি করে!
রাশেদ খান অতিথিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছে। খাবার টেবিলে চিত্তরঞ্জনকে না দেখে জিজ্ঞেস করে, চিত্তদা কোথায়! কমরেড কোথায়!
চিত্তরঞ্জন আজ নীল কমল মহলে যূথিকার নাচঘরে আশ্রয় নিয়ে খুশিজল দিয়ে বেদনা ঢাকতে চেষ্টা করে। জুলফিকার তাকে লুচি আর পাঁঠার মাংস এগিয়ে দিয়ে বলে, সারাদিন তো কিছু খান নাই চিত্তদা। কালিদাস প্রেশার মেপে বলে, প্রেশারটা বেড়েছে চিত্তদা। চিত্তরঞ্জন অস্ফুটস্বরে সুলতানা সুলতানা বলে অজ্ঞান হয়ে যায়। যূথিকা চিত্তদার চোখে মুখে জলের ছিটা দেয়। ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে এলে ভবতোষ মৃদু হারমোনিয়াম বাজায়, মাকসুজ্জামান তবলায় বোল তোলে। যূথিকা নিধুবাবুর টপ্পা গাইতে গাইতে বসে থেকেই একটু নাচের ভঙ্গি করে।
পিরীতি না জানে সখী (সখি), সে জন সুখী বল কেমনে ?
যেমন তিমিরালয় দেখ দীপ বিহনে
প্রেমরস সুধাপান, নাহি করিল যে জন,
বৃথায় তার জীবন, পশু সম গণনে
চিত্তরঞ্জন ফিস ফিস করে বলে, দেবদাসের বিরহে পার্বতীর একটু জ্বরও আসিলো না গো চন্দ্রমুখী, আমি এখন কী লইয়া বাঁচিব!
(চলবে)



পাঠকের মন্তব্য