আকাশে তখন কড়া রোদ। অগাস্টের রোদের যে একধরনের কাঠফাটা তেজ থাকে, ঠিক সেরকম। মাথার ওপর সূর্যটা যেন আগুন ঢালছিল। মিরপুর রোডের জ্যাম পেরিয়ে গণভবনের, অর্থাৎ জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের প্রধান ফটকের সামনে যখন এসে দাঁড়ালাম, রোদের তাপে চোখ মেলা দায়। চশমার কাচে ঘাম আর রোদের আলো ঠিকরে পড়ে চারপাশটা কেমন ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখটা মুছে ভাবলাম, এই কড়া রোদের মধ্যে এত মানুষ কেন লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে? ঘরে বসে ফ্যানের বাতাসে এক গ্লাস ঠাণ্ডা লেবুর শরবত খেলেই তো কত আরাম হতো!
জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে ঢোকার অপেক্ষায় দর্শনার্থীদের দীর্ঘ সারি
গেটের সামনেই নিরাপত্তা তল্লাশি। ৫০ টাকার টিকিটটা তো অনলাইন থেকেই আগে কেটে রেখেছিলাম। স্লট ধরে ভেতরে ঢোকার লাল ইট বিছানো পথটায় পা রাখতেই প্রথম কেমন যেন একটা অন্যরকম বাতাস গায়ে লাগল। দুই পাশে কত গাছ! আমের গাছ, কাঁঠাল গাছ, নানা রকমের ফলের বাগান আর সবুজ লন। রোদের মধ্যে গাছগুলোর ছায়া এসে পড়েছে ইটের পথে। কিন্তু সেই ছায়াটুকু পার হতেই দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক প্যানেল। গণতন্ত্রের পথে দীর্ঘ যাত্রা। স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে জুলাই অভ্যুত্থান পর্যন্ত দেশের রাজনীতি আর স্বৈরাচারের ইতিহাস লেখা তাতে। রোদের তীব্রতার মধ্যেও লেখাগুলো পড়তে পড়তে বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে আসে।
আপনার যদি মনে কোমলতার পরিমাণ একটু বেশি থাকে, তবে আমি হাত জোর করে বলব, এই জাদুঘরে আপনার একদমই যাওয়া উচিত নয়। সত্যি বলছি, ভুলেও যাবেন না।
কেন যাবেন না, সেই কারণটা এবার বলি। গেটের সিকিউরিটি পার হয়ে লাল ইটের পথ ধরে কয়েক কদম এগোলেই যে দৃশ্য আপনার মুখোমুখি হবে, সেটার জন্য কোনো মানুষই আগে থেকে প্রস্তুত থাকতে পারে না। চোখের সামনে প্রায় ১৭ একরের এক বিশাল খোলা প্রাঙ্গণ। কড়া রোদ এসে পড়েছে সেই সবুজ মাঠের ওপর। আর সেই রোদে চকচক করছে সার সার দাঁড়িয়ে থাকা প্রতীকী কবর। একটি-দুটি নয়, প্রায় ৪,০০০টি! মার্বেল আর স্টিলের তৈরি সাদা রঙের একটা বৃত্তাকার স্মৃতিস্তম্ভ ঘিরে সেগুলো সাজানো। প্রতিটি কবরের গায় খোদাই করা আছে একেকজন শহীদের নাম।
সবুজ মাঠজুড়ে সারি সারি প্রতীকী কবর, প্রতিটিতে খোদাই করা একজন শহীদের নাম
আপনি চাইলেও হাঁটা চালিয়ে যেতে পারবেন না, পায়ের গতি আপনাতেই থেমে যাবে। কাঠফাটা রোদের মধ্যেও আপনার গায়ে একটা হিমশীতল অনুভূতি জড়িয়ে যাবে। চার হাজার মানুষের নীরবতা যে কতটা ভারী হতে পারে, তা এই মাঠের মাঝখানে না দাঁড়ালে কোনোদিন বোঝা সম্ভব নয়। মাথার ওপর সূর্য জ্বলছে, অথচ মনটা এক নিমেষে কেমন বিষণ্ণতায় ডুবে যায়।
একটু বাঁয়ে এগোতেই চোখে পড়ল সেই রিকশাটি। দোয়েল চত্বরের নির্মম ঘটনার দিন শহীদ গোলাম নাফিজের রক্তে ভেজা দেহ যে রিকশায় করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেটির এক হুবহু নীরব ভাস্কর্য। রিকশার রড, সিট আর চাকার ফ্রেমে যেন সেই দিনের সেই আর্ত চিৎকার জমা হয়ে আছে। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে আরও কতগুলো ভাস্কর্য। নারী যোদ্ধাদের প্রতিরোধের দৃশ্য, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের নির্মমতা, শাপলা চত্বরের সেই বিভীষিকাময় মুহূর্ত। ভাস্কর্যগুলো দেখে ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া হয়।
গোলাম নাফিজকে বহন করা সেই রিকশার নীরব ভাস্কর্য
অনেকে আবার ধর্ম বা শরিয়তের দোহাই দিয়ে ভাস্কর্য নিয়ে কত কথা বলেন, তর্ক তোলেন। কিন্তু এই ভাস্কর্যগুলোর সামনে দাঁড়ালে কোন তর্ক সঠিক আর কোনটা ভুল, সেই বিচার করার ক্ষমতা যেন হারিয়ে যায়।
আর ঠিক তার পরেই সেই জায়গাটা, প্রতীকী আয়নাঘর।
২২টি প্রতীকী সেল নিয়ে তৈরি আয়নাঘরের ভেতরের দৃশ্য
বাইরে কড়া রোদ থাকলে কী হবে, প্রতীকী আয়নাঘরের ভেতরে পা রাখতেই গা ছমছম করে উঠল। মোট ২২টি অন্ধকার প্রতীকী সেল। কক্ষগুলোর ভেতরে ঢোকার পর বাইরের ওই কড়া রোদের কথা এক মুহূর্তে ভুলে যেতে হয়। চারপাশটা এত অন্ধকার যে নিজের হাতটাও ঠিকমতো দেখা যায় না। আর স্পিকার থেকে খুব ধীর গতিতে ভেসে আসছে এক অদ্ভুত, চাপা কান্নার শব্দ আর ভারী শিকল টেনে নিয়ে যাওয়ার ঝনঝনানি। কয়েক সেকেন্ড সেই অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকলে মনে হবে চারপাশের দেওয়ালগুলো বুঝি চেপে আসছে, দম আটকে আসছে।
আয়নাঘর থেকে বের হয়ে এসে সাবেক হেলিপ্যাডের জায়গায় নির্মিত ‘জুলাই স্টেজে’ গিয়ে বসলাম। মাথার ওপর রোদ তখনও কমেনি। সামনেই সম্প্রসারিত লেকের স্থির পানি থমথম করছে। লেকের জলে রোদের আলো পড়ে ঝিকমিক করছে বটে, কিন্তু তার ভেতরের নীরবতাটা ভারী।
অনেকেই হয়তো আপনাকে পরামর্শ দেবে, পুরোনো রক্তপাত আর কষ্টের কথা মনে রেখে লাভ কী? যা হয়ে গেছে তা ভুলে যাওয়াই ভালো। তাদের কথা শুনে আপনি যদি সিদ্ধান্ত নেন যে আপনি এই স্মৃতি জাদুঘরে যাবেন না, তবে জীবনের এক চরম সত্য দেখা থেকে বঞ্চিত হবেন। এই জাদুঘরে না এলে আপনি কোনোদিন জানতেই পারবেন না, একটা দীর্ঘ ১৬ বছরের নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা রাজপ্রাসাদ কীভাবে একদিন সামান্য কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে জনতার চোখের পানি আর দীর্ঘশ্বাসের স্থায়ী ঠিকানায় বদলে যায়।
বাইরের এই চার হাজার কবরের দীর্ঘশ্বাস আর আয়নাঘরের অন্ধকারটা বুকে চেপে যখন মূল দোতলা ভবনের কাঠের বিশাল প্রবেশদ্বারটার দিকে এগোলাম, তখন দেখলাম দরজার গায়ে খোদাই করা শহীদ আনাসের মায়ের সেই বিখ্যাত চিঠিটা। কড়া রোদের আলোয় কাঠের ওপর খোদাই করা প্রতিটি বর্ণ স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছিল। চিঠিটা পড়তে গিয়ে রোদের মধ্যেও চোখের কোল দুটো কেমন যেন ভিজে এলো।
সেই মূল দোতলা ভবনের দরজায় পা রাখতেই বুঝতে পারলাম, ভেতরে আমার জন্য কী ভয়াল, হৃদয়বিদারক আর বিস্ময়কর সব স্মৃতি অপেক্ষা করছে...।
২
মূল ভবনের ভেতরে পা রাখতেই বাইরের ওই কড়া রোদের উত্তাপ এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। বদলে বিশাল দোতলা প্রাসাদটির ঠান্ডা আর নিস্তব্ধ আবহাওয়া গায়ের ভেতরে কাঁটা দিয়ে উঠল।
শহীদ আনাসের মায়ের দরজায় খোদাই করা চিঠিটা পড়া শেষ করে ভেতরের প্রধান গ্যালারিতে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল এক বিশাল কাচের গ্লোব। ডিজিটাল প্রজেকশনে তাতে ক্রমাগত ভেসে উঠছে জুলাই অভ্যুত্থানের সেই উত্তাল দিনগুলোর একের পর এক ছবি ও ভিডিও ফুটেজ। চারপাশে এমন এক অদ্ভুত আবহ তৈরি করা হয়েছে, মনে হবে সময়টা যেন থেমে গিয়ে আপনাকে আবার নিয়ে গেছে সেই রক্তাক্ত দিনগুলোতে।
আনাসের লেখা চিঠি
নিচতলার এই অংশটায় পা দিলে আপনি দ্বিতীয়বারের মতো ভাববেন, নাহ্, সত্যিই এখানে আসা মোটেও উচিত হয়নি। রক্তচাপ যাদের একটু বেশি, কিংবা যারা অতীতে ঘটে যাওয়া নির্মম ইতিহাসকে স্রেফ ‘রাজনীতি’ বা ‘মিডিয়ার বাড়িয়ে বলা গল্প’ বলে এড়িয়ে যেতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এই নিচতলাটা একটা আস্ত নরক গুলজার।
একটু এগোতেই চোখে পড়ল আওয়ামী লীগ আমলের বড় বড় সব নেতাদের ভাঙা আবক্ষ মূর্তি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের টুকরো হয়ে পড়ে থাকা মূর্তিগুলো যেন এক অদৃশ্য সত্যকে চিৎকার করে বলছে, ক্ষমতার অহংকার শেষ পর্যন্ত কত দ্রুত মাটিতে মিশে যায়।
এরপরের কক্ষটি আরও অদ্ভুত। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহৃত চেয়ার-টেবিল সেখানে সাজানো আছে। কিন্তু ঘরের আবহটা অত্যন্ত গুমোট। কারণ, ঠিক পাশের গ্যালারিটি তৈরি করা হয়েছে গত ১৬ বছরের দমন-পীড়নের ইতিহাস নিয়ে। সেখানে রাখা আছে তথাকথিত নির্যাতন কক্ষ।
হাতে ছোঁয়া যাবে না ঠিকই, কিন্তু কাচের ওপারের জিনিসগুলো দেখলে গায়ের রক্ত হিম হয়ে আসে। কাঠের তৈরি অদ্ভুত দেখতে ইলেকট্রিক চেয়ার, চামড়ার চাবুক, ড্রিল মেশিন আর নানা ধরনের অস্ত্র। দাবি করা হয়, এসব নাকি আয়নাঘর এবং বিভিন্ন গোপন আস্তানা থেকে উদ্ধার করা।
গুমের শিকার ব্যাক্তিদের নির্যাতন করতে এই চাবুক ব্যাবহার করা হত
গুম হওয়া ব্যাক্তিদের এই চেয়ারে ইলেকট্রিক শক দেয়া হত
তার পাশেই গুম কক্ষ। এটি কোনো প্রদর্শনী নয়, এটি আসলে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর একটা দীর্ঘশ্বাসের জাদুঘর। কাচের বাক্সে থরে থরে সাজানো গুম হওয়া ও পরবর্তীতে নিহত হওয়া মানুষদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র, কারো ম্লান হয়ে যাওয়া জামাকাপড়, কারো পুরনো জুতো, একটা সস্তা মোবাইল ফোন, প্রিয়জনকে লেখা অসম্পূর্ণ চিঠি, আর কিছু ফ্রেমে বাঁধানো ছবি। কাঠ দিয়ে খোদাই করে তৈরি করা হয়েছে সেই নিখোঁজ মুখগুলো।
কক্ষটির মেঝের দিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম। মেঝের বেশ কিছু অংশে শক্ত কাচ বসানো। সেই কাচের নিচে তাকালে দেখা যায় ৫ আগস্টের সেই ঐতিহাসিক দিনের ধ্বংসাবশেষ। জনতার ভাঙচুরের পর পড়ে থাকা ভাঙা কাচের টুকরো, পোড়া কাঠের অংশ আর ইট-পাথর। অতীত আর বর্তমান যেন সেখানে এক টেবিলে বসে আছে।
এক কোণে বিডিআর বিদ্রোহ, শাপলা চত্বরের ঘটনা আর বছরের পর বছর ধরে চলা দমন-পীড়নের হাজার হাজার নথিপত্র, খবরের কাগজের কাটিং আর অডিও-ভিডিও রেকর্ডার রাখা।
আপনি যদি গণভবনকে এখনও সেই পুরনো ‘পবিত্র ক্ষমতার কেন্দ্র ভেবে থাকেন, কিংবা মনে করেন রাজপ্রাসাদের ভেতরের দেয়ালগুলো শুধু সুসংবাদই শোনে, তবে এই নিচতলা আপনার সেই ভুল এক লহমায় ভেঙে চুরমার করে দেবে। এখানে আলো যত কম, সত্যের প্রখরতা যেন তার চেয়ে শতগুণ বেশি।
নিচতলার এই বিভীষিকা আর ষোল বছরের নির্মমতার দলিলগুলো দেখা শেষ করে যখন দোতলায় ওঠার সিড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, তখন বুঝিনি, সিড়ির প্রতিটি ধাপ আমাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে প্রতিটি ইটে শুধুই তাজা রক্তের গন্ধ আর তরুণদের বুক চিতিয়ে দেওয়ার ইতিহাস লেখা আছে...।
৩
সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতেই মেঝের কাঠগুলো যেন আলতো করে কেঁপে উঠল। নিচতলায় ছিল ১৬ বছরের শাসনের কালো দলিল আর গুমোট অন্ধকারের চিহ্ন, কিন্তু দোতলায় পা রাখতেই পুরো পরিবেশটা বদলে গেল। এখানে আলো বেশি, অথচ বুকের ভেতর চেপে বসা ভারটা যেন আরও দ্বিগুণ হয়ে গেল।
দোতলাটা সাজানো হয়েছে পুরোপুরি ‘জুলাইয়ের ৩৬ দিন’-কে কেন্দ্র করে।
আপনি যদি ভেবে থাকেন এই জাদুঘরটা স্রেফ একটা সাধারণ প্রদর্শনী কেন্দ্র, যেখানে কিছুক্ষণ ঘুরে এসি-র বাতাসে জিরিয়ে বাড়ি ফিরে আসবেন—তবে এই দোতলায় পা দিয়ে আপনার সে ভুল ভাঙবে। কোমল মনের মানুষদের আমি আবারও বলব, এখানে আসবেন না। কারণ, এই দোতলাটা কোনো সুসজ্জিত ঘরের গল্প নয়, এটা শত শত তরুণের বুক খালি হয়ে যাওয়ার ইতিহাস।
একদম শুরুতেই মুখোমুখি হতে হয় শহীদদের ব্যক্তিগত স্মারকের। দীর্ঘ এক গ্যালারিতে থরে থরে সাজানো প্রায় ৫০০ শহীদের ব্যবহৃত জামাকাপড় ও জিনিসপত্র। কাচের বাক্সের ওপারে তাকিয়ে চোখ স্থির হয়ে যায়। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আবু সাঈদের সেই রক্তমাখা জার্সি, চট্টগ্রামের ওয়াসিম আকরামের পোশাক, কিংবা ঢাকার উত্তরায় আন্দোলন চলাকালীন তৃষ্ণার্তদের পানি খাওয়াতে গিয়ে শহীদ হওয়া মুগ্ধার হাতের সেই ঘড়িটি। পাশেই রাখা শহীদ আনাসের নিজের হাতে লেখা সেই শেষ চিঠিটা।
জিনিসগুলো এত বেশি জীবন্ত আর তাজা যে, কাচের ওপর হাত রাখলে মনে হয় রক্ত বুঝি এখনও শুকায়নি।
শহীদ শেখ ফাহমিন জাফরের রক্তমাখা শার্ট
একটু এগোতেই চোখে পড়ল ইমার্সিভ প্রজেক্ট কক্ষ। চার দেয়ালজুড়ে ৩৬০ ডিগ্রি ভিডিও প্রজেকশন। ঘরে ঢুকলেই চারপাশের শব্দ আর আলো এমনভাবে আপনাকে ঘিরে ধরবে যে, মনে হবে আপনি নিজেই ২০২৪ সালের সেই উত্তাল জুলাইয়ের রাজপথে দাঁড়িয়ে আছেন। টিয়ারগ্যাসের ধোঁয়া, দূর থেকে ভেসে আসা সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ, আর তরুণের দলবেঁধে করা স্লোগান, আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে? কয়েক মুহূর্তের জন্য বুকের স্পন্দন বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়।
দেয়ালে দেয়ালে বাঁধাই করা অসংখ্য আলোকচিত্র, পত্রিকার কাটিং, আন্দোলনে আঁকা বিভিন্ন পোস্টার আর দেয়ালচিত্র বা গ্রাফিতি। প্রতিটি ছবিতে ফোটে উঠেছে একেকটা দিন, জুলাইয়ের ১ম দিন থেকে শুরু করে সেই ৫ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনের পুরো টাইমলাইন।
এই দোতলার সবচেয়ে কৌতূহল উদ্দীপক অংশটি হলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শয়নকক্ষ। কক্ষটি ৫ আগস্টের ভাঙচুরের পর প্রায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তাঁর ব্যবহৃত বিলাসবহুল বিছানা, কোণের ড্রেসিং টেবিল, চেয়ার, সব যেমন ছিল, তেমনই রাখা। তবে তফাৎ হলো, সেই রাজকীয় আসবাবের ঠিক পাশেই এখন স্থান পেয়েছে জুলাইয়ের শহীদদের স্মারক ও স্মৃতিচিহ্ন। বৈপরীত্যটা এতই তীব্র যে, ক্ষমতার অহংকার আর সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের মধ্যকার সীমানাটা সেখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই বিছানা থেকেই শেখ হাসিনা গভীর রাতে কষ্ট করে ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদ পড়তেন
দেয়ালের কিছু কিছু জায়গায় ৫ আগস্টের দিন জনতা কর্তৃক লেখা গ্রাফিতিগুলোও অমলিন রেখে দেওয়া হয়েছে। সেখানে ক্ষোভ, আনন্দ আর বিজয়ের কত শত কথা লেখা!
পুরো দোতলাটা ঘুরে যখন মূল ভবনের বাইরে বের হয়ে এলাম, তখন কড়া রোদটা একটু ঢাকা পড়েছে মেঘের আড়ালে। কিন্তু বুকের ভেতরে যে ভাঙাগড়াদের গল্পটা জমে উঠেছে, তা আর সহজে মুছবার নয়।
পুনশচ:
একটা জরুরি কথা তো বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম! বাইরে এসে চশমাটা শার্টের খুঁটে মুছতে মুছতে হুট করে মনে পড়ল। এই যে জাদুঘরের প্রাঙ্গণজুড়ে এত সব ভাস্কর্য দেখছেন; ওই যে শহীদ গোলাম নাফিজের দেহ বহনকারী রিকশা, রাজপথের লড়াকু নারী, কিংবা শাপলা চত্বরের ঘটনার স্মারক, এগুলো কিন্তু সবাই আবার খুব একটা ভালো চোখে দেখেননি।
২০২৬ সালের ১০ আগস্টের দিকে হেফাজতে ইসলাম থেকে বেশ বড়সড় একটা বিরোধিতা আসে। তাদের নায়েবে আমির অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরীসহ শীর্ষ নেতারা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, জাদুঘরে হেফাজতের নেতাকর্মীদের নামে বা অবয়বে যেসব ভাস্কর্য বসানো হয়েছে, সেগুলো দ্রুত সরাতে হবে। কারণ, ইসলামী শরিয়তের বিধান অনুযায়ী মানুষের মূর্তি বা ভাস্কর্য তৈরি করা হারাম, এমনটাই তাদের বক্তব্য। আলেমদের আত্মত্যাগের স্মৃতি অবশ্যই ধরে রাখতে হবে, তবে সেটা কোনো শরিয়তবিরোধী উপায়ে নয়; ভাস্কর্যের বদলে ছবি, নথি বা তথ্যচিত্র রাখলেই ঝামেলা মিটে যায়। তবে হেফাজত ছাড়া অন্য কোনো বড় রাজনৈতিক দল ভাস্কর্য নিয়ে এমন জোরালো প্রতিবাদ করেনি। ফলে এই বিতর্কে মূল আওয়াজটা এসেছিল তাদের দিক থেকেই।
যাই হোক, পুরো জাদুঘর চত্বরটা চষে ফেলার পর যদি একটা লিস্ট বানাই, জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে যাদের ভুলেও যাওয়া উচিত নয় তাহলে তালিকাটা মোটামুটি এমন:
প্রথমেই জুলাই-বিরোধীরা। পুরো ১৭ একরের এই কমপ্লেক্সটা যেন তাদের এতদিনের রাজনীতির বিরুদ্ধে এক বিশাল খোলা চার্জশিট। প্রতীকী কবরগুলো দেখলে মন খারাপ হবে, আর আয়নাঘরে ঢুকলে তো দমই আটকে আসবে।
তারপর আছেন ভাস্কর্য-বিরোধীরা। বিশেষ করে যারা শরিয়তের দোহাই দিয়ে সব ভাস্কর্যকে ঢালাওভাবে হারাম মনে করেন। গেট পার হতেই ভাস্কর্যের বহর দেখে এদের হয়তো চোখ বন্ধ করে হাঁটা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
এরপর শেখ হাসিনার অন্ধ ভক্তরা। নেত্রীর শয়নকক্ষ, ভাঙা আবক্ষ মূর্তি আর গত ১৬ বছরের গুম-খুনের নথি দেখে এরা হয়তো মাঝরাস্তাতেই ‘এসব ষড়যন্ত্র!’ বলে চিল্লাপাল্লা শুরু করে দেবেন।
আর আছেন ‘কিছুই হয়নি, মিডিয়া সব বাড়িয়ে বলেছে’ দলের লোকজন। তারা হাজার হাজার প্রতীকী কবর কিংবা রক্তমাখা জামাকাপড় দেখেও হয়তো মুখ ব্যাঁকিয়ে বলবেন, আরে দূর, এসব তো পুরোপুরি স্টেজড।
এমনকি যারা ইতিহাসের শুধু পজিটিভ ও মিষ্টি অংশ দেখতে চান, তাদেরও না আসাই ভালো। কারণ এখানে পজিটিভ কিছু নেই, পুরোটাই রক্ত, গুম, কান্না আর পতনগাথা।
সবশেষে, যারা গণভবনকে এখনো পবিত্র ক্ষমতার কেন্দ্র ভেবে বসে আছেন, তারা মানসিকভাবে প্রস্তুত না থাকলে একদমই আসবেন না। কারণ ওটা এখন আর কোনো রাজপ্রাসাদ নেই, জনতার স্মৃতির আখড়া হয়ে গেছে।
তবে যাদের অবশ্যই যাওয়া উচিত, তারা হলেন যারা সত্যিটা জানার আগ্রহ রাখেন, যারা দেশের ইতিহাসটাকে কোনো ফিল্টার ছাড়া চোখ মেলে দেখতে চান, আর একটু কষ্ট বা মন খারাপ হলেও বাস্তবতার মুখোমুখি হতে ভয় পান না।
সব মিলিয়ে বলতে গেলে, সাবেক এই গণভবন এখন এমন এক অদ্ভুত জায়গা, কেউ বলবেন স্মৃতির তীর্থস্থান, কেউ ফতোয়া দিয়ে বলবেন হারাম, আবার কেউ হয়তো বলবেন প্রপাগান্ডা। আর একটা ঐতিহাসিক প্রাসাদের দরজায় দাঁড়িয়ে এই নানা মানুষের নানা মতের মুখোমুখি হওয়াটাই হয়তো এই জাদুঘরের সবচেয়ে বড় রূপ।












পাঠকের মন্তব্য