দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। আমেরিকান সৈন্যদের ধেয়ে মারতে এগিয়ে আসছে জার্মান সৈন্যরা। আকাশে উড়ছে জার্মান যুদ্ধবিমান। নিচে তাকিয়ে পাইলট দেখল, বেশ কয়েকটা আমেরিকান ট্যাংক! মাটিতেও শোনা যাচ্ছে ট্যাংক আর ট্রাক চলার শব্দ। রেডিওতেও আসছে আমেরিকান সৈন্যদের কথাবার্তা। টার্গেট লকড… ফায়ার!
কিন্তু একটু পরেই দেখা গেল, ব্যাপারটা কেমন যেন উলটাপালটা! মানে যে ট্যাংকগুলো থেকে ধোঁয়া উঠছে না, পালটা গুলিও আসছে না। কারণ গুলি করার মতো ট্যাংকই সেখানে নেই! ওগুলো আসলে রাবারের তৈরি, অনেকটা বিশাল আকারের সেই ফুলানো রাবার হাঁসের মতো, শুধু দেখতে একটু বেশি অস্ত্রসস্ত্র বোঝাই ভারী ট্যাংক!
হেহে! ভাবছেন এটা গল্প? মোটেই না! এটা ছিল বাস্তব এক ঘটনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকান আর্মি যখন ইউরোপীয় আর্মিদের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে বুঝতে পারল, ট্র্যাডিশনাল উপায়ে তাদের সাথে যুদ্ধ করাটা একটু কঠিন হয়ে পড়বে। তাহলে কী করা যায়? বুদ্ধি এলো তাদেরকে ধোঁকা দিতে হবে। যত সৈন্য-সামন্ত অস্ত্র-শস্ত্র আছে, তারচেয়ে বেশি দেখাতে হবে।
ঘটনা ছিল ১৯৪৪ সালের। তখন আজকের মতো স্যাটেলাইট, ড্রোন আর ডিজিটাল নজরদারির ব্যবস্থা নেই। শত্রুকে চোখের সামনে এমন একটা সেনাবাহিনী দেখানো, যেটা আসলে নেই- কাজটা মোটেই সহজ না। কী উপায়? ডাক পড়ল দলে ছিলেন শিল্পী, ডিজাইনার, ফটোগ্রাফার, রেডিও অপারেটর, সাউন্ড টেকনিশিয়ান আর নানা রকম ক্রিয়েটিভ লোকজনের। এমনকি এই দলে ছিলেন কয়েকজন ভবিষ্যৎ বিখ্যাত শিল্পীও! সঙ্গে ছিলেন পেশাদার সৈন্যরা। সবাই মিলে বানাতে হবে এমন এক সেনাবাহিনী, যেটা সত্যি না হয়েও শত্রুর কাছে সত্যি বলে মনে হবে। তবুও পুরো ট্রুপটা ছিল মাত্র প্রায় ১১০০ জনের। তাদের অফিসিয়াল নাম ছিল টুয়েন্টি-থার্ড হেডকোয়ার্টার্স স্পেশাল ট্রুপ্স। মজার ব্যাপার হলো, এই ১১০০ জনই এমনভাবে একটা বাহিনী সাজাতে পারত, দেখে মনে হতো সেখানে ৩০ হাজারের মতো সৈন্য আছে!
তাদের প্রথম কাজ ছিল এমন একটা সেনাবাহিনী বানানো, যেটা দূর থেকে সত্যিকারের সেনাবাহিনী বলে মনে হবে। এ জন্য বানানো করা হলো সেই ফোলানো ট্যাংক।সেগুলো দেখতে অনেকটা আসল M4 Sherman ট্যাংকের মতো। অবশ্য খুব কাছে গিয়ে কেউ যদি ট্যাংকের গায়ে হাত দিয়ে চাপ দিলে কেল্লাফতে হয়ে যেত! কিন্তু জার্মানদের তো আর প্রত্যেকটা ট্যাংকের কাছে গিয়ে চাপ দিয়ে দেখার সুযোগ ছিল না। দূর থেকে, বিশেষ করে আকাশ থেকে, এগুলো যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য দেখাত। তাই মাঠে কয়েক ডজন আসল ট্যাংক রাখার বদলে অনেকগুলো ফোলানো ট্যাংক দাঁড় করিয়ে দিলেই দূর থেকে মনে হতো বিশাল একটা সাঁজোয়া বাহিনী সেখানে জড়ো হয়েছে।
কিন্তু শুধু ট্যাংক দাঁড় করালেই তো আর সেনাবাহিনী হয় না। একটা আসল ট্যাংক বাহিনীর শব্দও থাকে। ইঞ্জিনের শব্দ, ট্রাকের শব্দ, অশ্ত্রশশ্ত্রের ঝনঝনানি, সৈন্যদের হাঁকডাক সব মিলিয়ে যুদ্ধের একটা নিজস্ব শব্দ আছে। ঘোস্ট আর্মির লোকেরা সেই শব্দটাও নকল করল। তারা সব আসল শব্দ রেকর্ড করে বিশাল স্পিকার দিয়ে দূর থেকে বাজাত। কাজেই জার্মানরা হয়তো দূরে কোথাও ট্যাংক দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু শুনছে ট্যাংকের ইঞ্জিনের শব্দ। অর্থাৎ চোখে যা দেখছে, কানেও তারই প্রমাণ পাচ্ছে। এখন আর সন্দেহ করবে কীভাবে?
হ্যাঁ, এরাই সেই ভূতুড়ে আর্মি!
এরপর যোগ হলো রেডিও। জার্মান গোয়েন্দারা আমেরিকান সেনাদের রেডিওর কথা লুকিয়ে লুকিয়ে শুনত। ঘোস্ট আর্মির রেডিও অপারেটররা তাই ভুয়া রেডিও বার্তা পাঠাতে শুরু করলেন। কোন ইউনিট কোথায় যাচ্ছে, কোন অফিসার কার সঙ্গে কথা বলছে- সবকিছুর একটা কাল্পনিক গল্প তৈরি করা হতো। মজার ব্যাপার হলো, শুধু কী বলা হচ্ছে সেটাই নয়, আসল রেডিও অপারেটররা যেভাবে বার্তা পাঠাতেন, সেই ধরনটাও নকল করা হতো। অর্থাৎ জার্মানরা যদি বসে রেডিও শুনলেও বুঝত না যে তারা আসলে ঘোস্ট আর্মির বানানো গল্পই শুনছে।
কিন্তু আমেরিকানরা এখানেও থামেনি। ঘোস্ট আর্মির কিছু সদস্য আসল সেনাদের মতো পোশাক পরে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন। কখনো স্থানীয় ক্যাফেতে বসে ইচ্ছা করে এমন কথাবার্তা বলতেন, যাতে কেউ শুনে মনে করে এখানে বড় কোনো আমেরিকান ইউনিট এসেছে। তাদের ইউনিফর্মে কখনো এমন চিহ্নও ব্যবহার করা হতো, যা দেখে মনে হতো তারা অন্য কোনো ডিভিশনের লোক। অর্থাৎ পুরো ব্যাপারটা ছিল একটা মঞ্চনাটক, যেখানে শুধু অভিনেতারাই জানতেন যে নাটক চলছে।
এই নাটকের একটা সুবিধা ছিল- জার্মানরা যে তথ্যই সংগ্রহ করুক, সবকিছু একই গল্প বলছিল। আকাশ থেকে দেখা যাচ্ছে ট্যাংক। দূর থেকে শোনা যাচ্ছে ট্যাংকের শব্দ। রেডিওতে শোনা যাচ্ছে সেই ইউনিটের কথাবার্তা। স্থানীয় লোকজনও বলছে আমেরিকান সৈন্য এসেছে। ফলে একটা মিথ্যা তথ্য আরেকটা মিথ্যাকে সত্যি বলে মনে করিয়ে দিচ্ছে। এটাই ছিল এই ভূতুড়ে আর্মির আসল ট্রিক্স!
তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত কাজগুলোর একটি হয়েছিল ১৯৪৫ সালের মার্চে, রাইন নদীর কাছে। আমেরিকান নবম বাহিনী তখন জার্মানির দিকে এগোতে নদী পার হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জার্মানরা যদি বুঝে ফেলত কোথা দিয়ে তারা নদী পার হবে, তাহলে সেখানেই তারা ঘাটি গেড়ে বসে থাকত! তাই ঘোস্ট আর্মির দায়িত্ব হলো জার্মানদের নজর একটু অন্যদিকে সরিয়ে রাখা।
তারা নদীর অন্য পাশে এমনভাবে একটা ভুয়া আমেরিকান বাহিনী সাজাল, যেন সেখানে বিশাল সেনাবাহিনী নদী পার হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফোলানো ট্যাংক, নকল কামান, ট্রাক, ভুয়া ক্যাম্প- সবই ছিল। রাতে আবার বিশাল স্পিকারে বাজতে লাগল আসল ট্যাংক আর ট্রাকের শব্দ। দূর থেকে জার্মানদের মনে হলো, আমেরিকানরা বুঝি এখান দিয়েই নদী পার হবে।
অথচ আসল আমেরিকান সৈন্যরা তখন অন্য জায়গা দিয়ে রাইন পার হয়ে যাচ্ছে।
মানে, ঘোস্ট আর্মি জার্মানদের এমন একটা সেনাবাহিনী দেখাচ্ছে, যেটা আসলে নেই, আর আসল সেনাবাহিনীটা চলে যাচ্ছে অন্য রাস্তা দিয়ে। যুদ্ধের ময়দানে শত্রুকে বোকা বানানোর অনেক কায়দা আছে, কিন্তু এমন রাবারের ট্যাংক দিয়ে একটা পুরো বাহিনী সাজিয়ে রাখা নিঃসন্দেহে একটু আলাদা ধরনের কায়দা।
আর মজার ব্যাপার হলো, শুধু জার্মানরাই ধোঁকা খায়নি। একবার এক আমেরিকান কর্নেল দূর থেকে এতগুলো ট্যাংক দেখে জানতে চেয়েছিলেন, তাকে না জানিয়ে এত ট্যাংক এখানে আনা হলো কেন। পরে তাকে বোঝাতে হলো- ট্যাংকগুলো আসলে ট্যাংকই নয়!
তবে পুরো ব্যাপারটা শুধুই হাসি ঠাট্টা ছিল না। ঘোস্ট আর্মির সদস্যরা প্রায়ই সত্যিকারের যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি কাজ করতেন। ভুয়া ট্যাংক থাকলেও শত্রুর গুলি ছিল একেবারে আসল। কয়েকজন সদস্য নিহত হন, অনেকে আহতও হন।
যুদ্ধের পর তাদের এই কাজ বহু বছর গোপন রাখা হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে তথ্য প্রকাশ্যে এলে জানা গেল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে ইউরোপে এমন একদল মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছিল, যারা কখনো ছবি আঁকছে, কখনো ভুয়া রেডিও বার্তা পাঠাচ্ছে, কখনো সৈন্য সেজে ঘুরছে, আবার কখনো মাঠে রাবারের ট্যাংক ফুলিয়ে জার্মানদের বোঝাচ্ছে এখানে একটা বিশাল বাহিনী আছে। অথচ বাহিনীটা আসলে কখনই ছিল না।
ঘোস্ট আর্মির এই ঘটনা আমাদের আরেকবার বুঝিয়ে দেয় যে Ideas are bulletproof! ক্রিয়েটিভিটির সাথে আসলে মেশিনের কখনও তুলনা চলে না!
তথ্যসূত্র: Ghost Army Legacy Project: 23rd Headquarters Special Troops- Official History ও archival material




পাঠকের মন্তব্য