১
ঢাকা শহরের মানুষের মন খারাপ হলে তারা টঙ্গে ধোঁয়া ওঠা চা খায়, আর বরিশালের মানুষের মন খারাপ হলে তারা সোজা সদরঘাট লঞ্চের ঘাটে গিয়ে দাঁড়ায়। বুড়িগঙ্গার কালো পানির ওপর যখন বিশাল বিশাল লোহার জাহাজগুলো জ্যান্ত দানবের মতো গর্জন করে অন্ধকার চিরে ছুটে চলে, তখন মানুষের বুকের ভেতরের অনেক জটিল অঙ্কও কেমন যেন নিমিষেই পানি হয়ে যায়।
লঞ্চের কেবিন জিনিসটা বড্ড অদ্ভুত। সাড়াজাগানো কোনো আধুনিক হোটেলের ঘর নয় এটি; খুব ছোট একটা কক্ষ, কাঠের পাতলা দরজা, একটা সিঙ্গেল বা ডাবল বেড, আর মাথার ওপর মাঝারি গতির একটা সস্তা ফ্যান। কিন্তু এই ঘরের বাতাসটা ভারী। সেখানে একই সাথে থাকে জং ধরা লোহার গন্ধ, নোনা জলের ঘ্রাণ, আর একটা অহেতুক, উস্কানিমূলক রোমান্টিক গোপনীয়তা।
ঘটনাটা ২০১৮ সালের এক বর্ষার রাতের।
কৈলাশবাবু নামের এক মাঝবয়সী সুরকার সদরঘাট টার্মিনালে দাঁড়িয়ে ছাতা মাথায় দিয়ে চা খাচ্ছিলেন। তার জীবনের গতি তখন বুড়িগঙ্গার ওই স্থবির পচা পানির মতোই আটকে গেছে। একটা সুপারহিট গানের আশায় সে টানা তিন বছর ধরে স্টুডিওর ভাড়া বাকি ফেলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ টার্মিনালের পানের দোকানের বিকট স্পিকারে বেজে উঠলো এক অদ্ভুত গান
বরিশালের লঞ্চে উইঠা/ লইবো কেবিন রুম...
কৈলাশবাবু চায়ের কাপ হাতে থমকে দাঁড়ালেন। গানের সুর খুব জটিল কিছু নয়, কিন্তু কথাগুলোর ভেতর এমন একটা অদ্ভুত লোকাল টান আর সহজ-সরল ফ্যান্টাসি আছে, যা যেকোনো নাগরিক মানুষকে এক মুহূর্তে বিভ্রান্ত করে ফেলে।
গানটা গাইছেন এক নারী। নাম তার নার্গিস।
নার্গিস কোনো টিভি চ্যানেলের সুশীল বা ড্রয়িংরুম সংগীতশিল্পী নন। তিনি মফস্বলের স্টেজ শোর চটুল গায়িকা। মফস্বলের প্যান্ডেলে আলো যখন লাল-নীল হয়ে জ্বলে ওঠে, তখন তার গলায় এই গান শুনলে হাজার হাজার মানুষ সিটি বাজিয়ে ওঠে। নার্গিসের গলার আওয়াজে এক তীব্র ধার আছে—সেখানে কোনো কৃত্রিম সুশীলতা নেই, আছে সরাসরি বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা একধরনের বোহেমিয়ান আনন্দ।
কৈলাশবাবু সেদিন রাতে বরিশালগামী লঞ্চের কেবিনে বসে সারারাত এক অদ্ভুত কাণ্ড করলেন। তিনি নার্গিসের গাওয়া এই গানটি লুপে শুনতে শুনতে গানের লিরিক্সগুলো কাগজের পাতায় টুকতে লাগলেন।
গানের প্রথম লাইনটাই ধাক্কা দেওয়ার মতো
বরিশালের লঞ্চে উইঠা লইবো কেবিন রুম... বন্ধুরে মোর বুকে লইয়া দিবো একটা ঘুম, ঠাইসা দিবো একটা ঘুম।
এখানে গীতিকার বা শিল্পী প্রেমকে কোনো ভারী দার্শনিক সংজ্ঞায় বাঁধেননি। কোনো বিরহ নেই, দীর্ঘশ্বাস নেই, রক্তক্ষরণ নেই। প্রেম মানে খুব সহজ—নদীর বুকে ভেসে চলা একটা কেবিন রুম, আর সেখানে প্রিয় মানুষকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সব দুশ্চিন্তা ভুলে একটা নিশ্চিন্ত ঘুম। ঠাইসা শব্দটার ভেতরে যে খাঁটি আঞ্চলিক মাটির গন্ধ আছে, সেটাই গানটিকে শহুরে কৃত্রিমতা থেকে আলাদা করে ফেলে।
পরের দৃশ্যপট আরও চতুর
আমার হাতে মোবাইল ফোন, বন্ধুর হাতে ক্যামেরা/ জিজ্ঞাস করলে উত্তর দিব, সাংবাদিক আমরা।
সামাজিক নিষেধাজ্ঞার ভেতরে দাঁড়িয়ে এই দুটি লাইন যেন এক দারুণ বুদ্ধিমান রসিকতা। বাঙালি সমাজে অবিবাহিত বা গোপনে প্রেম করা যুগলের জন্য লঞ্চের কেবিন সবসময়ই একটা আতঙ্কের জায়গা হতে পারে, পাছে কেউ ধরে ফেলে! তাই নিজেদের বাঁচাতে তাদের বানানো ছদ্মবেশ হলো আমরা সাংবাদিক। বাইরে থেকে প্রশ্ন এলে সোজা উত্তর; আমরা কাজের দায়িত্বে আছি! এই সহজ চাতুরী আর লঘু হাস্যরসই গানের মূল আকর্ষণ।
বরিশালের লঞ্চ কেবল একটা যানবাহনের নাম নয়। রাত ১২টায় যখন পানের খিলি মুখে দিয়ে কোনো প্রেমিক জোড়া কেবিনের জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়, আর বাইরে ঘন অন্ধকার নদী গর্জন করে, তখন ক্লাসিক প্রেমের রূপকথাগুলোও যেন ফিকে হয়ে যায়। গানটির মূল দর্শনটাই সেখানে।
সেদিন রাতে লঞ্চের কেবিনে বসে কৈলাশবাবু বুঝেছিলেন, নার্গিসের এই গান সাধারণ কোনো স্টেজ পারফর্মেন্স নয়; এটা মধ্যবিত্তের এক গোপন, অনাবিল প্রেমের ফ্যান্টাসি। কিন্তু সেই বর্ষার রাতে কৈলাশবাবু কিংবা গায়িকা নার্গিস কেউই জানতেন না, ২০১৮ সালের এই অতি-সাধারণ স্টেজ গানটি ঠিক চার বছর পর নতুন এক মোড়কে পুরো ইন্টারনেট দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দেবে।
২
চার বছর পর, ২০২২ সালের এক হিমেল নভেম্বর।
পৃথিবী ততদিনে রূপ বদলে ফেলেছে। মানুষের জীবনের সিংহভাগ সময় এখন আটকে গেছে পাঁচ ইঞ্চির একটা কাচের স্ক্রিনে। পনেরো সেকেন্ডের খণ্ড খণ্ড আলো-ছায়ার ভিড়ে মানুষ প্রতিনিয়ত নতুন উন্মাদনা খোঁজে। বড় বড় উপন্যাস পড়ার কিংবা চার মিনিটের পুরো গান শোনার ধৈর্য এই ক্ষিপ্র গতিময় টিকটক-প্রজন্মের আর নেই।
ঠিক সেই অস্থির শহরের এক অন্ধকার ডিজিটাল স্টুডিওতে মধ্যরাতে বসেছিলেন এক তরুণ মিউজিক প্রডিউসার। নাম তার আরিয়ান।
আরিয়ান আধুনিক ইলেকট্রনিক বিট বোঝেন, বেস বুস্ট বোঝেন, কিন্তু গানের ভেতরে কীভাবে 'লোকাল প্রাণ' প্রতিষ্ঠা করতে হয়, সেটি নিয়ে তার চিরকালের সংশয়। হঠাৎই অ্যালগরিদমের কৃপায় তার স্টুডিওর এক পুরোনো ফোল্ডার থেকে ভেসে উঠলো ২০১৮ সালের সেই নার্গিসের গান
বরিশালের লঞ্চে উইঠা...
আরিয়ান হেডফোন কানে দিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। চার বছর আগের সেই খাঁটি লোকাল সুরের নিচে তিনি এক আধুনিক, উদ্দাম স্পন্দন শুনতে পেলেন। তিনি বুঝলেন, এই গান কেবল মফস্বলের মেলায় বাজানো কোনো গান নয়; এটি আজকের ক্লান্ত, শহুরে, সামাজিক নিয়মে বন্দি তরুণ-তরুণীদের ভেতরের সুপ্ত ফ্যান্টাসি।
তিনি গানটিকে নতুন কাপড়ে সাজাতে বসলেন। লোকাল সুরের সাথে যুক্ত হলো হেভি বিট, ডান্স-ফ্লেভার, র্যাপ আর কিছু ইংরেজি চরণের আধুনিক সংযোজন। যুক্ত হলেন নতুন শিল্পী ডিজে শাহরিয়ার ও মহুয়া। পুরোনো লিরিক্সের ক্যানভাসে এবার ফুটে উঠলো আধুনিক প্রেমিকের নতুন চালচিত্র
দিন নাই, রাত নাই, পুরা প্রেমেতে ঝুম / প্রেমের আগুন নিভামু—Full fire in the room!
গানের লিরিক্সে এই ইংরেজি চরণের অনুপ্রবেশ গানটিকে মুহূর্তে এক ভিন্ন মাত্রা দিল। লঞ্চের সেই পুরোনো কেবিন রুমটাই যেন একলাফে হয়ে উঠলো আধুনিক কোনো ক্লাবের মতো উত্তপ্ত, যেখানে প্রেমানুভূতির কোনো সীমা নেই।
প্রেমিক এখানে আরও বেশি বেপরোয়া, সমাজ বা পাড়া-প্রতিবেশীর তোয়াক্কা না করে চিৎকার করে বলতে চায়
Please don’t disturb, আমি আছি মিশনে / লাঈলী মজনু আজকে রইয়া যাবে পেছোনে।
ক্লাসিক্যাল প্রেমের সব মহাকাব্যিক উপমান
লায়লী-মজনু, শিরি-ফরহাদকে হাসিমুখে পেছনে ফেলে দিয়ে এই প্রজন্মের প্রেমিক বলতে চায়, তাদের এই সংক্ষিপ্ত লঞ্চ-যাত্রার কেবিন রোমান্সই এখন সর্বশ্রেষ্ঠ। এখানে নেই কোনো জটিল সামাজিক ব্যাকরণ, আছে শুধু প্রিয়মানুষকে কাছে পাওয়ার অবাধ স্বাধীনতা
গ্যাপ থাকব না আদরে / সব আদর সোহাগ লাইগা থাকব কেবিনের চাদরে।
আরিয়ান যখন ট্র্যাকটি রিলিজ করলেন, তারপরের ঘটনা কোনো সাধারণ সাফল্য নয়। এক মহামারীতুল্য ডিজিটাল বিস্ফোরণ!
গানটি ইন্টারনেটে মুক্তি পেতেই যেন বাঁধ ভাঙলো। ঢাকার ধানমন্ডির অভিজাত ক্যাফে থেকে শুরু করে পুরান ঢাকার সরু গলি, টিকটকের লাখ লাখ রিলস থেকে শুরু করে মাঝরাতের কারাওকে রুম—সব জায়গায় একটাই সুর। বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে সারাদিন অফিসের খাটুনি শেষে ঘরে ফেরা বয়স্ক কর্মকর্তা, সবাই হঠাৎ নিজেকে ওই লঞ্চের ডেক আর কেবিনের এক রহস্যময় যাত্রী ভাবতে শুরু করলো।
যে সমাজে মানুষ সম্পর্কের জটিল সমীকরণ, ক্যারিয়ার আর সামাজিক লৌকিকতার ঘানি টানতে টানতে ক্লান্ত, সেখানে এই গানটি মানুষকে দিল এক অদ্ভুত, সস্তা অথচ খাঁটি মুক্তি। গানটি সবাইকে যেন অঘোষিতভাবে জানিয়ে দিল, প্রেমে পড়া মানে সারাজীবন কেঁদে ভাসানো নয়; কখনো কখনো নদীর ওপর একটা ছোট কেবিন রুমে প্রিয় মানুষের রূপের পিনিকে ঝিম মেরে থাকা, কিংবা মোবাইল-ক্যামেরা হাতে ছদ্মবেশী সাংবাদিক সেজে একটু পাগলামি করাই জীবনের সবচেয়ে খাঁটি আনন্দ।
নার্গিসের সেই অবহেলিত, মফস্বলি স্টেজ গানটি শেষ পর্যন্ত আর কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ের বা শিল্পীর গণ্ডিতে আটকে রইলো না।
আজও যখন গভীর রাতে বুড়িগঙ্গার ঘাট ছেড়ে বিশাল বিশাল লঞ্চগুলো দক্ষিণের গন্তব্যে অন্ধকার নদী চিরে ছুটে চলে, আর কেবিনের জানালার আঁধার স্পর্শ করে ঠাণ্ডা বাতাস ভেতরে ঢোকে, তখন মনে হয়, এই রূপালী নদী নিজেই যেন জলরাশির ছন্দে গুনগুন করে সেই চেনা গানটি গেয়ে চলেছে।
যুগের পর যুগ বদলে যায়, ডিজিটাল পর্দার রঙ পরিবর্তন হয়, কিন্তু বরিশালের লঞ্চের সেই কেবিন রুম আর একটা নিশ্চিন্ত ঘুমের ফ্যান্টাসি থেকে যায় ঠিক আগের মতোই চিরন্তন।



পাঠকের মন্তব্য