ডাক্তার জাহাঙ্গীর কবির সাহেবরে তো আপনারা চেনেনই। ওই যে ভদ্রলোক, যিনি বাঙালিরে বুঝাইছেন ভাত হইল বিষ, আর ঘি হইল অমৃত। তারে দেইখা দেশের এক অংশ হুট কইরা রাইতে হাঁটতে বাইর হইল, আর আরেক অংশ শসা আর সেদ্ধ ডিম নিয়া জীবন কাটানো শুরু করল। লোকটার জনপ্রিয়তা কিন্তু কম না। উনি কিছু কইলে মনে হয় বেদের বাণী নামছে। কিন্তু সমস্যা হইল, শুধু ভাত ছাড়াইয়া বা সকালে পানের পাতার মতো শাকের রস খাওয়াইয়া উনার মন ভরল না। উনি ভাবলেন, এই অবাধ্য বাঙালি জাতিরে শুধু উপর দিয়া শোধরাইলে হইব না, একদম নিচ দিয়া শোধন করতে হইব!
তারপর বাংলাদেশে আইল কফি এনিমা।
একবার চিন্তা করেন, যে দেশে কফি মানে ক্যাফেতে বইসা প্রেম করা, না হয় বন্ধুবান্ধবের লগে আড্ডা দিয়া একটু স্টাইল মারা, সেইখানে এক সকালে জাহাঙ্গীর সাহেব ভিডিওতে আইসা কইলেন, কফি মুখ দিয়া খাওনের জিনিস না, এইটা ঢালতে হইব সরাসরি অন্য রাস্তা দিয়া! বাঙালি এমনিতেই ডিটক্স কথাটা শুনলে পাগল হইয়া যায়। শরীরের ভিতরের সব পাপ, সব বিরিয়ানির তেল, সব ফুচকার ঝাল একবারে বাইর কইরা ফেলার সুযোগ পাইলে কে আর ছাড়ে? ফলে হাজার হাজার মানুষ কফি বানাইয়া, সেইটা এনিমার মাধ্যমে মলদ্বার দিয়া শরীরে ঢুকাতে চাইল। মানে মুখ দিয়া কফি খাওয়ার দিন শেষ, এখন সকালের কফিটাও পেছনের রাস্তা দিয়া নিতে হইব!
বিজ্ঞান অবশ্য এইসব দেইখা মাথায় হাত দিয়া বইসা আছে। আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটি থেইকা শুরু কইরা ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক পর্যন্ত সবাই মোটামুটি একই কথা কয়, ভাই, শরীর পরিষ্কার করার ব্যবস্থা শরীরের ভিতরেই আছে। লিভার আর কিডনি সারাদিন ২৪ ঘণ্টা বিনা বেতনে ডিউটি করতেছে। তাদের চাকরি কাইড়া নিয়া মলদ্বার দিয়া ক্যাফেইন ঢুকাইয়া ডিটক্স করার কোনো দরকার নাই। কিন্তু বাঙালি বিজ্ঞানের কথা কতটুকু শুনে? ফেসবুকে পাঁচ মিলিয়ন ভিউ হইছে, এইটাই তো আমাদের কাছে পিএইচডির সমান!
আর এই কফি এনিমা করতে গিয়া শরীরের কী অবস্থা হয়, সেইটা কিন্তু মজার বিষয় না। কফি বেশি গরম হইলে ভেতরের নরম টিস্যুতে বার্ন হইতে পারে। এইটারে রেক্টাল বার্ন বলে। কফির কারণে অন্ত্রে প্রদাহ, ঘা কিংবা প্রোক্টোকোলাইটিসও হইতে পারে। আবার বারবার এনিমা করলে শরীরের সোডিয়াম-পটাশিয়ামের মতো দরকারি ইলেকট্রোলাইটের ব্যালান্স নষ্ট হইতে পারে। তখন হার্টের রিদম গণ্ডগোল, পেশিতে খিঁচুনি, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা এমনকি গুরুতর সমস্যাও হইতে পারে।
এরপর আছে ইনফেকশনের ঝুঁকি। এনিমার কিট ঠিকমতো পরিষ্কার না থাকলে ব্যাকটেরিয়া শরীরের ভিতরে ঢুইকা ভয়ংকর সংক্রমণ করতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে সেপসিস পর্যন্ত হইতে পারে। আর এইটা কোনো বানানো ভয় দেখানো গল্প না। মেডিকেল সাহিত্যে কফি এনিমার সঙ্গে গুরুতর জটিলতা এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও নথিভুক্ত আছে। মানে যে কফি খাইয়া মানুষ ঘুম তাড়ায়, সেই কফি ভুল রাস্তা দিয়া ঢুকাইতে গিয়া কেউ কেউ চিরদিনের জন্য ঘুমাইয়াও পড়ছে!
সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হইল, কফি এনিমার কথা কওয়ার পাশাপাশি রেডিমেড এনিমা কিট আর অর্গানিক কফি বিক্রির বিষয়ও সামনে আসছে। ব্যাপারটা তাই শুধু স্বাস্থ্যপরামর্শের জায়গায় থাইকা ব্যবসার জায়গাতেও ঢুইকা যায়। আগে মানুষরে বলা হইল শরীরের ভিতরে ময়লা জমছে, পরে সেই ময়লা পরিষ্কার করার জন্য বিশেষ পদ্ধতি, কফি আর কিটও পাওয়া গেল। মার্কেটিংয়ের দিক দিয়া চিন্তা করলে ব্যাপারটা বেশ চমৎকার। ভয় দেখাও, সমাধান দাও, তারপর সেই সমাধানের সরঞ্জামও নিজেই বিক্রি করো।
তবে সব দোষ শুধু ডাক্তারের ঘাড়ে চাপাইলে হবে না। দোষ আমাদেরও আছে। আমরা আসল ডাক্তারের কাছে গিয়া ফাইবার খাওন, শাকসবজি খাওন, পানি খাওন, নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করার কথা শুনলে পাত্তা দিই না। কিন্তু ফেসবুকের কোনো স্বাস্থ্যগুরু যদি কইয়া বসে, পিঠ দিয়া না, নিচ দিয়া গরম কফি ঢালেন, শরীর ডিটক্স হইয়া যাইব, তখন আমরা অমনি কফির পাত্র চুলায় বসাইয়া দিই।
পরামর্শটা খুব সোজা। কফি মগেই খান, মলদ্বারে না। শরীর পরিষ্কার রাখার জন্য পর্যাপ্ত পানি খান, ফাইবারযুক্ত খাবার খান, নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করেন। শরীরের লিভার-কিডনিরে তাদের কাজ করতে দেন। কফি শপ বানানোর জন্য শরীরে অন্য কোনো দরজা খুঁজতে যাইয়েন না



পাঠকের মন্তব্য