মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র আফগানিস্তানেই কনসার্ট, নারীর শিক্ষা ও ক্রীড়ায় অংশগ্রহণ বন্ধ রয়েছে। অথচ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, মিশর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, ইরান, এমনকি পাকিস্তানেও নির্বিঘ্নে কনসার্ট অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং শিক্ষা ও ক্রীড়ায় নারীর অংশগ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। কর্মক্ষেত্রেও নারীর অংশগ্রহণ ক্রমশ বাড়ছে।
আফগানিস্তানের তালেবান সরকার যে ‘ইসলাম’ চর্চা করছে, অন্য কোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে সেই ‘কল্পিত’ ইসলামের অস্তিত্ব নেই। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের একমাত্র সমর্থক হিসেবে দৃশ্যমান। তালেবান সরকার সম্প্রতি তাদের প্রথম অনুষ্ঠানটি করেছে দিল্লিতে। ভারতের সরকারি প্রতিনিধিরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশের সাবেক ফ্যাসিস্ট সরকার শেখ হাসিনার সময় থেকে ‘তৌহিদি জনতা’ নামে একটি গোষ্ঠী আফগানিস্তানের তালেবান মডেলের ‘ইসলাম’ চর্চা করছে। আর এটা করতে গিয়ে তারা কনসার্ট বন্ধ করে দেওয়া থেকে শুরু করে নারীর অধিকার হরণকারী নানা দফা নিয়ে হাজির হয়েছে। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা যেভাবে আফগানিস্তানের তালেবানদের পৃষ্ঠপোষকতা করে, একইভাবে তারা বাংলাদেশের তৌহিদি জনতাকেও পৃষ্ঠপোষকতা করে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে প্রভাব-প্রতিপত্তি হারানোর পর ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা আফগানিস্তানে তালেবান ও বাংলাদেশে তৌহিদি জনতাকে আঁকড়ে ধরে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
তুরস্ক থেকে পাকিস্তান—মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোতে অসংখ্য মাজার রয়েছে। সমাজে এই মাজারভিত্তিক আধ্যাত্মিকতা বিভাজনের পরিবর্তে ভালোবাসার বার্তা নিয়ে জনসমাজে উপস্থিত।
অথচ ভারতের বজরঙ্গি ও বাংলাদেশের তৌহিদি জনতা একের পর এক মাজার ভাঙতে উদ্যত। আফগানিস্তানের সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোকে ভারত তার চিরশত্রু চীন ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে। আর বাংলাদেশের তৌহিদি জনতাকে ভারত ব্যবহার করে ইসলামি সন্ত্রাসবাদের জুজু দেখানোর জন্য।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে হাসিনার পতন ঘটার পর থেকে ভারতের গদি মিডিয়া ও হিন্দুত্ববাদের সমর্থক সাংবাদিক-সাবেক রাষ্ট্রদূতরা—‘বাংলাদেশ হাসিনার অধীনে না থাকা মানেই ইসলামপন্থী হয়ে যাওয়া’, ‘ইনশাল্লাহ বাংলাদেশ’ ইত্যাদি প্রোপাগান্ডা শুরু করে জয় শ্রীরামের গেরুয়া মাদুর পেতে। অমনি তাদের সেই বয়ান সাবস্ট্যানশিয়েট ও প্রমাণ করতে তৌহিদি জনতা লেগে পড়ে মাজার ভাঙতে।
বাংলাদেশে ভারতের গদি মিডিয়াঘেঁষা মূলধারার মিডিয়া ‘এলো এলো বাঘ এলো’ বলে মিথ্যাবাদী রাখালের গল্প শুরু করে। বাংলাদেশে শতবর্ষ ধরে তৈরি করা বজরঙ্গি ও গেরুয়া কালচারাল উইং তখন সোশ্যাল মিডিয়া ও টকশোতে ‘ইসলামাইজেশন’-এর কল্পগল্পটি রসিয়ে রসিয়ে বলতে শুরু করে।
অতি সম্প্রতি দিল্লির কাল্পনিক ‘আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকনটিনেন্ট’ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি বাংলাদেশ থেকে শক্তি সংগ্রহের চেষ্টা করতে পারে—জাতিসংঘের প্রতিবেদনের এই একটি বাক্যকে গেঁজিয়ে ও ফেনিয়ে বলতে শুরু করে বাংলাদেশের গদিবর্তী মিডিয়া ও গেরুয়া কালচারাল উইং।
তৌহিদি জনতা তখন ভারতের এই কল্পনাকে বাস্তব ভিত্তি দিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইনের কালচারাল প্রোগ্রামে হামলা করে, কিশোরগঞ্জে ‘কনসার্ট’ বন্ধ করে দেয়, ঈদে মিলাদুন্নবীর মিছিলের বিরুদ্ধে ফতোয়া দেয়। এই যে ভারতীয় মিডিয়ায় ‘বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ’ বয়ান, আর তা প্রমাণে তৌহিদি জনতার অ্যাকশন—এই যুগলবন্দী দিল্লি-কাবুল যুগলবন্দীর মতোই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
সাবেক ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ হাসিনার শোকরানা মাহফিলে অংশগ্রহণ, খাসজমি প্রদান ও প্রয়াত মওলানা শফির ভারতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা—এসবই ছিল হিন্দুত্ববাদী আওয়ামী লীগের ইসলামি আলখাল্লা পরে ‘যেমন খুশি তেমনি সাজো’। আর জঙ্গিজুজু জিইয়ে রেখে অনন্তকাল বাংলাদেশ শাসনের ‘অখণ্ড ভারতীয় ধান্দার ব্যবসা’।
ক্ষমতাসীন বিএনপির ভারতের বরপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের মতো কোনো আইডেন্টিটি ক্রাইসিস নেই। একজন আত্মবিশ্বাসী মুসলমান যেভাবে অন্যান্য ধর্মের মানুষের সঙ্গে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও মর্যাদার জীবনযাপন করতে পারে, বিএনপির পক্ষেও ঠিক সেরকম একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
কাজেই বর্তমান সরকার তৌহিদি জনতার সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধান নিয়ে আসতে পারবে বলে ধারণা করি। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না থেকে নিজস্ব মনগড়া আইনকানুন প্রতিষ্ঠার যে ইউটোপিয়া কথিত তৌহিদি জনতার মধ্যে কাজ করে, সেখান থেকে তাদের বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনতে বিএনপি সরকার সক্ষম হবে বলে বিশ্বাস করি।
বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলোকে সরকারি মনিটরিংয়ের আওতায় এনে সেখানে অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মাদ্রাসার মতো ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা প্রচলন করতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করতে হবে।
একটি বিষয় তৌহিদি জনতার কাছে স্পষ্ট হওয়া জরুরি—স্বঘোষিত শ্রেষ্ঠত্বের বোধ জীবনে কোনো কাজে আসে না। ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা নিজেদের ধর্মকে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করে ইসরায়েলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে গেছে। সেখানে ইরানের হামলার মুখে তেল আবিবে ইসরায়েলিদের জন্য তৈরি আন্ডারগ্রাউন্ড বাংকারে ভারতীয়রা আশ্রয় নিতে গেলে ইসরায়েলিরা তাদের বের করে দেয়।
যত দিন পর্যন্ত ভারতের বৈষম্যধূসর সমাজ সামষ্টিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারবে না, তত দিন পর্যন্ত মর্যাদার চোখে কেউ তাদের দেখবে না। তৌহিদি জনতাকেও তাই মনে রাখতে হবে, সৌদি শেখের মতো পোশাক পরে কিংবা দেশের অভ্যন্তরে নিজেদের পেশিশক্তি ব্যবহার করে কখনোই কোনো শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা সম্ভব নয়।
বৈষম্যধূসর সমাজে কঠোর পরিশ্রম করে সামষ্টিক সমৃদ্ধি অর্জন না করে মুসলিম বিশ্বে কোনো মর্যাদা লাভ অসম্ভব। কট্টর হিন্দুত্ববাদী ভারত ও কট্টর ইসলামপন্থী আফগানিস্তান এখন পৃথিবীর আদিম চিন্তার দেশ হিসেবে নিন্দিত। তাদের অনুসরণ করে তৌহিদি জনতা কখনোই সভ্যতার পাদপ্রদীপে পৌঁছাতে পারবে না।
মালয়েশিয়া ও তুরস্কের মতো সফল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ থাকতে ভারত-আফগানিস্তানের মতো ব্যর্থ রাষ্ট্র কখনোই অনুসরণযোগ্য হতে পারে না।



পাঠকের মন্তব্য