পিংক কালার কি আসলেই ‘নারীদের রঙ’?

৩৭ পঠিত ... ১৬:৫৭, আগস্ট ১৯, ২০২৬

ছোট্টো একটা শিশু। পোশাক দেখে কিছু বুঝুন আর না বুঝুন, রং যখন দেখবেন গোলাপি; আপনি বুঝে যাবেন তার জেন্ডার। শুধু পোশাকই না, আপনি দেখবেন তার পুতুলটা গোলাপি, তার জুতাটা গোলাপি, এমনকি তার যে ফিডার, তার ক্যাপটাও গোলাপি।

কেন এই গোলাপিপ্রীতি? বাচ্চাটা কি গোলাপি রং দেখলে হাসিখুশি থাকে? বা, ছেলেবাচ্চা কিংবা ছেলেদের যে নীল রঙের প্রীতি আছে বলা হয়, কোনো ছেলেশিশু কি নীল রঙের প্রতি প্রীতি দেখায়?

নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী এনিয়া হার্লবার্ট এবং ইয়াজু লিং-এর একটা মজার গবেষণা আছে এ ব্যাপারে। মোট ২০৮ জন অংশগ্রহণকারীকে বলা হয়, খুব দ্রুত কার্সর ঘুরিয়ে কয়েকটি রং, কয়েক শেডের রং, আলো এবং অন্ধকারের মিশেলে রং, বিভিন্ন আকৃতিতে থাকা রংয়ের মধ্যে থেকে নিজের পছন্দের রংটি বাছাই করতে। সপ্তাহ দুয়েক পর আবার তাদের নিয়ে একই পরীক্ষা করা হয়।

গবেষণা থেকে জানা যায়, প্রায় সব মানুষই সাধারণত নীল রং পছন্দ করে। তবে ছেলেরা যে ক্ষেত্রে নীলের সঙ্গে সবুজের মিশ্রণ পছন্দ করে, সেক্ষেত্রে মেয়েরা একটু লালচে রঙের নীল পছন্দ করে। অনেকটা বেগুনি ধাঁচের রং এগিয়ে থাকে তাদের পছন্দের তালিকায়। নিজেদের সংস্কৃতির কারণে রঙের পছন্দ ভিন্ন হতে পারে—সেই কথা মাথায় রেখে এই পরীক্ষায় রাখা হয়েছিল বেশ কয়েকটি সংস্কৃতির মানুষকে।

তাহলে? মেয়েদের পছন্দের রং গোলাপি—এই ধারণা এলো কোত্থেকে? এইটা একটা প্রশ্ন।

ইতিহাস নিয়ে গবেষকরা কী বলে জানেন? নারীরা পুরুষদের চাইতে রঙের আভা ভালো বুঝতে পারে। এই ক্ষমতা আজকের নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে অভ্যাসের ফলে তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তারা। প্রাচীনকালে পুরুষেরা শিকারে যেত। আর নারীরা ফল পেড়ে আনত, বাচ্চা লালন-পালন করত। এসব কারণে কোন ফল পেকেছে, কোন ফলের গায়ে লালচে আভাস দেখা যাচ্ছে—এসব পুরুষদের চাইতে ভালোভাবে দেখতে শুরু করে নারীরা।

অন্যদিকে, শিশুর যত্ন নিতে গিয়ে তাদের বুঝতে হতো যে, শিশুর গালে আভা কতটুকু লালচে হলে বুঝতে হবে তার শরীর খারাপ। আর অভ্যাসের কারণে রং এবং রঙের মিশ্রণ পুরুষের চাইতে বেশি পরিষ্কারভাবে দেখতে শুরু করে নারীরা, যার প্রভাব যায়নি এখনও। তাই অনেক সময় পুরুষেরা গোলাপি রং হালকা বলে সেটাকে খুব ভালো করে দেখতে এবং পছন্দ করতে পারে না। তাদের দরকার পড়ে গাঢ় কোনো রং। সত্যিই তো, যে রঙের পুরোটা রূপ আপনি উপভোগ করতে পারছেন না, সেটা আপনার ভালো না-ই লাগতে পারে!

রানি এলিজাবেথের কোলে তার নাতি প্রিন্স উইলিয়ামস। ছেলে যেহেতু, হালকা নীল পোশাকের রঙ 

বোঝা যায়, হালকা রঙে নারীর প্রীতি থাকতে পারে; তাই বলে গোলাপিই কেন?

এই যেমন, ঢাকা শহরে চালু হওয়া পিংক বাসের ড্রাইভার সুপ্রিয়া কুন্ডু জানান, প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা ছিল এটি, পোশাক এবং বাসের রং দুটিই গোলাপি হবে। উনি দেশের বাইরে দেখেছেন এমন। মেয়েদের পিংক কালারের প্রতি একটা দুর্বলতা আছে। সেদিক থেকে বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে বাসের রং পিংক হবে।

(বাংলা ট্রিবিউন)

মেয়েদের কি গোলাপির প্রতি আসলেই কোনো দুর্বলতা আছে? না। গোলাপি যে ‘মেয়েদের রং’, তা কিন্তু কোনো সরকার বা ব্যক্তি ঘোষণা করেনি। মূলত ফ্যাশন, ব্যবসা, বিজ্ঞাপন ও পপ কালচারের হাত ধরে ধীরে ধীরে এই ধারণার জন্ম। উনিশ শতকের শেষে বা বিশ শতকের শুরুতে শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট রঙের পোশাকের চল ছিল না। ময়লা সহজে পরিষ্কার করা যেত বলে ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সবাইকে সাদাই পরানো হতো। এমনকি প্রথম কয়েক বছর ছেলেদের পোশাকও মেয়েদের মতোই হতো; রং দেখে লিঙ্গ চেনার কোনো উপায় তখন ছিল না।

বিশ শতকের শুরুর দিকে কিন্তু হিসাবটা একেবারেই উল্টো ছিল। ১৯১৮ সালের একটি মার্কিন বাণিজ্যিক সাময়িকীতে ছেলেদের জন্য গোলাপি আর মেয়েদের জন্য নীল রং সুপারিশ করা হয়। লালের কাছাকাছি বলে গোলাপিকে তখন ধরা হতো শক্তিশালী ও পুরুষের রং, আর নীলকে ভাবা হতো কোমল। ১৯২০-এর দশকেও বড় দোকানগুলো ঠিক করতে পারছিল না কোন রং কার জন্য উপযুক্ত। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে ব্যবসায়ীরা মার্কেটিংয়ের নতুন এক চাল চাললেন। তারা বুঝলেন, ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা রঙের পণ্য বানালে কাটতি বহুগুণ বাড়বে।

ব্যবসায়িক স্বার্থেই তখন থেকে মেয়েদের খেলনা ও পোশাকে গোলাপি আর ছেলেদের জিনিসে নীল রঙের ছড়াছড়ি শুরু হয়। বিজ্ঞাপন আর পপ কালচারের অনবরত প্রভাবে এক প্রজন্মের ব্যবধানে এই বাণিজ্যিক চালটাই সমাজের চোখে ‘স্বাভাবিক নিয়ম’ হয়ে দাঁড়ায়।

আহারে পয়সা... এইটাই তো আমাদের সকল পছন্দ-অপছন্দ ঠিক করার নিয়ামক! এই পয়সার জোরেই সমাজ গোলাপিকে বানিয়েছে নারীর রং; নীলকে পুরুষের!

৩৭ পঠিত ... ১৬:৫৭, আগস্ট ১৯, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top