জোছনা রাতে পুরান ঢাকার বকশীবাজারের দিকে একা হাঁটলে মাঝে মাঝে মনে হয়, সময় বোধহয় কোথাও গিয়ে আটকা পড়ছে। চারপাশে ঘিঞ্জি গলি, পুরোনো দালান, বিরিয়ানির গন্ধ, রিকশার ঘণ্টি। এর মধ্যে হঠাৎ কোনো এক অন্ধকার গলি থেকে ঘুঘুর ডাক ভেসে এলে ব্যাপারটা আরও অদ্ভুত লাগে। মনে হয়, এই শহরটা আসলে যতটা পুরোনো দেখায়, তার চেয়েও অনেক বেশি পুরোনো। এই শহরের প্রায় চারশ বছরের একটা গল্প আছে। গল্পটা শোকের। আবার শুধু শোকেরও না। এর মধ্যে আছে বিশ্বাস, স্মৃতি আর মানুষের অদ্ভুত এক ধরনের ভালোবাসা।
হোসেনি দালানকে ঘিরে প্রচলিত একটি কিংবদন্তি আছে। কথিত আছে, ১৬৪২ সালের দিকে শাহ সুজার আমলে মীর মুরাদ নামে এক কর্মকর্তা স্বপ্নে ইমাম হোসাইনের স্মৃতি নিয়ে একটি স্থাপনা নির্মাণের ইশারা পেয়েছিলেন। সেই স্বপ্নের কাহিনি ইতিহাসের নিশ্চিত প্রমাণ নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি লোককথা। তবে এটুকু মোটামুটি নিশ্চিত যে, সপ্তদশ শতকে ঢাকায় হোসেনি দালানের সূচনা হয় এবং পরে এটি শিয়া মুসলিমদের মহররমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
হোসেনী দালান
তারপর কেটে গেছে প্রায় চারশ বছর। মানুষ বদলেছে। নবাব গেছে, সাহেব গেছে, পাকিস্তান গেছে, বাংলাদেশ এসেছে। ঢাকার রাস্তা বদলেছে, বাড়িঘর বদলেছে। কিন্তু মহররম এলে বকশীবাজারের হোসেনি দালান আবার পুরোনো একটা স্মৃতি নিয়ে জেগে ওঠে।
তাজিয়ার কথাও তখন মনে আসে। তাজিয়া হলো ইমাম হোসাইনের শাহাদাতের স্মরণে তৈরি প্রতীকী কাঠামো। তাআজিয়া শব্দটির সঙ্গে শোক প্রকাশ, সমবেদনা ও সান্ত্বনার ধারণা জড়িয়ে আছে। কাঠ, বাঁশ, কাগজ, কাপড় আর নানা কারুকাজ দিয়ে তৈরি এই তাজিয়া দেখতে কখনো ছোট, কখনো বিশাল। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এগুলো শুধু একটা কাঠামো না। মানুষের কাছে এগুলো একটা ইতিহাসের স্মৃতি। মহররমের চাঁদ উঠলে হোসেনি দালানের আশপাশের পরিবেশও বদলে যায়। কালো পোশাক পরা মানুষ আসে। মজলিস বসে। শোকের গান, মাতম আর কারবালার কাহিনি শোনা যায়। প্রায় তেরোশ বছরের পুরোনো একটা ঘটনা তখন হঠাৎ খুব কাছের মনে হয়।
কারবালার ঘটনা ঘটেছিল ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে। ইমাম হোসাইন ইবনে আলী এবং তার অল্পসংখ্যক সঙ্গী ইয়াজিদের বাহিনীর হাতে নিহত হন। পানির সংকট, অবরুদ্ধ পরিবার, যুদ্ধ এবং শেষ পর্যন্ত শাহাদাতের সেই ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছে। আজ থেকে প্রায় ১৩৫০ বছর আগে। কিন্তু মানুষের স্মৃতির অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। এত বছর পরও একটা ঘটনার শোক মুছে যায়নি। আশুরার দিন হোসেনি দালান থেকে তাজিয়া মিছিল বের হয়। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা পেরিয়ে এই শোকযাত্রা এগিয়ে যায়। মিছিলের রুট ও আয়োজন সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে, কিন্তু মূল বিষয়টা বদলায় না। মানুষ আসে স্মরণ করতে।
কারও হাতে পতাকা। কারও হাতে তাজিয়া। কেউ বুক চাপড়ে মাতম করছে। কোথাও শোকের সুর। কোথাও শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ। দূর থেকে দেখে মনে হয়, এত মানুষ এত পুরোনো একটা ঘটনার জন্য কেন কাঁদছে? এর উত্তর সম্ভবত খুব সহজ। মানুষ শুধু নিজের দুঃখের জন্য কাঁদে না। অন্যের দুঃখকেও নিজের করে নিতে পারে।
কারবালার গল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গাটা হয়তো এখানেই। প্রায় তেরোশ বছর আগে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা আজও মানুষের কাছে অন্যায়, ত্যাগ আর প্রতিরোধের গল্প হয়ে আছে। ঢাকার আধুনিক মানুষজনও তখন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মিছিল দেখে। কেউ ছবি তোলে, কেউ ভিডিও করে, কেউ কিছুই করে না। শুধু তাকিয়ে থাকে। হয়তো তারা পুরো ইতিহাস জানে না। হয়তো জানে। তাতে খুব একটা কিছু আসে যায় না। কিছু দৃশ্য বোঝার জন্য ইতিহাসের বই লাগে না।
একটা কালো পোশাক পরা মানুষ যখন বুক চাপড়ে ‘হায় হোসাইন’ বলে ওঠে, তখন বোঝা যায়, কয়েকশ বছর পুরোনো কোনো স্মৃতি এখনো মানুষের ভেতরে বেঁচে থাকতে পারে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। মিছিলের মানুষ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যায়। শহর আবার নিজের স্বাভাবিক চেহারায় ফিরে আসে। গাড়ির হর্ন বাজে, দোকান খোলে, রিকশা চলে, মানুষ বাসায় ফেরে।
হোসেনি দালানের উঠানও একসময় শান্ত হয়ে যায়। তবে পুরোপুরি কি শান্ত হয়? হয়তো না। কারণ কিছু শোকের বয়স হয় না। কিছু গল্পেরও না। বকশীবাজারের কোনো পুরোনো গলিতে জোছনা পড়লে তাই মাঝে মাঝে মনে হয়, সময় আসলে কোথাও থেমে নেই। শুধু কিছু স্মৃতি আছে, যেগুলো সময়ের সঙ্গে হাঁটে না। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে।
হোসেনি দালানের মতো।
প্রায় চারশ বছর ধরে।




পাঠকের মন্তব্য