সেদিন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি, স্কেভেডর দিয়ে মাটি কাটছে। আপনারা জানেনই এটা হলো বাঙালী পুরুষের পিক এন্টারটেইনমেন্ট মোমেন্ট। সেখানে নানারকম পুরুষের ভিড়। সবাই মনোযোগ দিয়ে আশেপাশের কাজ দেখছে। এর একটু পাশের নারী-পুরুষ শ্রমিকরা মিলে ইট টানছে মাথায় নিয়ে। সেই নারীদের দিকে আমার নজর গেল। তাদের কাপড় বরাবরের মতোই শতচ্ছিন্ন। এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই মেয়েদের সেই পর্দা মেইনটেইনের কোনো বালাই নাই। কিন্তু কেউ এটা নিয়ে কিছু বলছেও না।
আপনাদের মনে হবে এটা দেখে কেন আমার পর্দার কথা মনে আসলো। আমি খুব ছোটকাল থেকেই পর্দা মেইনটেইন করার চেষ্টা করি। এবং আমি প্রচুর প্রচুর মানুষের থেকে তবুও পর্দা করা নিয়ে কথা শুনেছি। একবার অটোরিক্সায় একজন জিজ্ঞেস করেছিলেন আমি কেন ছেলেদের ব্যাগ ঘাড়ে নিয়েছি! আমি আজীবনই ব্যাকপ্যাক ইউজ করেছি। সেটা যে শুধুই ছেলেদের ব্যাগ তা জীবনে প্রথমবার জেনে অবাক হয়েছিলাম! তাছাড়া আমার পর্দার সাথে, পোশাকের সাথে এই ব্যাগের কোনো যোগাযোগ নেই। এটি শুধুই একটি ব্যবহারিক জিনিস। কিন্তু আমাকে দেখে সেই মানুষটির মনে হয়েছিল, আমাকে মোরাল পুলিশিং করা যায়। যেহেতু আমি বোরকা-হিজাব পরা কাজেই আমাকে বলার মতো একটা কিছু তিনি খুঁজে বের করেছেন।
আপনারা কখনও খেয়াল করে দেখেছেন কি না, আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি মোরাল পুলিশিং, স্লাট শেমিং এগুলো হয় এই নিম্ন-মধ্যবিত্ত আর মধ্যবিত্ত শ্রেণির নারীদের সাথে। রাস্তাঘাটে চলার ফাঁকে, স্কুল-কলেজ-ভার্সিটিতে, অফিস, বাজার যেকোনো জায়গায় এই মোরাল পুলিশিং গোষ্ঠীর প্রাইমারি টার্গেট হলো এই শ্রেনির নারীরা। যেন পর্দার বিধান শুধু এই শ্রেণীতেই আছে!
এখন আপনারা বলবেন, গরীব শ্রেণির মেয়েরা লোলুপ দৃষ্টি থেকে বাঁচে না। বা ওরা ফ্রিকোয়েন্ট যৌন-নির্যাতন, ধর্ষণের শিকার হয়। কিন্তু আপনি যদি খুব ক্লোজলি খোঁজ নেন, আর নারীরা নিজেদের ভয়কে জয় করে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে তাহলে আবিষ্কার করবেন এগুলো থেকে কোনো শ্রেণির নারী নিরাপদ না। বোরকা পরা মেয়েকেও টিজ করে, ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরা মেয়েকেও টিজ করে।
অর্থনীতি যেখানে দূর্বল, নীতির কথাও সেখানে চলে না
এই যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে থাকা মেয়েদেরকে এত সহজে টার্গেট করে এগুলা যারা করে, এর পেছনে যে মনস্তত্ত্ব কাজ করে, তার সাথে আছে একটা অর্থনৈতিক কানেকশন! একবার ভেবে দেখেন একজন উচ্চবিত্ত ও সামাজিকভাবে ক্ষমতাশালী নারীকে কেউ গিয়ে বলল, kanke mage orna koi! আর সে দিলো কেস করে! এরপর প্রভাব আর প্রতিপত্তির জেরে সেই লোকের জেল হলো- এত বড় রিস্ক কোনো নীতিবান ব্যক্তি নিতে চান না!
এদিকে এই যে রাস্তার শ্রমিক, নিতান্ত দরিদ্র নারী, কাজ করে- এদেরকে গিয়ে যদি বলে পর্দা কেন করো না? তাহলে কী হবে? তিনি খুব স্বাভাবিকভাবেই বলতে পারেন, ঠিক আছে, কাজ করব না। পর্দা করে ঘরে থাকব। কিন্তু আমার বাচ্চার খাবার কে দেবে? সংসার কে চালাবে? বলবেন তার স্বামী! দেখা যাবে এই মহিলাটির স্বামী হয়তো নেশাগ্রস্ত, জুয়াড়ি। এই নারীটিই সংসার টেনে যাচ্ছেন। না হলে দেখা যাবে তার স্বামীও তার সাথেই কাজ করছে।
এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করে বলা দরকার, দরিদ্র পুরুষ মানেই জুয়াড়ি, মদ্যপ বা মাদকাসক্ত, এমন কথা ঠিক না। কিন্তু কোনো পরিবারে জুয়া, মাদক বা অ্যালকোহলের সমস্যা থাকলে সেটি শুধু ওই ব্যক্তির ব্যক্তিগত অভ্যাস হয়ে থাকে না, তার আর্থিক প্রভাব পুরো পরিবারের ওপর পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আলোচনায়ও সমস্যাজনক জুয়ার সঙ্গে পরিবারে আর্থিক ক্ষতি, প্রয়োজনীয় খরচ কমে যাওয়া এবং সামাজিক ক্ষতির সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
ধরা যাক, একজন পুরুষ সামান্য আয় করেন, কিন্তু সেই আয়ের একটি বড় অংশ জুয়া বা মাদকে চলে যায়। সংসারে সন্তান আছে, বাড়িভাড়া আছে, খাবারের খরচ আছে, চিকিৎসার প্রয়োজন আছে। তখন সেই ঘাটতিটা পূরণ করবে কে? খুব সম্ভবত স্ত্রীকে কাজ করতে হবে। তাকে মানুষের বাসায় কাজ নিতে হবে, বাজারে বসতে হবে, রাস্তায় পণ্য বিক্রি করতে হবে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে আয় করতে হবে। অর্থাৎ তিনি অনেক সময় নিজের স্বাধীনতার বিলাসিতা থেকে বাইরে কাজ করছেন না, বরং পরিবারের অর্থনৈতিক ব্যর্থতার ক্ষতি সামলাতে বাইরে যাচ্ছেন। সেই নারীকে তখন যদি বলা হয়, আপনি বাইরে যাবেন না, পর্দা করে ঘরে থাকুন, প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিকভাবেই ফিরে আসে, সংসারের আয়টা কে দেবে?
তার ওপর পর্দার জন্য বোরকা, হিজাবসহ একটি নির্দিষ্ট খরচ আছে। মাস শেষে, বছর শেষে এই বাড়তি খরচ ওঠানোর সামর্থ্যও একটা ব্যাপার। দানের ভাগ আর কয়জনই বা পায়? তাছাড়া এ ধরণের কাপড় পরে অনেক কাজ করাও বেশ শক্ত ব্যাপার। কিছু কাজে কোনোভাবেই এগুলো মেইনটেইন করা সম্ভব না। এখন যিনি বা যারা বলবেন, তাদের এই প্রশ্নের প্রেক্ষিতে, আপনারাও তাহলে দায়িত্ব নেন বলে বসলে তো তারা বেশ ঝামেলায় পড়ে যান! কারণ তখন এই অর্থনৈতিক দায়িত্ব নেওয়ার ভার আসতেই পারে তাদের ঘাড়ে!
এই কারণেই পর্দার মোরাল পুলিশিং-এর মধ্যে শ্রেণির রাজনীতি দেখতে পাওয়া যায়। উচ্চবিত্ত নারীকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে ক্ষমতার প্রশ্ন আসে। দরিদ্র নারীকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে অর্থনীতির প্রশ্ন আসে। কিন্তু মধ্যবিত্ত নারীকে নিয়ে নৈতিকতা ফলানো তুলনামূলক সহজ। তাকে না টাকা দিতে হয়, না তার সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়, না তার সঙ্গে সরাসরি অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। ফলে ধর্ম, শালীনতা আর সামাজিক সম্মানের ভাষা ব্যবহার করে তাকে বিচার করা অনেক বেশি সুবিধাজনক।
এখানে নারীর ওপর শ্লাট শেমিং-এর বিষয়টিও এসে যায়। কোনো নারী বোরকা বা হিজাব পরছেন না দেখেই তার চরিত্র নিয়ে মন্তব্য করা, তার পোশাককে তার যৌন নৈতিকতার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া, তাকে ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ নারী হিসেবে ভাগ করা- এসব আসলে পোশাককে চরিত্রের মাপকাঠি বানানো। অথচ একজন মানুষের সততা, দায়িত্ববোধ, পরিশ্রম, মমতা কিংবা নৈতিকতার বিচার তার পোশাক দিয়ে করা যায় না। পোশাককে চরিত্রের সার্টিফিকেট বানিয়ে ফেলার প্রবণতা নারীর ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণেরই আরেকটি রূপ। আর এই নিয়ন্ত্রণ যখন শ্রেণিভেদে অসমভাবে প্রয়োগ হয়, তখন বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
এবার প্রশ্নটা তাদের দিকে ফেরানো যাক, যারা শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার কথা বলেন এবং সমাজে পর্দার বিধানকে আরও কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চান। ধর্মীয় বিশ্বাসের জায়গা থেকে তাদের অবস্থান থাকতে পারে, সেটি নিয়ে বিতর্ক আলাদা। কিন্তু তারা যদি এটিকে রাষ্ট্রীয় আইন বা সামাজিক কাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠার কথা বলেন, তাহলে তাদের কাছে অর্থনৈতিক প্রশ্নও করা খুবই স্বাভাবিক। একজন নারীকে কোনো একটি কাজ থেকে সরিয়ে দিলে তার বিকল্প কর্মসংস্থান কী হবে? তার আয় কত হবে? তার পরিবারে কতজন মানুষ তার আয়ের ওপর নির্ভরশীল? স্বামী যদি বেকার হন, দায়িত্ব না নেন, জুয়া খেলেন বা মাদকাসক্ত হন, তাহলে কী হবে? বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা বা একক মায়ের জন্য কী ব্যবস্থা থাকবে? যেসব নারী আজ বাধ্য হয়ে রাস্তায় কাজ করছেন, তাদের জীবিকার বিকল্প কী?
যদি উত্তর হয় যাকাত, বায়তুল মাল, ওয়াক্ফ বা ইসলামী সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন ব্যবস্থা, তাহলে সেটি অবশ্যই আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তায় এসব প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিক কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম বলা আর আধুনিক বাংলাদেশের জন্য তার কার্যকর অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা এক জিনিস নয়। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশে সেই ব্যবস্থা কীভাবে চলবে, কত সম্পদ প্রয়োজন হবে, কীভাবে সংগ্রহ ও বণ্টন হবে, কারা এর আওতায় আসবে, কীভাবে দুর্নীতি ঠেকানো হবে, কীভাবে কর্মসংস্থান তৈরি হবে, কীভাবে মূল্যস্ফীতি সামলানো হবে- এসব প্রশ্নেরও উত্তর দিতে হবে। অর্থাৎ শরিয়াহ চাই বলা একটি দাবি হতে পারে কিন্তু সেই শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্রের অর্থনীতি কীভাবে চলবে, তার সুস্পষ্ট কাঠামো দেখানো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
আমাদের ধর্মীয় বিতর্কে যেমন অর্থনীতির আলোচনা কম, তেমনি সাধারণ সামাজিক আলোচনাতেও অর্থনীতি নিয়ে গভীর বোঝাপড়া খুব বেশি নেই। আমরা মূল্যস্ফীতি, ডলারের দাম, জিডিপি কিংবা রেমিট্যান্স নিয়ে কথা বলি, কিন্তু একটি দরিদ্র পরিবার মাসের শেষে হাতে কত টাকা রাখে, বাড়িভাড়া দেওয়ার পর কত থাকে, চালের দাম বাড়লে কোন খাবার বাদ দিতে হয়, অসুস্থ হলে কোথা থেকে টাকা ধার করতে হয়, এক সপ্তাহ কাজ বন্ধ থাকলে পরিবার কতটা বিপদে পড়ে- এসবও যে অর্থনীতির অংশ, সেটা অনেক সময় ভুলে যাই। আর নারীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল, কারণ বাইরে আয় করার পাশাপাশি ঘরের রান্না, সন্তান দেখাশোনা, বয়স্কদের যত্নসহ বিপুল পরিমাণ অবৈতনিক কাজও নারীরা করেন।
মধ্যবিত্ত নারীদেরকে নিয়ে এই অসুবিধা নাই। না তাদের অর্থনৈতিক ভার নিতে হয়, না আছে তাদের ক্ষমতা। তাই তাদেরকে রাস্তাঘাটে, হাটে বাজারে সহজেই বলা যায় আপনি বোরকা পরেন না কেন? পর্দা করেন না কেন? ঘরে থাকেন না কেন? আমাদের দেশের যত নীতিবান মানুষ তাদের নীতিগুলো এভাবেই অর্থনৈতিক অবস্থা দিয়ে স্থির হয় যে কাকে পর্দা করতে বলতে হবে আর কারটা এড়িয়ে যেতে হবে! কাকে পর্দা করতে বলা যাবে, কাকে বলা যাবে না। কাকে নৈতিকতার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নিরাপদ, আর কার ক্ষেত্রে হঠাৎ করে নীতির আওয়াজটা একটু ক্ষীণ হয়ে আসে।
সবশেষে বিখ্যাত সেই লাইনকে একটু চেঞ্জ করে বলতে ইচ্ছা হয়, ঈশ্বরের বিধান থাকে শুধু এই মধ্যবিত্ত শ্রেণিতেই…




পাঠকের মন্তব্য