পয়সারহাটে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিব আসেন জনসভায় ভাষণ দিতে। তিনি প্রাদেশিক পরিষদে গোপালগঞ্জ থেকে নির্বাচিত সাংসদ। রেলস্টেশনে তাঁকে স্বাগত জানাতে এসেছেন স্থানীয় সাংসদ কলিম চৌধুরী। পথিকৃৎ বাতেনকেও সেখানে দেখা যায়। সে শেখ মুজিবকে পয়সারহাটে স্বাগত জানিয়ে মধুমতীর আলোতে লেখা তার কলামের কপি নিয়ে হাজির। সেটা শেখ মুজিবের হাতে দিয়ে বলে, লিডার, আপনার সঙ্গে রাজনীতি করতে চাই।
মুজিব কলামটা পড়তে পড়তে হাঁটেন। এরপর বলেন, হাতেম তো ভালোই লেখো দেখছি।
—আজ্ঞে, বাতেন।
—ও হ্যাঁ, বাতেন। কলিম ভাই, বাতেনকে যুবসংগঠনের দায়িত্ব দিতে পারেন।
কলিম চৌধুরী বলেন, বাতেন আমাদের সঙ্গে আইলে তো ভালোই হয়।
বাতেন আনন্দে আটখানা হয়ে জিন্নাহ কলেজ মাঠে জনসভার প্যান্ডেল সাজাতে চলে যায়।
শেখ মুজিবকে আপ্যায়নের জন্য কলিম চৌধুরীর বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সলিম খান ও তাঁর ছেলে রাশেদ খান অপেক্ষা করছিলেন।
শেখ মুজিব নিজেই সালাম দিয়ে বলেন, সলিম ভাই, আমরা তো আপনাদের সঙ্গে মুসলিম লীগের রাজনীতি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মুসলিম লীগ দখল করে নিল পাঞ্জাবের জমিদারেরা। আর তাদের আমলা ছেলেরা প্রবল অসহযোগিতা শুরু করল। আমাদের ভাগ্য! পূর্ববঙ্গের জমিদারি উচ্ছেদ করলাম। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের জমিদারি উচ্ছেদ করা গেল না।
সলিম খান বলেন, কিন্তু এইখানে প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগ আর কৃষক প্রজা পার্টির মাঝে যে দ্বন্দ্ব দেখছি, তাতে পশ্চিম পাকিস্তানের জমিদারপুত্র আমলারা সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে, গণতন্ত্র চলতেছে না—এরকম কথাকে জনপ্রিয় করার।
—মাঝে মাঝে ভাবি, আপনারা কিছু আসন বেশি পেয়ে শক্তিশালী বিরোধী দলে থাকলে আওয়ামী লীগ আর কৃষক প্রজা পার্টির ঐক্যটা ঠিকই থাকত। আমাদের মুশকিল হইল, প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে আমরা নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি।
খাবার পরিবেশিত হলে মুজিব তৃপ্তির সঙ্গে মাছ-ভাত খান। রাশেদ খান রুই মাছের একটা বড় টুকরা তাঁর পাতে তুলে দিতেই তিনি বলেন, ডাক্তার, লেফট পার্টি কইরা তো বেশি দূরে যাইতে পারবা না। আওয়ামী লীগে চইলা আসো। তোমাদের মতো শিক্ষিত ছেলেদের আমরা কেন্দ্রীয় সংসদে পাঠাতে চাই।
এ সময় রাশেদ খানের শিশু পুত্র এসে পড়লে শেখ মুজিব তাকে কোলে নিয়ে নেন। জিজ্ঞেস করেন, আপনার নাম কী, বড় ভাই!
পর্দার আড়াল থেকে সুলতানা বলে, নাঈম খান।
মুজিব সুলতানাকে ডেকে পকেট থেকে টাকা বের করে দিয়ে বলেন, ওকে খেলনা কিনে দিও। আর তোমার স্বামীকে বিদেশি মার্কস ছেড়ে একটু স্বদেশি ভাসানীকে বুঝতে বলো। ওকে আওয়ামী লীগে চাই। বোঝানোর দায়িত্ব তোমার!
জনসভা কানায় কানায় পূর্ণ। আওয়ামী লীগ ও কৃষক প্রজা পার্টির লোকেদের মাঝে কিছুটা হট্টগোল হতেই রাশেদ খান গিয়ে মীমাংসা করিয়ে দেয়।
চারণকবি রজব আলী মঞ্চের সামনে এসে তাঁর জনপ্রিয় কবিতা বলতে চেষ্টা করলে বাতেন তাঁর মুখ চেপে ধরে বলে, রজব ভাই, আজ আর ঝামেলা কইরো না।
প্রণব মুখার্জি কলেজের বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে রাগে গজগজ করতে করতে বলেন, তোমরা যতই সোহরাওয়ার্দী-মুজিব ঢুলাও, আমি তাদের ক্ষমা করতে পারব না।
কালিদাস ফিসফিস করে বলে, কৌটিল্য বলেছেন, শত্রুর শত্রু হচ্ছে বন্ধু। সেই হিসাবে মুসলিম লীগের বিরোধী পক্ষ আওয়ামী লীগ আমাদের বন্ধু।
বরুণ রায় প্রণব মুখার্জিকে উদ্দেশ করে বলে, পণ্ডিতমশাই, ঘোড়দৌড়ের মাঠে কোন ঘোড়াটা রেস জিতবে, তা বুঝতে পারা জরুরি।
চিত্তরঞ্জন খুশির খবর দেয়, আওয়ামী লীগের যুবসংগঠনে আমাদের বাতেন ঢুকে পড়েছে, পণ্ডিতমশাই। আপনি অস্থির হবেন না। আপনার সময় ফিরে ফিরে আসবে।
শেখ মুজিব মঞ্চে রাশেদ খানকে ডেকে পয়সারহাটের মানুষের সামনে তাদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। আর বাতেনকে ডেকে যুবসংগঠনের নতুন নেতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।
প্রণব মুখার্জি অর্ধেক শূন্য আর অর্ধেক ভরা গ্লাসের অনুভূতি নিয়ে সভাস্থল ত্যাগ করেন।
শেখ মুজিব সভা শেষ করে বিদায় নিলে, সেই সন্ধ্যাতেই কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রে পথিকৃৎ বাতেনের সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। সমবেত কণ্ঠে সংগীত পরিবেশিত হয়,
আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি
তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী!
ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে॥
রাশেদ খানের বাসায় শ্যামাপদ ও কল্পনা যায় জরুরি কথা বলতে। শ্যামাপদ বলে, এই বাতেন হচ্ছে পতিত জমিদারদের ট্রয়ের ঘোড়া। এর আগে সব সময় সোহরাওয়ার্দী-মুজিবের কড়া সমালোচক ছিল। পয়সারহাটে মুজিব আসছেন শুনেই সে তেলাঞ্জলি দিয়ে কলাম লিখে ফেলে মধুমতীর আলোতে। ব্যস, কেল্লা ফতে। এখন জমিদারবাড়িতে বাতেনের সংবর্ধনা হচ্ছে শুনেছি।
রাশেদ খান বলে, রাজনীতির পথ কখনোই ফুল বিছানো নয়। তাতে কাঁটা থাকে। কিন্তু পূর্ববঙ্গের মানুষের ওপর আস্থা রাখুন। মনে রাখবেন, ব্রিটিশরা যদি ভারতবর্ষ ছেড়ে না-ও যেত, পূর্ববঙ্গের মানুষ ঠিকই স্বাধীন হতো। কারও বশ্যতা স্বীকার আমাদের রক্তে নেই। আমরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি। আমরাই পাকিস্তান বানিয়েছি। ভাষা ও সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের জন্য পিণ্ডির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি। কাজেই এখানে দিল্লি কিংবা কলকাতার আগ্রাসনের স্বপ্ন চরম অবিমৃষ্যকারিতা।
কল্পনা হাসতে হাসতে বলে, বাবা তো দেখলাম, আপনাকে ভবিষ্যৎ নেতা ঘোষণা করায় অর্ধেক গ্লাস শূন্য দেখতে পাচ্ছেন, আর বাতেন যুবসংগঠনের নেতা হওয়াটাকে অর্ধেক গ্লাস পূর্ণ দেখতে পাচ্ছেন।
রাশেদ খান হো হো করে হেসে ওঠেন। শ্যামাপদ সেই হাসিতে যোগ দেয়। সুলতানা ট্রেতে করে নাশতা নিয়ে হাজির হয়। ভবিষ্যৎ নেতার সংবর্ধনা তো ঘরোয়া পরিবেশেও হতে পারে, নাকি!



পাঠকের মন্তব্য