দুই বাংলার কবি সম্মেলনে কলকাতার কবিরা একে একে দেশভাগের বেদনা নিয়ে কবিতা পাঠ করে। পূর্ববঙ্গ থেকে ভিটেমাটি ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি জমানো মানুষের ট্র্যাজেডি মূর্ত হয়ে ওঠে সেসব কবিতায়। পয়সারহাটের দধীচি কাব্য আন্দোলনের তরুণ কবিরাও তাদের কবিতায় পূর্ববঙ্গ ছেড়ে যাওয়া মানুষের শরণার্থী জীবনের বেদনা নিয়ে কবিতা পাঠ করে।
প্রণব মুখুজ্জে অনুষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে ইতিহাসের এই একদেশদর্শী বয়ানে বেশ খুশি হন। এইভাবে বাংলা সাহিত্য পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা থেকে পূর্ববঙ্গে আসা মানুষের ট্র্যাজেডিকে আড়াল করে ফেলতে পারলে; শতবর্ষ ধরে ইতিহাসের এক চোখে থাকবে অশ্রু আর আরেক অন্ধ চোখে পাথর লাগানো থাকবে। কবিতা, গল্প, গান, নাটক, চলচ্চিত্র, চিত্রকলায় একমুখী মেমোরি পলিটিকসের চর্চা প্রগতিশীলতার পূর্বশর্ত হয়ে দাঁড়াবে।
কবিতা সম্মেলন শেষে অতিথি কবিরা সেই যে হিন্দু পাড়ায় দুটি ঘর পোড়ানো হয়েছিল, তা পরিদর্শনে যায়। ইতিমধ্যে সেখানে নতুন ঘর উঠলেও একপাশে জড়ো করে রাখা পুড়ে যাওয়া চকি, কাপড়-চোপড়ের ছাই, অর্ধেক পুড়ে যাওয়া রামকৃষ্ণ পরমহংসের ছবি দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে কলকাতার কবিরা। নতুন ঘর তুলে জীবন আবার জীবনের গতিতে চলতে শুরু করেছে, যাদের, সেই হিন্দু পাড়ার সুকুমার জিজ্ঞেস করে, বাবু আপনারা কাঁদতেছেন কেন!
প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগের সাংসদ কলিম চৌধুরীর গৃহে নৈশভোজ আয়োজন করা হয় কলকাতার কবিদের সম্মানে। বাইশ রকম মাছের তরকারি, খাসির মাংস ভুনা, পোলাও, আট রকমের ভর্তা-ভাজি আর পাল মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের রসগোল্লা ও দই দিয়ে আপ্যায়ন। কলিম চৌধুরীর জামাই রাশেদ খান অতিথি সেবা করে। কলিম চৌধুরীর মেয়ে সুলতানা কয়েকবার এসে অতিথিদের জিজ্ঞেস করে, আর কিছু চাই কিনা!
অতিথি সেবায় মুগ্ধ হয়ে এক অতিথি কবি বলে, কবজি ডুবিয়ে খেলুম আজ, অনেকদিন জিভে স্বাদ লেগে থাকবে।
কলকাতার অতিথি কবিরা পয়সারহাট থেকে বিদায় নিলেও দধীচি কাব্য আন্দোলনের তরুণ কবিদের মাঝে তার রেশ থেকে যায়। চারণ কবি রজব আলী অতিথিদের প্রশংসা পেয়ে স্বভাব কবিতে পরিণত হয়। তাদের দেওয়া রেজব নামটি এত পছন্দ হয় যে, লোকজনকে ধরে ধরে বলতে থাকে, আমারে রেজব কইয়া ডাকবি। অধ্যক্ষ আজিজুল হক কলকাতার কবিদের সঙ্গে মেলামেশা করে, চোখ বুঁজলেই পদ্মশ্রী পুরস্কার গ্রহণের একটা দৃশ্য দেখতে শুরু করেন। আনন্দবাজারে লেখা ছাপা হবে, কলকাতা থেকে গ্রন্থ প্রকাশ হবে; এসব আশ্বাসে অধ্যক্ষ হকের আজকাল পয়সারহাটের লোকজনের সঙ্গে মিশতেই ইচ্ছা করে না।
বিদায়বেলায় ট্রেনের জানালা দিয়ে কলকাতার কবি সন্দ্বীপন বলেছিলেন, কিসের হিন্দু-মুসলমান বিভেদ; বাংলা ভাষাই আমাদের রাষ্ট্র আর রবীন্দ্রনাথ আমাদের রাষ্ট্রপ্রধান। উদ্ধৃতিটি সুন্দর হস্তাক্ষরে লিখে বাঁধিয়ে রাখা হয় প্রীতিলতা গ্রন্থাগারে।
পয়সারহাট বাজার, মধুমতী নদীর ঘাট, জলমহাল, বালুমহাল, রাস্তা ও কালভার্ট নির্মাণের নানাবিধ চাঁদা সংগ্রহ নিয়ে মুসলিম লীগ ও আওয়ামী লীগের বিবাদ উপস্থিত হয়। চাঁদার পরিমাণ বাড়িয়ে দুই দল ভাগ করে নেওয়ার একটি সমাধান সূত্র দেন কলিম চৌধুরী ও সলিম খান। প্রায় প্রতিদিনই লোকজনের সামনে কলিম চৌধুরী সলিম খান ও তার মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন। সলিম খানকেও কলিম চৌধুরী ও তার আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বেফাঁস কথা বলতে হয়। কিন্তু একসঙ্গে বসে পেতলের স্ট্যান্ডওয়ালা হুঁকোর পাইপ টানতে টানতে দাবা খেলতে তাদের কখনো ভুল হয় না। সুলতানার কোল আলো করে আসা শিশুটিকে দাদার কোল থেকে নানার কোল, আবার নানার কোল থেকে দাদার কোল করে যেন আগামী একশো বছরের ক্ষমতার হাতবদলের রূপক বিনির্মিত হতে থাকে।
ওদিকে আনন্দবাজার পত্রিকা ও আকাশবাণীতে গালে সুপারি পুরে গলা ভাঁজাতে থাকে পয়সারহাট থেকে ফিরে যাওয়া অতিথি কবিরা। পূর্ববঙ্গে নির্যাতিত হিন্দুদের শোকের পদাবলীতে সুর বসিয়ে সংগীত রচিত হয়। অধ্যক্ষ আজিজুল হক ও পথিকৃৎ বাতেন মধুমতীর আলোতে দিস্তা দিস্তা উপসম্পাদকীয় লিখতে থাকে।
রাশেদ খান পয়সারহাটে ডাক্তারি শুরু করার পর কালিদাসের চেম্বারে রোগী কমেছে। তবু যারা আসে, তাদের মধ্যে একটু সম্পন্ন হিন্দুদের সে বুদ্ধি দেয়, আমার আর চিত্তের তো কলকাতায় বাড়িঘর হয়ে গেছে। ভবিষ্যতের কথা ভেবে তোমরাও দেখো, বসিরহাটে একটা বাড়ি করে রাখতে পারো কিনা। বরিশালে দলিতদের ওপর পুলিশ গুলি চালিয়েছে; পাকিস্তান পাকিস্তান বলে জান লড়িয়ে দেওয়া যোগেন মণ্ডল দেখো, দলিতদের রক্ষায় কারও কোনো সহযোগিতা না পেয়ে কলকাতা চলে গেছে। ’৪৭-এর নেতা যোগেন যদি এইখানে টিকতে না পারে, তোমরা টিকবে কেমন করে!
শ্যামাপদ ও কল্পনা শহীদ মিনারের সামনে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সম্মেলন করে। রাশেদ খান সেখানে উপস্থিত থাকে। শ্যামাপদ সবার উদ্দেশ্যে বলে, মধুমতীর আলো, আনন্দবাজার, আকাশবাণী আপনাদের মধ্যে ভয়ভীতি ছড়াচ্ছে। পয়সারহাটের পতিত জমিদারের লোকেরা শুনেছি অনেককে ভারতে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে। এসবই হচ্ছে রাজনীতি। ওরা মানুষকে মোরগ-মুরগি মনে করে, তাই হিন্দুদের খোপে হিন্দুদের আর মুসলমানদের খোপে মুসলমানদের ভরতে চেষ্টা করছে। উস্কোখুশকো চুল, ময়লা জামা, কিন্তু হাত-পায়ের নখ পরিচ্ছন্ন কথিত পাগল—রহস্য উন্মোচিত হলে মন্দিরে প্রতিমা ভাঙা ও হিন্দুপাড়ায় আগুনের রহস্য উন্মোচিত হবে। তাই চোখ-কান খোলা রেখে চলবেন। কারও উস্কানিতে কিংবা ফুসলানিতে নিজেদের মধ্যে বিভেদ আনবেন না।
এই সম্প্রীতি সম্মেলনের খবর পেয়ে মন্দিরের পাশে বটতলায় দধীচি কাব্য আন্দোলনের কবিরা মুখ টিপে হাসে। পরিচয় গুপ্ত ওরফে মোখলেছ বলে, যেইখানেই দেখি রাশেদ খান, সেইখানেই কল্পনা। ইনুর সঙ্গে তিনুর কিসের সম্পর্ক! চারণ কবি রজব আলী কবিতা বলে, ছি ছি ছি রাশেদ খান, কল্পনার জানের জান!
কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রে গুঞ্জনে গুঞ্জনে সাংস্কৃতিক বিপ্লব সাধিত হয়। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিতে পাতকূয়ার কানাকানির যে অবদান; কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্র সেই বিমূর্ত পাতকূয়ার মূর্ত ফিসফিসানি, হাসহাসানি, খসখসানির সংস্কৃতি চর্চা করে বিকেল-সন্ধ্যা কাটায়।



পাঠকের মন্তব্য