পয়সারহাটের শিল্পী ফটোস্টুডিওটি রাতের আঁধারে গুঁড়িয়ে দেয় একপাল লোক। শিল্পী ফটোস্টুডিওর মালিক মুক্তাদির তার অনেক স্বপ্নের স্টুডিওটি এভাবে শেষ হয়ে যেতে দেখে বলে, মুসলিম লীগের পাণ্ডা এরা। চাঁদাকুড়ার দল।
সলিম খান ভীষণ ক্ষোভ প্রকাশ করে, মুক্তাদির মুসলিম লীগের নামের সঙ্গে চাঁদাকুড়া যুক্ত করে দিয়ে মানহানি করেছে।
মুসলিম লীগের লোকেরা তখন পয়সারহাটে ঘুরে ঘুরে মুক্তাদিরের দুঃশ্চরিত্র সার্টিফিকেট বিলিয়ে বেড়াতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া চশমা পরা ছাত্র তফাজ্জল ভাজা মাছ উলটে খেতে পারবে না এমন অভিব্যক্তি দিয়ে বলে, ব্রিটিশ সাহেবদের কুঠিবাড়িতে গিয়ে মুক্তাদির মেম সাহেবদের ফটো তুলেছে। সে ব্রিটিশের পক্ষে কৃষক প্রজা আন্দোলন বন্ধ করার জন্য কাজ করছিল। আমি তার চাক্ষুষ সাক্ষী।
মন্দিরের পাশে বটবৃক্ষের তলায় পথিকৃত বাতেন বলে, অপরচুনিস্ট কুনহানকার। মুক্তাদির জমিদার বাড়িতে দঙ্গল দেইখা বলেছিল, এইটা জমিদার বাবুর কর্মফল। এখন মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙা দেইখা আমি বলতেছি, মুক্তাদিরের কর্মফল; কেন সে জমিদার বাড়ির দঙ্গলবাজিরে সাপোর্ট দিলো।
মধুমতীর আলোর রিপোর্টে অবশ্য মুসলিম লীগের ইব্রাহিম ও মামুন গংয়ের নাম বেরিয়ে আসে; যারা মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙার পরিকল্পনা করেছিল ঠিকাদার বিকাশের সঙ্গে বসে। বোঝা গেল, মুক্তাদিরের স্টুডিও যে জমিতে, ওটা নিয়ে দুই পক্ষের ঝামেলা চলছে। জমিদারি উচ্ছেদের পর জমির মালিক হয়েছে জমিদারের প্রজারা। এখন সেই জমি নিয়ে কচলাকচলি না করলে চলবে কেমন করে! সবার সামনে একটাই লক্ষ্য, কত তাড়াতাড়ি লোকের জমাজমি দখল করে ধনঞ্জয় বাবুর মতো চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদার সেজে বসা যায়।
পাল মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের অসিত পাল বলে, মুক্তাদির তার ছবি তোলা নিয়া থাকে একপাশে। ব্রিটিশ খেদাও, জমিদার খেদাও মিছিলে সাহস কইরা নামছিল সে। যারা তখন শ্যাম রাখি না কুল রাখি আর তবে-কিন্তু করছিল, রাস্তায় নামার সাহস ছিল না; সেই বেদের মাইয়া জ্যোতস্নাও চিংড়ির মতো ভ্রু নাচাইয়া মুক্তাদিররে ব্রিটিশের দালাল বইলা কলঙ্ক দিতেছে। ঘোর কলিকাল, শেয়ালে চাটে হরিণের গাল।
পয়সারহাটে শতবর্ষ ধরে জমিদারের পদচুম্বনের যে অভ্যাস গড়ে উঠেছে, ওটাই এখন মুসলিম লীগের পদচুম্বনে এসে ঠেকেছে। এই পদচুম্বন আরও শতবর্ষ ধরে চলবে।
ধনঞ্জয় সাহার ছেলে বরুণ সাহা কলকাতা থেকে ফিরেই এপার বাংলা ও ওপার বাংলার কবি সম্মেলনের ডাক দেয়। ভোরের ট্রেনে কলকাতা থেকে কয়েকজন কবি এসে পয়সারহাট রেলস্টেশনে নামে। তাদেরকে ফুলমাল্যে বরণ করে বরুণ সাহা, কালিদাস, চিত্তরঞ্জন, যূথিকা, অধ্যক্ষ আজিজুল হক আর বটতলার নবীন বুদ্ধিজীবীরা। অধ্যক্ষ হক কলকাতার কবিদের সঙ্গে নবীন বুদ্ধিজীবীদের ‘দধীচি কাব্য আন্দোলনে’র নবীন কবিদল বলে পরিচয় করিয়ে দেন।
কলকাতার কবিদল স্টেশনের পাশে সতীশ হিন্দু হোটেলে প্রাতঃরাশ সম্পন্ন করেন। তারা এত বিনয়ী ও সুমিষ্টভাষী যে পয়সারহাটের দধীচি কাব্য আন্দোলনের তরুণেরা বিস্মিত হয়ে যায়। অধ্যক্ষ আজিজুল হককে তারা জিজ্ঞেস করে, ঈশ্বর নিশ্চয়ই নিজের আলো দিয়া সৃজন করেছেন এই মহৎ ব্যক্তিদের।
অধ্যক্ষ উত্তর দেন, এ আসলে বেঙ্গল রেনেসাঁর আলো। ঐ আলো তোমাদের হৃদয়ে প্রবেশ করলে তোমরাও অমন পেলব হয়ে পড়বে।
কবিদল এবার জমিদার বাড়ির দিকে রওনা হয়। সেখানে তাদের স্বাগত জানাতে পণ্ডিত প্রণব মুখুজ্জে এসে পড়েছেন। তিনি সবাইকে জমিদার বাবুর শয্যাপাশে নিয়ে যান। সবাই নমস্কার জানিয়ে দাঁড়ালে জমিদার বাবু নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকেন।
জমিদার গিন্নী আশালতা দেবী এসে সবাইকে বলেন, আপনাদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কেশব আপনাদের ঘরগুলো দেখিয়ে দেবে।
বিকেলে ধনঞ্জয় বিদ্যালয়ের মাঠে প্যান্ডেল ও স্টেজ বানিয়ে কবিতা পাঠের আসর শুরু হয়। ব্যানারে লেখা, দুই বাংলার কবি সম্মেলন, তার নিচে লেখাঃ দেশভাগের বেদনার পংক্তিমালা। আয়োজনেঃ নিখিল বঙ্গ কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্র।
সূচনা বক্তব্যে বরুণ সাহা বলে, ব্রিটিশ কেরানির কলমের খোঁচায় বাংলার হৃদপিণ্ড এফোঁড়-ওফোঁড় করে অলিন্দ-নিলয় আলাদা হয়েছে। কিন্তু অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি-চেতনার বর্ণমালার একই আকাশ আমাদের সবার মাথার ওপর। একই আকাশ, একই বাতাস, একই নদীর সুধা পান করে আমরা সবাই বাঙালি। বিজাতীয় ভাষাভাষী ঔপনিবেশিক শক্তির হত্যাযজ্ঞে নিহত ভাষাশহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে আমরা এখন এক মিনিট নীরবতা পালন করব।
নীরবতা পালন শেষ না হতেই চারণ কবি রজব আলী দর্শকের সারি থেকে চেঁচিয়ে ওঠে, ছি ছি ছি, ঘিন্না, হুইস্কিপায়ী জিন্না।
রজব আলীকে শান্ত করতে তাকে স্টেজে ডাকা হয়। কলকাতার এক কবি ঠোঁটে প্রশ্রয়ের হাসি ঝুলিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, রেজব, অমন কথা বলতে নেই। ভেতরের শক্তিটুকু জমা রাখুন ভাই। আরও অনেকটা পথ যেতে হবে।



পাঠকের মন্তব্য