কলিম চৌধুরীর জামাই ও সলিম খানের ছেলে হিসেবে রাশেদ খান পয়সারহাটে বেশ প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। ডাক্তার হিসেবেও তার নাম-যশ হয়। দরিদ্র রোগীদের বিনা পয়সায় স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কারণে তার নাম বোয়ালমারী, চিতলমারী ও আলফাডাঙ্গায় ছড়িয়ে পড়ে।
চিত্তরঞ্জন প্রেমে ব্যর্থ হয়ে নীল কমল মহলে যূথিকার নাচঘরে জীবন সমর্পণ করে। পণ্ডিত প্রণব মুখুজ্জে খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি কলকাতায় ধনঞ্জয় সাহার ছেলে বরুণ সাহার কাছে চিঠিতে জানান, চিত্ত প্রেমে ব্যর্থ হইয়া দেবদাস হইয়া উঠিয়াছে। ফলে কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রের বাতি নিভু নিভু। আমার নিজ কন্যা কল্পনা এই কেন্দ্র ছাড়িয়া পূর্ববঙ্গের নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চা করিতেছে। তুমি একবার আইসো। জমিদার বাবুর বাতিও প্রায় নিভু নিভু। আমি যেন সখাত সলিলে পড়িয়া আছি।
রাশেদ খানের পৃষ্ঠপোষকতায় শ্যামাপদ ও কল্পনা তাদের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। জিন্নাহ কলেজ মাঠে বড় প্যান্ডেল ও স্টেজ বানিয়ে সাত দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা চলতে থাকে। অধ্যক্ষ আজিজুল হকের আপত্তি থাকলেও চৌধুরী ও খানের দিকে তাকিয়ে নাকে রুমাল চেপে এসব ছোটলোকের সংস্কৃতি চর্চা মেনে নিতে হয়। রংপুর থেকে ভাওয়াইয়া গানের শিল্পী আসে। ফরিদপুর থেকে ভাটিয়ালি গানের শিল্পী আসে। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া থেকে আসে লালনশিল্পী। সুদূর সিলেট থেকে আসে হাসন রাজার গানের শিল্পী। স্থানীয় শিল্পীরা জারি-সারি-মুর্শিদি-মারফতী পরিবেশন করে। পাবনা থেকে কীর্তন ও উচ্চাঙ্গসংগীত শিল্পীরা আসে। পুরান ঢাকা থেকে আসে কাওয়ালি ও গজল শিল্পীরা। সব মিলিয়ে ভরপুর এক আয়োজন।
মধুমতীর আলোতে কলামিস্ট বাতেন বিস্ময় প্রকাশ করে, এ কি তবে রবীন্দ্রনাথকে নিশ্চিহ্ন করিবার ষড়যন্ত্র। আজিজুল হক সমালোচনা করে, সংস্কৃতির সমন্বয়ী রূপ চোখে পড়িল না। চোখে পড়িল প্রবল মুসলমানিকরণ। রবীন্দ্রনাথ অনুপস্থিত, আর নজরুলকে যেন উহারা দ্বিতীয়বার মুরতাদ ঘোষণা করিল।
কল্পনা প্রতিবাদলিপি পাঠায়, এই সাংস্কৃতিক আয়োজনের শুরুতে রবীন্দ্রসংগীত সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হয়েছে,
সঙ্কোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান।
সঙ্কটের কল্পনাতে হইও না ম্রিয়মাণ।
অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে নজরুলের গান দিয়ে,
অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে
প্রদীপ-শিখা সম কাঁপিছে প্রাণ মম
তোমারে, সুন্দর, বন্দিতে!
সঙ্গীতে সঙ্গীতে।
কিন্তু কে আর তখন কল্পনার প্রতিবাদলিপির অপেক্ষায়। মন্দিরের পাশে বটবৃক্ষের নিচে পথিকৃত বাতেন, আকাশ ওরফে আক্কাছ, অনিন্দ ওরফে আনিছুর, পরিচয় গুপ্ত ওরফে মকলেছ ইত্যাদি, যারা কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রে বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ পাঠচক্রে বিশুদ্ধ বাঙালি হয়ে উঠেছে; তারা রাশেদ খানকে বামাতি, শ্যামাপদ ও কল্পনাকে পিণ্ডির পেমেন্ট পাইছে ইত্যাদি বিশেষণে জর্জরিত করে। চারণ কবি রজব আলী এসে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলে ওঠে, ছি ছি ঘিন্না, মোহাম্মদ আলী জিন্না। অমনি বটবৃক্ষের নিচে আনন্দে হুটোপুটি খেতে থাকে কৃষক-মজুরের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিত ছেলেরা।
চিত্তরঞ্জন দেবদাস হয়ে পড়ার পর থেকে কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রের বাতি নিভু নিভু হলেও মন্দিরের পাশে বটবৃক্ষের নিচে বঙ্কিম পাঠচক্রের ছেলেরা শতবর্ষ ধরে ভদ্রলোকের সংস্কৃতি চর্চার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। সংস্কৃতি সপ্তাহে কাওয়ালি পরিবেশিত হওয়ায় ছ্যা ছ্যা পড়ে যায় বটবৃক্ষের শাখা-প্রশাখা ও শেকড়-বাকড়ে।
বরুণ সাহা পয়সারহাটে ফিরেছে এমন খবর ছড়িয়ে পড়তেই মধুমতীর আলোর সম্পাদক মুকুল শর্মা তার ক্যামেরা নিয়ে চলে যায়। গিয়ে দেখে, ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বাড়ির পলেস্তারা খসে-পড়া পিলারের নিচে বসে হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদছে বরুণ সাহা। দেশভাগের শোক বুকে নিয়ে অশোক হলেন বরুণ সাহা ক্যাপশন দিয়ে ছবি এসে পড়ল মধুমতীর আলো ও আনন্দবাজারে। টেলিগ্রাফ পত্রিকা লস্ট হাভেলিজ ক্যাপশন দিয়ে ছবিটা পুনর্মুদ্রণ করে; বরুণের একটা এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারের অনুরোধ পৌঁছে দেয় আনন্দবাজার ডেস্কে।
মওলানা আব্বাস শাহ মসজিদে ইমাম সাহেবের খুতবা থামিয়ে দিয়ে আবার এক জ্বালাময়ী ভাষণ দেয়, জিন্নাহ কলেজে যে গান-বাজনার বেলেল্লাপনা দেখলাম সপ্তাহব্যাপী; এসব বেহরশরিয়তি কায়কারবার তো ব্রিটিশ আমলে দেখি নাই। আমরা তো আগেই ভালো ছিলাম। হাজেরানে মজলিশ, আপনারা হোঁশিয়ার হন, ইসলাম খাতরে মে হ্যায়!



পাঠকের মন্তব্য