খ্রিস্টোফার নোলানের ‘ওডিসি’ চলচ্চিত্রের ওডিসিউয়াসের ট্রয় যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফেরার সংগ্রামশীলতার মতোই ‘আমি শেখ মুজিবের মেয়ে’ চলচ্চিত্রে হাসিনার টুঙ্গিপাড়ায় ফেরার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাজড়িত এক নান্দনিক উপাখ্যান। এই চলচ্চিত্রে জুলাই অভ্যুত্থানে বিমানে করে ভারতে উড়ে যাওয়ার পর দিল্লির নয়নাভিরাম দৃশ্যাবলীর ড্রোন ক্যামেরায় চিত্রায়ন প্রথমেই ধন্দে ফেলে দেয়; এটা কি ইন্ডিয়ার পর্যটন বিভাগের কোনো প্রামাণ্যচিত্র!
পরে মাঝখানে বাংলাদেশের পতাকার দু’পাশে রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গবন্ধুর ছবির সামনে হাসিনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সম্বিত ফিরে পাই। এরপর টেবিলে বসে কবিতা লিখতে থাকেন হাসিনা। টেবিলে একটি ভারতীয় পতাকা দেখে দর্শক বুঝতে পারে; উনি এখন ভারতে।
বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করেন; ঘুম ভেঙে উঠে হেঁটে গিয়ে পাশের ঘরের চেয়ারে বসেন; নীরবতার কাছে সমর্পিত বেশ কিছুটা সময় কাটে। এরপর ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’ গানটি বাজতে শুরু করলে টুঙ্গিপাড়ার স্মৃতি পড়িমরি করে আসে।
সুইডিশ চলচ্চিত্রকার বার্গম্যানের ‘অটামন সোনাটা’র মতো বিষাদের সুর ছেয়ে থাকে ‘আমি শেখ মুজিবের মেয়ে’ চলচ্চিত্রজুড়ে।
ভারতে পড়তে যাওয়া ফরিদপুরের দুটি ছেলে-মেয়ে ‘আগেই ভালো ছিলাম’ অভিব্যক্তির আলো নিয়ে হাজির হয়। ফলে এতক্ষণকার বিষাদতাড়িত হাসিনা সেই প্রশ্ন নয়, প্রশংসা করতে এসেছি আসরের মৌতাত খুঁজে পান। জুলাই বিপ্লব-টিপ্লব কিছু নয়; সবই ইউনূসের ষড়যন্ত্র; বিএনপি-জামায়াতের কর্মীদের তৈরি বিশৃঙ্খলা। আর আমেরিকাকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ঘাঁটি না দেওয়ায়; তাদের কাছ থেকে অস্ত্র না কেনায়; এই বিপত্তি।
হাসিনা প্রশ্ন করেন, অস্ত্র কিনব কেন! আমাদের শত্রু কে! সত্যিই তো, জীবনে আপদে-বিপদে যে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি; সেই আত্মীয় তো আর শত্রু হতে পারে না।
আইজেনস্টাইনের প্রোপাগান্ডা চলচ্চিত্রের মতো ‘আমি শেখ মুজিবের মেয়ে’ চলচ্চিত্রটি আলো আসবেই গ্রুপের ফেসবুক-ইউটিউব ও টকশোর তথ্য সন্নিবেশ করে ‘যন্ত্র ঐ একটাই ষড়যন্ত্র’-এর কথা গড়গড় করে বলিয়ে নেয় হাসিনার মুখে। গোটা পৃথিবীর দোষ, হাসিনা নির্দোষ; এই দর্শন-কল্পনার সমর্থন দিতে সিআরআই-এর হোয়াইট বোর্ড থেকে সরবরাহ করা জিডিপি গ্রোথ, দারিদ্র্য দূরীকরণ ইত্যাদি সংখ্যার পরী ডানা মেলে এলে; দার্শনিক এম এ মোমেনের বেহেশত-কল্পনার স্বাদ একটু একটু করে পাওয়া যায়। বিটিভির ‘উন্নয়নে বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানের ফুটেজ, পদ্মা সেতু, এক্সপ্রেস হাইওয়ে; এমনকি ফরিদপুরের ‘ভাঙ্গা’র সুদৃশ্য সেতু দেখলে দর্শকের মনের মধ্যে সুরের অনুরণন চলে, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না তো তুমি।
জামায়াতকে গালি দিতে শুরু করার আগের দৃশ্যে হাসিনা একটু নামাজ পড়ে নেন। এরপর বিজেপির আশ্রয়ে থেকে জামায়াতকে গালি দেওয়া তসলিমা নাসরিনেরই যেন আরেকটি সংস্করণ হয়ে ওঠেন হাসিনা। চলচ্চিত্রটি নির্মিত ও প্রথম প্রদর্শনী হয়েছে বেঙ্গল রেনেসাঁর পীঠস্থান কলকাতায়।
শেখ হাসিনা এরপর পাকিস্তানকে গালি দিলে তার হাজার বছরের শাপশাপান্তের বৃত্ত পূর্ণ হয়।
কত না বিচিত্র তথ্য থাকে ঠাকুরমার ঝুলিতে। ১৯৯১ সালেও হাসিনা সরকার গঠন করতে পারতেন। নেহাত কোয়ালিশন করতে হবে বলে তিনি খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হতে দিয়েছেন। এই রূপকথা ত্যাগী হাসিনার মহানুভবতা ফুটিয়ে তুলেছে।
এই চলচ্চিত্রে হাসিনা ও রেহানা সারাক্ষণ সোফায় বসে গদি মিডিয়া দেখতে থাকেন। ফলে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যে সন্নিবেশিত বেশিরভাগ তথ্যই যে গদি মিডিয়া থেকে আহরণ করা; এটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
টুঙ্গিপাড়ায় শৈশবের দৃশ্যগুলোতে ইতালীয় নিওরিয়ালিজমের স্পর্শ থাকলেও জার্মান এক্সপ্রেশনিজমের চলচ্চিত্র ‘দ্য ক্যাবিনেট অব ড. ক্যালিগারি’ ‘আমি শেখ মুজিবের মেয়ে’ চলচ্চিত্রকে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে বলে মনে হয়।
ফ্যান্টাসি, প্রোপাগান্ডা, ব্লাফ, ডিনায়াল, ভেনজেন্স, পারসিকিউশন কমপ্লেক্স আর ব্লাডথার্স্টের সমন্বয়ে নতুন সেভেন ডেডলি সিনসের সংজ্ঞা তৈরি করেছে এই চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রটিকে কোনোভাবে অস্কারের আসরে পৌঁছে দেওয়া গেলে এর অপরূপ নির্মাণশৈলী চলচ্চিত্র জুরি ও ক্রিটিকদের মন জয় করবে বলে ধারণা করি।



পাঠকের মন্তব্য