এক গ্রামে একটি লোক বাস করত। তার নাম রফিক। সে কোনো জিনিসকে তুচ্ছ মনে করত না। যা তার চোখে পড়ত, সব গুছিয়ে রাখত। রাস্তায় একটা কাচের টুকরো বা লোহার টুকরো বা অন্য কোনো জিনিস পড়ে থাকতে দেখলে সে যত্নের সঙ্গে তুলে পকেটে রাখত।
একদিন সে এক বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গেল। তার বন্ধু সেদিন শহর থেকে ফিরেছে। শহরে সে কী করে টাকা রোজগার করেছে, সেই গল্প সে রফিককে শোনাল। রফিক বন্ধুর গল্প শুনে মনে করল, সেও শহরে গিয়ে টাকা রোজগার করবে। রফিক এটা-ওটা ফেরি করে, তাতে তার সংসার চলে না।
সে একদিন শহরের দিকে রওনা হলো। তার পয়সা নেই বলে কিছু চিড়া-মুড়ি বেঁধে নিয়ে হেঁটেই চলল শহরে।
যেতে যেতে এক জায়গায় তার পায়ে যেন কী লাগল। সে নিচু হয়ে দেখল, দুটো পেরেক পড়ে আছে। অভ্যাসমতো পেরেক দুটোকে যত্নের সঙ্গে তুলে পকেটে রাখল।
সন্ধ্যাবেলায় সে একটা জঙ্গলের ধার দিয়ে যাচ্ছিল। তখন সে দেখল, তার পেছন দিকে একটা ছেলে সাইকেলে চড়ে ছুটে যাচ্ছে আর পেছনে দুটো লোক আসছে একটা বেবি ট্যাক্সিতে।
এমন তো কত লোকই যায়। রফিক ভাবল। পয়সা থাকলে লোকে কত রকমের গাড়ি চালায়। রফিকের পয়সা নেই, তাই হেঁটে যাচ্ছে। আরও কিছুদূর যেতে রফিক দেখল, একটা ঘোড়ার গাড়ি কাত হয়ে পড়ে আছে।
রফিক গিয়ে ঘোড়ার গাড়ির চালককে জিজ্ঞেস করল, “আপনার কী হয়েছে?”
কোচোয়ান বলল, “গাড়ির চাকার পেরেক খুলে গেছে।”
রফিক তখন পকেট থেকে সেই পেরেক দুটো বের করে বলল, “এই দুটো পেরেক আমার কাছে আছে। এতে হবে?”
কোচোয়ান লাফিয়ে উঠে বলল, “খুব হবে।”
তারা দুজনে মিলে পেরেক দুটো দিয়ে গাড়ি ঠিক করে ফেলল। কোচোয়ান বলল, “ভাই, তুমি আমার এত উপকার করলে, তোমাকে কী দেব? এই দুটো টাকা নাও।”
রফিক বলল, “না, না, আমি টাকা নেব না।”
কোচোয়ান বলল, “তাহলে কী দেব তোমাকে? আমি শহরে গেলে তোমাকে নিয়ে যেতাম। আমি তো যাচ্ছি উল্টো দিকে।”
রফিক বলল, “না, আমাকে কিছুই দিতে হবে না।”
কোচোয়ানের গাড়িতে এক ছড়া কলা আর অনেকগুলো পেয়ারা ছিল। আপত্তি করলেও সে রফিককে সেগুলো দিয়ে দিল।
রফিক আবার সামনের দিকে এগোতে লাগল। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। এমন সময় রফিক জঙ্গলের মধ্যে থেকে বাচ্চার কান্না শুনতে পেল। সে মনে করল, কোনো বাচ্চা বোধহয় হারিয়ে গেছে।
সে চিৎকার করে বলল, “কে কাঁদে ওখানে?”
তার গলা শুনে একটা মেয়েলোক দুটো ছেলেমেয়ে নিয়ে বেরিয়ে এল।
রফিক জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে আপনাদের?”
মেয়েটি বলল, “সকালে বেবি ট্যাক্সিতে করে বাড়ি যাচ্ছিলাম। দুটো লোক এসে বেবি ট্যাক্সি থামিয়ে আমাদের নামিয়ে দিল। আমাদের কাছে যা ছিল, সব কেড়ে নিল। আমরা ভয়ে জঙ্গলের মধ্যে পালিয়েছিলাম। সন্ধ্যা হয়ে গেল, এখন কী করে বাড়ি যাব ভেবে পাচ্ছি না। ছেলেমেয়ে দুটো ক্ষিধেয় কাঁদছে।”
রফিক তাদের কলা খেতে দিল। ছেলেমেয়ে দুটো আর তাদের মা পেট ভরে কলা আর পেয়ারা খেল।
তাদের বাড়ি বেশি দূরে ছিল না। মেয়েটির স্বামী ব্যবসা করে। তাদের বাড়িতে কান্নাকাটি পড়ে গেছে।
হারানো বউ ও ছেলেমেয়েকে ফিরে পেয়ে ব্যবসায়ী খুব খুশি। সে রফিককে দু-তিনটা টাকা দিতে গেল।
রফিক বলল, “না, আমি টাকা নেব না।”
ব্যবসায়ী জিজ্ঞেস করল, “কিছু নেবে না?”
রফিক বলল, “না।”
“তবে তোমার ঠিকানাটা রেখে যাও।”
ঠিকানা দিয়ে আবার রফিক চলতে শুরু করল।
কিছু দূর যেতেই দেখে, সাইকেলে চড়ে যে ছেলেটিকে সে যেতে দেখেছিল, সে রাস্তার ধারে পড়ে কাতরাচ্ছে।
রফিক তাড়াতাড়ি ছেলেটিকে ধরে তুলে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে তোমার? কে মেরেছে?”
ছেলেটি বলল, “দুটো লোক এসে আমার সাইকেল, ঘড়ি, টাকাপয়সা সব কেড়ে নিয়েছে। আমি দিতে চাচ্ছিলাম না বলে আমাকে মেরেছে। আমি শহরের কাছাকাছি থাকি। আমি এখন কী করে বাড়ি যাব?”
রফিক তাকে বলল, “আমাকে ধরে ধরে চলো, আমি তোমাকে পৌঁছে দেব।”
রফিককে ধরে ধরে ছেলেটি চলতে লাগল।
সেখান থেকে শহর মাইলখানেক দূরে। রফিক ছেলেটাকে বাড়ি পৌঁছে দিল।
ছেলেটা খুব ধনী পরিবারের সন্তান। তার আব্বা রফিককে অনেক টাকা দিতে চাইলেন, কিন্তু রফিক নিল না।
ছেলেটার আব্বা বললেন, “তুমি টাকা রোজগারের জন্য শহরে থেকো না। তুমি এত ভালো মানুষ, শহরের লোক তোমাকে ঠকাবে। তুমি গ্রামে যাও, সেখানে তুমি কাজ করো।”
পরদিন নিজের গ্রামে ফিরে রফিক অবাক।
ব্যবসায়ী ভদ্রলোক, ঘোড়ার গাড়িওয়ালা সবাই তার বাড়িতে বসে আছেন। তারা অনেক জিনিস এনেছেন, কিন্তু রফিকের বউ কিছুই নেবে না। তার এক কথা, “না সাহেব, আমরা গরিব মানুষ। আমরা এসব দামি জিনিস দিয়ে কী করব?”
তখন সবাই মিলে টাকা দিয়ে রফিককে পাঁচ বিঘা জমি কিনে দিলেন।
তারা বললেন, “রফিক, এই জমির দাম তুমি মাসে মাসে শোধ করো।”
এই পাঁচ বিঘা জমিতে ধান ফলিয়ে রফিক জমির ধার শোধ করেছে। আরও জমি কিনেছে।
রফিক এখন আর আগের মতো গরিব নেই। ব্যবসায়ী, বড়লোক এবং ঘোড়ার গাড়িওয়ালা সবাই এখন তার বন্ধু।



পাঠকের মন্তব্য