ফরাসিরা বলিয়া থাকেন, Appetite comes with eating—খাইতে খাইতেই ক্ষুধা বাড়ে! কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের যে খাদ্যের হালচাল, তাতে এই থিওরি লইয়া চলিলে ক্ষুধা বাড়িবার আগেই খাদকটি পটল তুলিয়া বসিবে! শুধু তাতেই ক্ষান্ত দিবে না, বরং ভূত হইয়া গজাইয়াও উঠিবে!
খাদ্য দিবস আসিলে পৃথিবীর মহাপণ্ডিতেরা বেশ চিন্তিত মুখে ব্যালান্সড ডায়েট, শস্যের ফলন আর গ্লোবাল ওয়ার্মিং লইয়া বড় বড় মিটিং ডাকিয়া থাকেন। কাজের কাজ তাতে কেমন কী হয়, তাহা আমরা আমজনতা জানিতে পাই না, পাইবার কথাও নয়। তবে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টের কোনো রেস্তোরাঁয় বসিয়া যে পেটমোটা পণ্ডিত প্রোটিন আর কার্বোহাইড্রেটের হিসাব কষিতেছেন, তিনি হয়তো জানেনই না, বাঙালির খাদ্য দিবসের আসল মাহাত্ম্য লুকাইয়া আছে তাঁহার পকেটের ব্যাপ্তি এবং বাজারের থলের আকারের ওপর!
আমাদের এই শ্যামল বাংলায় খাদ্য দিবসের চেয়েও বড় সত্য হইল ‘খাদ্যের দামের দিবস’। প্রতিদিন সকালে বাজারে গিয়া যখন মাছের কানকো উল্টানো হয়, তখন কেবল মাছের চোখ নয়, ক্রেতার চোখও ছানাবড়া হইয়া যায়! রুই মাছের দর শুনিয়া মনে হয়, মাছটি বোধহয় সাঁতার দিয়া সোজা সুইজারল্যান্ড হইতে আসিয়াছে! আর ইলিশ? ইলিশ তো এখন আর জলের রানী নয়, বরং একেবারে রাজসিংহাসনে বসিয়া রাজত্ব পরিচালনা করিবার ক্ষমতা হইয়াছে তাহার। সাধারণ মানুষ তাহার দিকে দূর হইতে হাতজোড় করিয়া প্রণাম জানায়।
পণ্ডিতেরা বলেন, ‘খাদ্যে পুষ্টি চাই।’ কিন্তু বাজারে গিয়া যখন পোয়াটাক কাঁচা মরিচ কিংবা ডজনখানেক ডিমের দাম শুনিবেন, তখন আপনার শরীরের সমস্ত পুষ্টি নিমেষেই উড়িয়া গিয়া কেবল ‘দুশ্চিন্তা’ নামক ভিটামিনটি অবশিষ্ট থাকিবে।
মনে পড়িল আমার কায়রোর সেই পুরোনো বন্ধু শেখ হুসাইনের কথা। হুসাইন একবার মিশরের এক কিঞ্জল (অনাহারী) দরবেশকে বলিয়াছিল, ‘বাবা, পুষ্টিকর খাদ্য খাইয়া পরমাত্মাকে স্মরণ করো।’ দরবেশ আলখাল্লার ভিতর হইতে একখণ্ড শুকনো রুটি বাহির করিয়া বলিয়াছিল, ‘বেটা, এই রুটিখানি পেটে না গেলে পরমাত্মা তো দূরের কথা, নিজের আত্মাই যে শরীরে থাকিবে, তাহার গ্যারান্টি কে দিবে?’
আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থাও ঠিক সেই দরবেশের মতো। পুষ্টির চিন্তা রহিল, আগে তো পেটে কিছু ফেলা চাই! কিন্তু বাজারে ঢোকা মানেই তো একেবারে স্পেনের ‘বুল ফাইটিং’-এর ময়দানে নামা! পকেটের টাকা আর বাজারের থলের মধ্যে এখন ঘোর শত্রুতা!
তাছাড়া এখন খাদ্য মানেই তো আর কেবল ভাত-ডাল নয়। এই যুগে খাদ্যতালিকায় যুক্ত হইয়াছে ‘অ্যাভোকাডো’ বা ‘চিয়া সিড’। শহরের বাবুমানুষেরা সকালবেলা বাটিতে ছাইপাঁশ ভিজাইয়া খাইতে খাইতে বলেন, ‘ইহা শরীরের জন্য বড়ই উপকারী।’ অথচ তাঁহাদের দাদামশাইরা এক থালা পান্তাভাত আর চারটা কাঁচা লঙ্কা পেটস্থ করিয়া আশি বছর বয়সেও লাঠি ছাড়া হাঁটিতেন! আজ সেই পান্তাভাতও পাঁচতারা হোটেলে ‘ফার্মেন্টেড রাইস’ নামে বিক্রি হইতেছে। তাহার দাম শুনিলে ভিরমি লাগিতে বাধ্য!
একদিন আমার এক বাল্যবন্ধু, নাম তাহার হরিপদ (অত্যন্ত বুদ্ধিমান লোক, কারণ তিনি বিবাহ করেন নাই!), আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘মুজতবা, আজকাল ডাক্তারেরা বলে, ব্যালান্সড ডায়েট খাইতে। উহার অর্থ জানো?’
আমি বলিলাম, ‘সংস্কৃত “তুলানল” আর জার্মান “ব্যালান্স” মিলাইয়া-মিশাইয়া কিছু একটা হইবে হয়তো?’
হরিপদ হাঁ হাঁ করিয়া উঠিলেন, ‘মোটেই না! ব্যালান্সড ডায়েটের আসল অর্থ হইল, পকেটে কত “ব্যালান্স” আছে, তাহা হিসাব করিয়া ডায়েট নির্ধারণ করা! ব্যালান্স কম তো পেটে টান!’
ইহা মিথ্যা নয়। ডালের দাম শুনিয়া অড়হর ডাল এখন ‘অর্কিড’-এর মতো অমূল্য বস্তু বলিয়া মনে হয়। পেঁয়াজ কাটিলে মানুষ আগে কাঁদিত ঝাঁজে, আর এখন কাঁদে কেনার সময় দোকানের ক্যাশ কাউন্টারে গিয়া!
মোল্লা নাসিরুদ্দিনকে একবার এক ধনী লোক জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, ‘মোল্লা সাহেব, পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু আর সেরা খাদ্য কোনটি?’ মোল্লা উত্তর দিয়াছিলেন, ‘যে খাদ্যের হিসাব অন্য কেহ মিটাইয়া দেয়!’
আজকের এই বিশ্ব খাদ্য দিবসে আমারও বঙ্গবাসীর উদ্দেশে আর কোনো জটিল দর্শন ঝাড়িবার ইচ্ছা নাই। কাবুলের কাবাব কিংবা ফরাসি ওয়াইনের কথা ছাড়িয়া দিন, আপাতত আমাদের একটাই মোনাজাত—
হে পরওয়ারদেগার! খাদ্যে পুষ্টি আর ভিটামিন একটু কম দিলেও চলিবে, তবে বাজারে গিয়া চাল-ডাল আর তেলের দর শুনিয়া যেন আমাদের হার্ট অ্যাটাক না হয়, সেই ব্যবস্থাটুকু অন্তত করিয়া দাও!



পাঠকের মন্তব্য