কাকের বর্জন
এক বনের পাহাড়ে একটি ঝরনা ছিল। ঝরনার পানি পাহাড় বেয়ে নিচে নামত, কিন্তু মাঝপথে পাথর আর উঁচু ঢিবির বাধায় থেমে যেত। ফলে নিচের মাঠের অনেক প্রাণী পানির অভাবে কষ্ট পেত। অথচ একটু পরিকল্পনা করে একটি নালা কাটতে পারলে ঝরনার পানি পৌঁছে যেত বনের প্রায় সব এলাকায়।
সমস্যা সমাধানের জন্য সিংহ রাজা বনের সব প্রাণীকে নিয়ে একটি সভা ডাকল। কোথা দিয়ে নালা কাটলে সবচেয়ে বেশি প্রাণী উপকৃত হবে, কীভাবে কাজটি করা হবে আর কোন এলাকায় আগে পানি পৌঁছানো দরকার, তা নিয়ে আলোচনা হবে।
সভা ডাকার খবর ছড়িয়ে পড়তেই বনের রাজনীতিতে বেশ তৎপরতা দেখা গেল। বিশেষ করে কাকের মধ্যে।
কাক ছিল বনের এক পরিচিত নেতা। তার অনুসারীর সংখ্যা কম হলেও গলাবাজিতে সে বেশ দক্ষ। সে প্রতিদিন উঁচু গাছের ডালে বসে অন্য প্রাণীদের ভুল ধরত আর নিজেকে বনের সবচেয়ে সৎ ও দূরদর্শী প্রাণী হিসেবে প্রচার করত। তার কোনো কাজের পরিকল্পনা ছিল না, কিন্তু প্রতিটি কাজের সমালোচনায় সে ছিল অদ্বিতীয়।
সভা বসার আগের দিন কাক তার অনুসারীদের ডেকে বলল, এই সভা আসলে একটা আইওয়াশ। নালা কোথায় কাটবে, তা ওরা আগেই ঠিক করে রেখেছে। আমরা এই প্রহসনে অংশ নেব না।
একটি চড়ুই জানতে চাইল, কিন্তু আমরা তো এখনো জানি না ওরা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সভায় গিয়ে নিজেদের দাবি জানালে সমস্যা কোথায়?
কাক চোখ বড় করে বলল, আমরা তো উড়ে গিয়েই পানি খেয়ে আসতে পারি। নালা কেটে মাটি চুরির কী দরকার?
তারপর সে ডানা ঝাপটে চেঁচিয়ে উঠল, সভা বর্জন করো! ষড়যন্ত্র রুখে দাও!
কাকের অনুসারীরা সঙ্গে সঙ্গে স্লোগান ধরল। ঠিক, ঠিক! যাব না!
কেউ সভার আলোচ্যসূচি পড়ল না, কেউ নালার নকশা দেখতে চাইল না। এমনকি নিজেদের এলাকায় পানি পৌঁছানোর জন্য কী ধরনের নালা দরকার, তা নিয়েও কেউ আলোচনা করল না। সবার একটাই দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াল, কাকের সঙ্গে গলা মিলিয়ে চেঁচানো।
ছোট চড়ুইটি আবার বলল, আমরা যদি সভায় না যাই, তাহলে আমাদের এলাকার কথা বলবে কে?
কাক এবার রেগে গেল।
তোমার সমস্যা কী? তুমি কি আমাদের ঐক্য নষ্ট করতে চাও? তোমার মতো দুর্বল মনোভাবের জন্যই বনের কোনো পরিবর্তন হয় না!
ছোট চড়ুই চুপ করে গেল। সে দেখল, কাকের কাছে প্রশ্নের উত্তর নেই, আছে শুধু প্রশ্নকারীকে অপমান করার কৌশল।
পরদিন সভা বসল। খরগোশ তার গর্তের আশপাশে পানি পৌঁছানোর কথা বলল। হরিণ জানাল, শুষ্ক মৌসুমে চারণভূমির ঘাস শুকিয়ে যায়। কাঠবিড়ালি পুরোনো গাছের শিকড় বাঁচিয়ে নালা কাটার প্রস্তাব দিল। শেয়াল এমন একটি পথের কথা বলল, যাতে কম মাটি খুঁড়তে হয় এবং বেশি প্রাণীর কাছে পানি পৌঁছায়।
আলোচনা হলো, মতবিরোধও হলো। কয়েকটি প্রস্তাব বাতিল হলো, কয়েকটি সংশোধন করা হলো। শেষ পর্যন্ত প্রাণীরা এমন একটি নকশায় একমত হলো, যাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণী উপকৃত হবে এবং নালা কাটার কাজও দ্রুত শুরু করা যাবে।
কাকের অনুসারীদের কেউ সেখানে ছিল না। অন্যদিকে, সভা চলাকালে কাক দূরের একটি ডালে বসে স্লোগান দিচ্ছিল। মানি না! মানব না!
একটি বানর তার পাশ দিয়ে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করল, কী মানো না?
কাক গম্ভীর মুখে বলল, সবকিছু!
কিন্তু কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা তো তুমি জানো না।
কাক ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, মাটি লোপাটের প্রহসন মানি না, মানব না!
বানর কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে চলে গেল। কাক আবার স্লোগান শুরু করল।
কয়েক দিনের মধ্যেই নালা কাটার কাজ শেষ হলো। মাঠে পানি পৌঁছাল। খরগোশেরা গর্তের কাছে পানি পেল, হরিণেরা চারণভূমিতে পানি পেল, কাঠবিড়ালিরাও গাছের শিকড়ের ক্ষতি ছাড়াই পানির সুবিধা পেল।
কিন্তু কাকের টিলায় পানি পৌঁছাল না।
কাকের বাসা ছিল একটি উঁচু শুকনো টিলায়। সে আগে কখনো বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামায়নি। সভার আগে তার মনে হয়েছিল, পানি কোথায় পৌঁছাবে, তা নিয়ে ভাবার চেয়ে সভাকে ব্যর্থ প্রমাণ করা বেশি জরুরি। এখন টিলার মাটি শুকিয়ে ফেটে যেতে দেখে তার মনে পড়ল, তার অনুসারীদেরও তো পানি দরকার। সবাই বাড়ির কাছে পানি পাচ্ছে, অথচ তাদের মাইলের পর মাইল উড়ে গিয়ে পানি খেতে হচ্ছে। এতে শিশু ও বৃদ্ধ পাখিরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে, প্রয়োজনীয় পানি পাচ্ছে না।
সে আবার সবাইকে ডেকে বলল, দেখেছ! এটাই ছিল ওদের ষড়যন্ত্র। আমাদের এলাকার কথা ইচ্ছা করেই বাদ দেওয়া হয়েছে। এই নালা জনবিরোধী!
এক অনুসারী বলল, কিন্তু আমরা তো সভায় যাইনি। আমাদের প্রয়োজনের কথা বলার সুযোগই তো নিইনি।
কাক তার দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন বনের ইতিহাসে এর চেয়ে জঘন্য অপরাধ আর কেউ করেনি।
তুমি কি বলতে চাও, দায় আমাদের? আমরা তো প্রতিবাদ করেছি!
কিন্তু প্রতিবাদ করে আমরা কী চেয়েছিলাম, সেটাও তো ঠিক করিনি।
চুপ করো! তোমার কথায় শত্রুর সুর পাওয়া যাচ্ছে। তুমি পাখিবিরোধী।
কাকের অনুসারীটি আর কথা বলল না।
এরপর কাক নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করল। প্রথম দিন নালার পাশে বিক্ষোভ, দ্বিতীয় দিন নালা বর্জন, তৃতীয় দিন পানি বর্জন। পানি বর্জনের ঘোষণাটি অবশ্য বেশিক্ষণ টিকল না। তৃষ্ণায় কাতর হয়ে তার অনুসারীরা গোপনে অন্য প্রাণীদের কাছ থেকে পানি চাইতে শুরু করল।
কাক এসব জানত। তবু প্রকাশ্যে বলল, আমাদের আন্দোলন সফল হচ্ছে। ওরা আমাদের ভয় পেয়েছে!
ঠিক তখনই একটি কাক এসে খবর দিল, রাজা সিংহ নালার দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন। সেখানে আরও কিছু এলাকার সঙ্গে কাকদের টিলায় পানি পৌঁছানোর প্রস্তাবও বিবেচনা করা হবে। তবে সে জন্য সংশ্লিষ্ট প্রাণীদের সভায় এসে নিজেদের প্রয়োজন ও প্রস্তাব জানাতে হবে।
কাক খবর শুনে প্রথমে খুশি হলো। তারপরই তার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
দেখেছ! আমাদের আন্দোলনের চাপে ওরা নতি স্বীকার করেছে। তবে আমরা এখনই সভায় যাব না। আগে আমাদের দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিতে হবে।
ছোট চড়ুই এবার সাহস করে বলল, কিন্তু আমাদের দাবি কী? কত দূর নালা কাটতে হবে, কোথায় পানি জমবে, কীভাবে কাজটা হবে, কিছুই তো ঠিক করিনি।
কাক গর্জে উঠল, দাবি ঠিক করার দায়িত্ব আমার। তোমাদের কাজ আমার সঙ্গে থাকা।
চড়ুই শান্ত গলায় বলল, তাহলে পানি দেবার দায়িত্বটা কার?
কাক কোনো উত্তর দিল না। সে ডানা মেলে উড়ে গেল রাজপ্রাসাদের দিকে।
সিংহ তাকে দেখে বলল, তোমাদের এলাকায় পানি পৌঁছানোর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তোমরা কী চাও, তা বলো।
কাক বুক ফুলিয়ে দাঁড়াল। তারপর একটু থেমে বলল, আমাদের এলাকায় নালা চাই।
সিংহ বলল, কোথা দিয়ে নালা কাটলে ভালো হবে, তার কোনো প্রস্তাব এনেছ?
কাক চুপ।
কত দূর নালা কাটতে হবে, তা হিসাব করেছ?
কাক এবারও চুপ।
কাজটি করতে কী কী প্রয়োজন, অন্য প্রাণীদের সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করবে, সে বিষয়ে কিছু ভেবেছ?
কাক মাথা নিচু করল।
সিংহ বলল, তাহলে এত দিন ধরে তুমি কী নিয়ে আন্দোলন করছিলে?
কাক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিলাম।
সিংহ জিজ্ঞেস করল, আর ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য কী করেছ?
কাকের ঠোঁট নড়ল, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোল না।
সিংহ তাকে কোনো অপমান করল না, কোনো শাস্তিও দিল না। শুধু বলল, অন্যের সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে। তাই বলে নিজের প্রস্তাব না দিয়ে, নিজের কথা না বলে, পরে সব দায় অন্যের ওপর চাপালে সমস্যার সমাধান হয় না।
কাক ফিরে এল শুকনো টিলায়। তার অনুসারীরা চারপাশে জড়ো হলো।
রাজা কী বলেছে? তারা জানতে চাইল।
কাক গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, আমাদের আন্দোলনের গুরুত্ব স্বীকার করেছে।
একটি চড়ুই বলল, তাহলে নালার প্রস্তাবটা কী হলো?
সেটা নিয়ে আলোচনা চলছে।
আমরা কী প্রস্তাব দিয়েছি?
কাক বিরক্ত হয়ে বলল, সবকিছু কি এখনই বলতে হবে? রাজনীতি এত সহজ নয়!
ছোট চড়ুইটি এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার সে কাকের সামনে এসে দাঁড়াল। একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
কাক বিরক্ত মুখে বলল, আবার কী?
চড়ুই জিজ্ঞেস করল, আমরা নিজেরা এত দিন ধরে কী চাই, সেটাও ঠিক করতে পারিনি। তাহলে আমাদের এই লড়াইটা আসলে কার জন্য ছিল?
কাক কোনো উত্তর দিল না।
দূরে নালার পানি চিকচিক করছিল। মাঠের প্রাণীরা সেই পানি ব্যবহার করে নিজেদের জীবন সহজ করছিল। আর কাকের টিলায় শুকনো মাটির ওপর তার অনুসারীরা বসে ছিল, পরবর্তী স্লোগানের অপেক্ষায়।
সেদিন প্রথমবার ছোট চড়ুইটি কাকের দিকে না তাকিয়ে ঝরনার দিকে তাকাল। সে বুঝতে পারল, শুধু অন্যের ভুল ধরতে জানলেই পথ তৈরি করা যায় না। পথ তৈরি করতে হলে কোথায় যেতে চায়, সেটাও জানতে হয়।
কাক অবশ্য পরদিন সকালেই নতুন স্লোগান নিয়ে হাজির হলো।
আমাদের পানি চাই! আমাদের অধিকার চাই!
স্লোগান শুনে ছোট চড়ুইটি আর গলা মেলাল না। সে কয়েকটি চড়ুইকে নিয়ে টিলার ঢাল পরীক্ষা করতে বেরিয়ে পড়ল। কোথা দিয়ে ছোট একটি নালা কাটা যায়, কোথায় মাটি সরাতে হবে, আর কাদের সাহায্য লাগবে, তা তারা নিজেরাই দেখতে শুরু করল।
কাক দূর থেকে তাদের দেখে চেঁচিয়ে উঠল, তোমরা আমার অনুমতি ছাড়া কাজ শুরু করলে কেন?
ছোট চড়ুইটি থামল না।
তার সামনে তখন শুকনো মাটি। সে মাটি খুঁড়তে শুরু করল। তার সাথে নেমে পড়ল অন্য চড়ুইরাও। কাক তখনো মগডালে বসে স্লোগান দিচ্ছে, পানি চাই... অধিকার চাই...!



পাঠকের মন্তব্য