মাসকাওয়াথ আহসানের ধারাবাহিক নভেলা, প্রণব মুখুজ্জের অভিধান (বিংশ পর্ব)

২২ পঠিত ০ ... ২১ ঘন্টা ১৪ মিনিট আগে

 

লম্বা চুল-দাড়ি নিয়ে সাধুসন্তের বেশে পয়সারহাটে ফেরে পথিকৃৎ বাতেন। তাকে দেখে এলাকার লোক বেশ অবাক হয়। কেউ কেউ অনুমান করে, সে হিমালয়ে গিয়ে সাধু হয়ে ফিরেছে। অনেকে তাকে পথিকৃৎ ঠাকুর নামে ডাকতে শুরু করে।

সে কলিম চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে আসে। কলিম চৌধুরী তাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখেন। খাটো পাঞ্জাবি, পাজামা; সঙ্গে লম্বা চুল ও দাড়িতে তাকে আধ্যাত্মিক গুরু মনে হচ্ছে। চৌধুরী জিজ্ঞেস করেন, এখন আর কি যুব সংগঠন চালাইতে পারবা বাতেন! নাকি ঘরে বইসা ধ্যান করবা!

-- এমএলএ সাব, এখন আমি দেশের জন্য যেকোনো ত্যাগ করতে প্রস্তুত।

-- এত ত্যাগের দরকার নাই; চাঁদা ভোগ কইরো না, তাইলেই হবে।

কলিম চৌধুরীর বাড়ি থেকে ফিরে মন্দিরের পাশে বটগাছের নিচে দধীচি কবিদের চত্বরে বাঁধানো শানের ওপর আসন করে বসে থাকে। চারণ কবি রজব বাতেনের আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে বলে,

ইহা কি আমাদিগের কবি বাতেন,
নাকি সাধু কোনো হিমালয়-রতন!

বাতেন আর আগের মতো সাড়া দেয় না। অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে, চক্ষু শান্ত রেখে কথা বলে, কেমন আছে চারণ কবি রজব!

-- সেই যে তুমি জনসভায় আমার মুখ চাপিয়া ধরলে; তারপর সর্বত্র সবাই আমার মুখ চাপিয়া ধরে।

-- নতুন কোনো কবিতা-টবিতা বাঁধো, একই কবিতা আর কত ভালো লাগে!

নতুন কিছু ছেলে দধীচি কাব্য আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। রজব তাদের সঙ্গে বাতেনের পরিচয় করিয়ে দেয়। এদের মধ্যে দারোগার ছেলে মতি, স্টেশনমাস্টারের ছেলে রঞ্জু, তহশিলদারের ছেলে জগন্ময় বেশ চটপটে। কথায় কথায় কার্ল মার্কসের উদ্ধৃতি টানে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কারণে পয়সারহাটের লোক আর কী জানে, আমরাই সব জানি, ভাবখানা খুব প্রকট তাদের মাঝে।

একপর্যায়ে স্টেশনমাস্টারের ছেলে রঞ্জু বলে, পথিকৃৎদা, কী আপনি রাশেদ খানের মতো ডানপন্থীর সঙ্গে রাজনীতি করেন! এইভাবে কি সমাজ পরিবর্তন হবে!

-- রাশেদ খান তোমাদের অনেক আগেই ঢাকা মেডিকেল কলেজে বাম রাজনীতি করে আসছে। ভাষা আন্দোলনে অংশ নিছে। তোমরা তারেই যখন ডানপন্থী বলতেছো, আমারে বলা তো কোনো ব্যাপারই না তোমাদের কাছে।

তহশিলদারের ছেলে জগন্ময় মন্তব্য করে, ডানপন্থী না হইলে কি কেউ সলিম খানের মেয়েরে বিয়ে করে!

-- জমিদারি উচ্ছেদের পর পয়সারহাটে পরিবার বলতে কলিম চৌধুরী আর সলিম খানের পরিবার। তারা তো শৈশবের বন্ধু।

দারোগার ছেলে মতি টিপ্পনি কাটে, শুনেছি রাশেদ খানের সঙ্গে কল্পনা মুখুজ্জের প্রেম চলতেছে!

বাতেন এবার শান্তিনিকেতনি ব্যাগ থেকে রিভলবার বের করে আকাশে ফাঁকা ফায়ার করে। তারপর রিভলবারের নলের ধোঁয়ায় ফুঁ দিয়ে বলে, দধীচি চত্বরটারে পাতকুয়াতলা বানাইয়া ফেলবা দেখতেছি। তোমরা বরং কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রে যাও। সেইখানে এইসব পরনিন্দার মার্কেট পাইবা।

ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই ভয় পেয়ে যায়। দারোগার ছেলে মতি থানায় দৌড়ে গিয়ে বাপের কাছে নালিশ দেয়। জগন্ময় দৌড়ে গিয়ে মধুমতীর আলোর সম্পাদক মুকুল শর্মার সামনে বসে কাঁদে। আর রঞ্জু ট্রেনে উঠে পড়ে। ট্রেন যেখানে নিয়ে যায়, সে যাবে।

দারোগা সাহেব রাশেদ খানের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। রাশেদ খান বলেন, আমি তো ঘটনার কিছুই জানি না। বাতেন যুব সংগঠনের নেতা। আমি ওর দায়িত্ব নিচ্ছি। আর কখনো এমন হবে না। আপনি বরং আপনার ছেলেকে জিজ্ঞেস করবেন, সে বাতেনকে কতটা উত্যক্ত করেছে, যাতে এত রেগে উঠেছে সে।

এভাবে ঘটনাটার মিটমাট হয়ে গেলে এলাকায় বাতেনের প্রতিপত্তি বাড়ে। ফলে তাকে অনেক কম কথা বলতে হয়। এমনিতেই লোকজন তার কথা শোনে।

রাশেদ খান বাতেনকে জিজ্ঞেস করেন, কী হয়েছিল সেদিন!

বাতেন কিছু বলে না। শুধু ছোট করে বলে, রাশেদ ভাই, আমি ওদের কুঁচকুঁচানি সহ্য করতে পারি নাই। কাজ নাই, কাম নাই, খালি কুঁচকুঁচানি তাদের। দিনমান অন্যরে মাপামাপি করা!

-- বাতেন, আমাদের শ্রমজীবী মানুষেরা সারাদিন কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকে; ফলে তাদের কোনো কুঁচকুঁচানি নাই। কিন্তু কায়িক শ্রম নেই যাদের, তাদের কাজ হলো লোকজনকে মাপামাপি করা আর কুঁচকুঁচ করা। জানি না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এরকম অন্যকে খাটো করে নিজে দীর্ঘ হওয়া শেখায় কি না!

-- রাশেদ ভাই, বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চবর্গ হওয়ার উচ্চাভিলাষ তৈরি করে। তো এই উচ্চবর্গ হওয়ার সহজ উপায় হলো অন্যকে খাটো করা। নিজেকে উন্নত মানের মানুষ প্রমাণের আর কোনো যোগ্যতা যেহেতু তাদের নাই।

-- সমাজ গড়তে সহজ মানুষ লাগে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জটিল মানুষ তৈরি করে। সমাজের সহজ মানুষেরা কৃষক প্রজা আন্দোলন করে জমিদারি ব্যবস্থার অবসান ঘটালো। তাদেরই সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন নিয়ে মুসলিম লীগ পাকিস্তান দাবি করলো। অথচ ৪৭-এর স্বাধীনতার সুফল কুড়ালো মুসলিম লীগের আশরাফিয়া।

-- যে শেরে বাংলা লাহোর প্রস্তাব না আনলে পাকিস্তান হতো না, সেই পাকিস্তান হওয়ার পর শেরে বাংলার মূল্যায়ন হলো না।

-- কলকাতার মেয়র, অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী, পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পূর্ব বাংলার গভর্নর হলেন তিনি। কিন্তু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পদটি তাকে কিছুতেই দেওয়া হলো না। উনি যেহেতু পূর্ববঙ্গের জমিদারি ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়েছেন, পশ্চিম পাকিস্তানের জমিদারি ব্যবস্থার আশরাফিয়া তাই তাকে ভয় পেয়েছে।

-- রাশেদ ভাই, ব্রিটিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি ব্যবস্থার ব্রাহ্মণ্যবাদ আর পাকিস্তানের জমিদারি ব্যবস্থার আশরাফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছাত্রদের মনে অভিজাত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে। এরা মুখে মুখে বলে সমাজ পরিবর্তনের জন্য কাজ করছে; কিন্তু ভেতরের আকাঙ্ক্ষাটা সমাজের উঁচুতলার বাসিন্দা হওয়ার। এ কারণে দেখবেন, শতবর্ষ ধরে নতুন নতুন জমিদারি ব্যবস্থা তৈরি হবে এ দেশে।

২২ পঠিত ০ ... ২১ ঘন্টা ১৪ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top ​