মাসকাওয়াথ আহসানের ধারাবাহিক নভেলা, প্রণব মুখুজ্জের অভিধান (একবিংশ পর্ব)

২৬ পঠিত ০ ... ২১ ঘন্টা ১১ মিনিট আগে

16 (41)

 

কালিদাস বিষণ্ণ মুখে পণ্ডিত প্রণব মুখুজ্জের বাড়িতে আসে। পয়সারহাটে রাশেদ খান এসে ডাক্তারি করার কারণে কালিদাসের ডিসপেনসারিতে রোগী কমেছে। অন্যদিকে, বাতেন আওয়ামী যুব সংগঠনে যোগ দেওয়ায় দধীচি কাব্য আন্দোলনের কবিরা বাতেনের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের কারণে যুব সংগঠনে ঢুকে পড়েছে। ফলে মন্দিরের পাশে বটবৃক্ষের নিচের আড্ডা ভেঙে গেছে। সবাই এখন পয়সারহাট আওয়ামী কার্যালয়ে বসে। সব মিলিয়ে এত দিন ধরে গড়ে তোলা সাংস্কৃতিক বলয়টি এখন দ্বিধাবিভক্ত।

প্রণব মুখুজ্জে সুপারি চিবুতে চিবুতে বলেন, সুরাবর্দী প্রধানমন্ত্রী হয়েছে। ফলে কটা দিন পার্টি ইন পাওয়ারের রোয়াব হয়েছে তাদের। কিন্তু ক্ষমতা হারালেই দেখবে, আবার আমাদের সাহায্য চাইবে। আমাদের কাজ হলো বড়শি ফেলে বসে থাকা; মাছ একসময় ঠিকই টোপ গিলে আমাদের ঝুড়িতে আসবে।

অধ্যক্ষ আজিজুল হক এসে পণ্ডিত মশাইয়ের পাশের চেয়ারে বসেন। আজ তাঁকেও বেশ হতাশ দেখাচ্ছে। তিনি খবর দেন, আব্বাস শাহ আবার ফুলের মালা গলায় দিয়ে জেল থেকে ফিরেছে। এবার সে মাদ্রাসা গড়ছে। পয়সারহাটের লোকজন, যারা একটি সন্তানকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠায়, আরেকটি সন্তান সঙ্গে থেকে কাজে সাহায্য করে, তারা ওই সন্তানকে মাদ্রাসায় দিচ্ছে। বাপের সঙ্গে থেকে কাজে সাহায্য করবে, আবার মাদ্রাসায় পড়বে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে যারা, তারা ছুটিছাটায় ফিরে কৃষিকাজ করতে চায় না। কিন্তু এখন তো মাদ্রাসার কারণে ব্যাপক ইসলামিকরণ ঘটবে।

কালিদাস চুক চুক করে বলে, এরা তো আর বাঙালি হতে পারবে না। তাহলে আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদের কী হবে!

এমন সময় চিত্তরঞ্জন ও মুকুল শর্মা এসে পণ্ডিত মশাইয়ের সামনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকে। উনি তাঁদের বসতে বলেন। জিজ্ঞেস করেন, কী হে চিত্ত, বাতেনকে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে কী করলে যে সে এমন কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রবিরোধী হয়ে পড়ল!

চিত্ত কিছু বলার আগে মুকুল শর্মা অভিযোগের সুরে বলে, পণ্ডিত মশাই, আপনার মেয়ে কল্পনা তার ছাত্রীদের নিয়ে কৃষ্টি সংসদ করেছে। শ্যামাপদ তার ছাত্রদের সেখানে পাঠায়। এমএলএ সাহেবের মেয়ে সুলতানা নিজ গৃহে তাদের এই সংগঠন চালানোর স্থান করে দিয়েছে। দধীচি কাব্য আন্দোলনের কবিরাও সেখানে যায়। ওরা এখন দলে অনেক ভারী হয়েছে। মধুমতীর আলোতে ফরমায়েশি কলাম লিখতেও কেউ আর রাজি হচ্ছে না। শুনলাম, ওদের নিজেদের একটি পত্রিকা আসছে। ডিসি সাহেবের পারমিশনও নাকি পেয়েছে।

প্রণব মুখুজ্জে চশমা খুলে চোখ ডলতে ডলতে বলেন, আমি তো বরং স্টেশন মাস্টারের ছেলে রঞ্জু, তহশিলদারের ছেলে জগন্ময় আর দারোগার ছেলে মতির মধ্যে অনেক সম্ভাবনা দেখছি। সাহস করে অনেকগুলো কথা তারা বাতেনকে শুনিয়ে দিয়েছে। ওদের কলাম লেখা শেখাও, মুকুল। অধ্যক্ষ সাহেব একটু গাইড করে দেবেন। ঘন ঘন কলাম ছেপে ওদের তারকা লেখক করে তুলতে হবে। ওরাই হবে ন্যারেটিভ বিল্ডার। বাতেন গ্রুপটাকে আমাদের সাঙ্ক কস্ট ধরে নাও। যদিও আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, লক্ষ্যে পৌঁছাতে ওদের আমাদের সাহায্য লাগবেই।

অধ্যক্ষ আজিজুল হক বলেন, কিন্তু বাতেন অস্ত্র উঁচিয়ে ভয় দেখানোতে পয়সারহাটে ওদের আধিপত্য তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, বাতেনেরই লিডার রাশেদ খান একটা ভদ্র ইমেজ ধরে রেখেছে। ইচ্ছা করে ওর মুখোশ উন্মোচন করি। লিখে ফেলি, পয়সারহাটকে বিষাক্ত করে ফেলেছে সংকীর্ণমনা রাশেদ খান।

প্রণব মুখুজ্জে কিছুটা প্রশ্রয়ের হাসি হাসেন। কালিদাস ম্লান মুখে বলে, পয়সারহাটে অনেক দিন কোনো সাম্প্রদায়িক টেনশন নেই। হাটে-বাজারে অনেকটা সম্প্রীতির পরিবেশ। দ্বন্দ্ব না থাকলে রাজনীতির বিকাশ হবে কেমন করে!

প্রণব মুখুজ্জে হেসে বলেন, মোল্লা আব্বাস জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে যেহেতু, সাম্প্রদায়িক টেনশনের অভাব হবে না। আর কোথাও একটু উত্তেজনা দেখা দিলেই কচুক্ষেতের উস্কোখুস্কো চুল, ময়লা জামা, পরিচ্ছন্ন হাত-পায়ের নখওয়ালা পাগলগুলোকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিলেই হবে।

২০ তম পর্বের লিংক

২৬ পঠিত ০ ... ২১ ঘন্টা ১১ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top ​