একটি ভুল উচ্চারণে হারিয়ে গেল ভ্যাসলিন, জন্ম নিল বেসলাইন

পঠিত ... ১ ঘন্টা ৫ মিনিট আগে

ঘটনার কেন্দ্রীয় চরিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার এক তরুণী, নাম মিন ডে লি। ভদ্রমহিলার মূল পেশা হলো স্কিনকেয়ার বা ত্বকের পরিচর্যার কথা বলে ইন্টারনেটবাসীকে বিভিন্ন কৌটো কেনার প্ররোচনা দেওয়া। আধুনিক সমাজ যাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে বিউটি ইনফ্লুয়েন্সার নামে ডাকে। তো, এই মিন ডে লি হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন, তার কাছে জমানো এক প্রকাণ্ড প্রসাধন-সংগ্রহ বিশ্ববাসীকে প্রদর্শন করবেন।

ভিডিও চালু হলো। হাতে এক ডজন পেট্রোলিয়াম জেলির কৌটো নিয়ে তিনি অতিশয় প্রফুল্ল ও মিহি গলায় বারবার বলতে লাগলেন, বেসলাইন।

হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। যে বস্তুকে আমপাবলিক শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভ্যাসলিন বলে চিনে এসেছে, সেটি তার সুকোমল মুখের ভিতর দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় এক অচেনা সামাজিক রূপান্তর ঘটিয়ে ফেলল। তিনি ব্যাকুল এনার্জি নিয়ে উচ্চারণ করতে থাকলেন, ড্রাই লিপ বেসলাইন, অ্যাশি এলবো বেসলাইন, রাফ হিলস বেসলাইন।

মুহূর্তের মধ্যে ভিডিওটি ভাইরাল। মানুষ নিজেদের নাগরিক দায়দায়িত্ব, হাঁড়ির চাল আর সংসারের চিন্তা শিকেয় তুলে রেখে ওই বেসলাইন অডিওর পেছনে নিজেদের মুখমণ্ডল বসিয়ে রিল বানাতে শুরু করে দিল।

এখন কথা হলো, ভদ্রমহিলা হঠাৎ ভি-কে সরিয়ে বি বসিয়ে দিলেন কেন? তিনি কি নতুন কোনো ভাষাবিপ্লবের ডাক দিলেন?

ব্যাপারটা আসলে নিছক এক ভাষাগত সীমাবদ্ধতা। দক্ষিণ কোরিয়ার ভাষা, অর্থাৎ কোরিয়ান ধ্বনিতত্ত্বে ইংরেজি V (ভ) ধ্বনিটির কোনো স্থান নেই। সেখানে V বললেই সেটা অবলীলাক্রমে এবং অবচেতনভাবে রূপান্তরিত হয়ে যায় B (ব)-তে। মিন ডে লির কাছে Vaseline যে Baseline হয়ে বেরোবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকার কথা ছিল না। কারণ তাদের কাছে Violin হয়ে যায় Biolin, Visa রূপ নেয় Bija-তে, আর Video হয়ে পড়ে Bideo।

শুধু V কেন? আপনি তাদের ভাষায় ইংরেজির F নিয়ে এলে সেটা P হয়ে ধাক্কা খাবে, Coffee হয়ে যাবে Keopi। Z উচ্চারণ করতে গেলে মুখ দিয়ে বেরোবে J, Zoo হবে Ju-তে। এমনকী Th-এর মতো নিরীহ ধ্বনিকেও তাঁরা টেনে হিঁচড়ে বানিয়ে দেন S বা T। ফলে Think হয়ে যায় Singkeu।

সহজ কথায়, মিন ডে লি কোনো নতুন ভাষা আন্দোলন করেননি। তিনি কেবল নিজের মাতৃভাষার নিয়ম মেনে ইংরেজি শব্দটিকে নিজের মতো করে দুমড়ে-মুচড়ে পেশ করেছেন। এবং এই অতি সাধারণ ভাষাগত ভুলটিকেই ইন্টারনেটের অপার্থিব সমাজ চরম এক মেম-উৎসব বানিয়ে ফেলল।

এখানেই শুরু হলো বহুজাতিক পুঁজিপতিদের আসল তামাশা। সাধারণ যেকোনো আমলাতান্ত্রিক কোম্পানি হলে তারা হয়তো নিজেদের দেড়শো বছরের ব্র্যান্ড-মর্যাদা রক্ষার তাগিদে আইনি নোটিশ পাঠাত, কিংবা প্রেস রিলিজ জারি করে বলত, পাবলিক, উচ্চারণ ঠিক করো।

তারা সংশোধন করার পথে তো হাঁটলই না। কোম্পানি রাতারাতি তাদের অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম পেজের নাম Vaseline কেটে বানিয়ে দিল Baseline। শুধু নাম বদল নয়, প্রোফাইল পিকচার, লোগো, এমনকী কাল্পনিক প্রোডাক্ট প্যাকেজিং পর্যন্ত Baseline স্টাইলে বানিয়ে ফেলল। আর তারপর বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে জারি করল এক অভাবনীয় জোক-স্টেটমেন্ট।

স্টেটমেন্টের সারমর্ম অনেকটা এরকম—

আমরা আপনাদের কথা শুনেছি এবং একমত হয়েছি। গভীর পর্যালোচনা শেষে (যার অর্থ হলো কোটিবার দেখা মাত্র একটি ভিডিও) আমরা আমাদের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আজ থেকে আমাদের স্বাগতম জানান Baseline হিসেবে। ১৫০ বছর ধরে পৃথিবীর নানা কোণে আপনারা যেভাবে ইচ্ছা আমাদের নাম ভুল উচ্চারণ করেছেন, এই নতুন নামটি তারই চূড়ান্ত স্বীকৃতি। আর এই আবিষ্কারের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব যেহেতু মিন ডে লি-র, তাই কোনো ইন্টারভিউ ছাড়াই তাকে Baseline-এর নতুন সিইও (CEO) পদে বসানো হলো।

ভাবুন একবার কাণ্ড! ভারতীয় ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টগুলো আরও এক ধাপ এগিয়ে লিখে বসল, We gave you Vaseline. You gave us Basseline. তারা ইউজারদের জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করে দিল, কে কত নিখুঁতভাবে এই ভুল উচ্চারণটা বানিয়ে রিল পোস্ট করতে পারে!

পুরো ব্যাপারটা কিন্তু আদতে কোনো নাম পরিবর্তন নয়, নিছক জেন-জি সংকেত ধরে কোটি টাকার ফ্রিতে প্রচার কুড়িয়ে নেওয়ার ধান্ধা। যাকে আজকের কর্পোরেট পরিভাষায় বলে রিয়্যাক্টিভ মার্কেটিং।

দিনশেষে শিক্ষা একটাই, আপনি ভুল উচ্চারণ করলেও সমস্যা নেই, যদি না আপনার পেছনে কোটি খানেক ভিড় আর একটা ক্যাপিটালিস্ট ব্র্যান্ড আপনার ভুলটাকে ক্যাশ করার জন্য ওত পেতে বসে থাকে।

পঠিত ... ১ ঘন্টা ৫ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top