হুট করে কেন নিউজফিড ফিরে গেল আশির দশকে?

১৮২ পঠিত ... ২৩ ঘন্টা ১২ মিনিট আগে

6 (18)

ঘুম থেকে উঠে অভ্যাসমতো ফোন হাতে নিয়ে ফেসবুকে ঢুকলাম। হঠাৎ দেখি বন্ধু একটা ছবি আপলোড দিয়েছে ওর বাবার! জিন্সের জ্যাকেট, রংচটা জিন্সের প্যান্ট, বড় চুল, সানগ্লাস… সাথে সাথে কমেন্ট করলাম, দোস্ত! আংকেল তো খুব স্মার্ট ছিল রে! আর তোর সাথে চেহারায় মিল আছে! বন্ধু রিপ্লাই দিল, ধুর ব্যাটা! এইটা আমিই! আমার আব্বা হবে কেন!

মোটামুটি গত কয়েকদিনে আমাদের সবার নিউজ ফিড চলে গেছে ৮০র দশকে। কারও ছবিতে বিশাল চুল, কারও গায়ে রঙিন ওভারসাইজড ব্লেজার, কারও হাতে পুরোনো টেলিফোন, কারও পাশে আশির দশকের গাড়ি। ছবির রং একটু মলিন, আলো নরম, কোথাও গ্রেইনি ফিল্মস, কোথাও পুরোনো স্টুডিওর সেই পরিচিত ফ্ল্যাশ। রেট্রো লুক, ভিন্টেজ সেপিয়া টোনে সবাই নিজেকে সাজাচ্ছে। কিন্তু কেন? কীভাবে শুরু হলো এই ট্রেন্ড?

ট্রেন্ডটার শুরু কোথা থেকে বা কে প্রথম শুরু করেছিল, তা একেবারে নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে এর পেছনে ৮০-এর দশক নিয়ে তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের নস্টালজিয়ার একটা ভূমিকা আছে। বিশেষ করে Stranger Things মুক্তির পর নতুন প্রজন্মের কাছে আশির দশকের পোশাক, চুলের স্টাইল, গান, সিনেমা আর রেট্রো এস্থেটিক নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যদিও বর্তমান AI ট্রেন্ডটি সরাসরি Stranger Things থেকেই শুরু হয়েছে, এমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। 

টিকটক বা ইন্সটাগ্রামের বহু ভাইরাল চ্যালেঞ্জেরর মতো এখানে এখন পর্যন্ত কোনো একজন ক্রিয়েটরের নাম সামনে আসেনি। CNN Brasil-এর ৮ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রেন্ডটি সেপ্টেম্বরের শুরুতে সামাজিক মাধ্যমে অর্গ্যানিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে তাই এখানে কোনো নির্দিষ্ট ক্রিয়েটরের নাম বলা যায় না। কয়েকজন ব্যবহারকারী একই ধরনের কৌতূহল থেকে AI-কে একই প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন, তারপর নিজেদের ফলাফল সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন; সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে এই ৮০র দশকের বিশাল ঢেউ।

ট্রেন্ডে পিছিয়ে নেই অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও

WhatsApp Image 2026-09-09 at 17.20.21

ট্রেন্ডে খেলোয়াড়রাই বা কেন পিছিয়ে থাকবে?

 

তবে সেপ্টেম্বরের ৭ তারিখের পোস্টগুলো এই ছড়িয়ে পড়ার একটা ধারণা দেয়। Exame-এর প্রতিবেদনে ওই দিনের X- এর পোস্টের উদাহরণ পাওয়া যায়। যেখানে ইউজাররা নিজেদের “ChatGPT অনুযায়ী ৮০-এর দশকে আমি” ধরনের ছবি প্রকাশ করছিলেন। অন্যদিকে Instagram-এ “Add Yours” ফিচার ট্রেন্ডটিকে আরও দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছে। একজন নিজের ছবি দিয়ে অংশ নেওয়ার পর অন্যরা সেই চেইনে নিজেদের ভার্সন যোগ করতে পারছেন। ফলে এই AI এক্সপেরিমেন্ট খুব দ্রুত সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। এখানে কোনো কঠিন এডিটিং স্কিল দরকার নেই, কোনো বিশেষ ক্যামেরা বা সফটওয়্যারও লাগছে না। নিজের একটি ছবি এবং কয়েক লাইনের একটা প্রম্পটই যথেষ্ট। এই সহজ প্রক্রিয়াটিই সম্ভবত ট্রেন্ডটির ছড়িয়ে পড়ার সবচেয়ে বড় কারণ। 

তবে এখানে আরও একটা প্রশ্ন আসে, ৮০র দশকই কেন? কেন ৯০ বা ২০০০ এর দশক নয়? AI তো চাইলে ৬০, ৭০, ৯০ কিংবা ২০০০-এর দশকেও মানুষকে পাঠাতে পারে। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকের একটা বড় সুবিধা হলো, এই দশকের ভিজ্যুয়াল খুবই শক্তিশালী। বড় এবং ফোলানো হেয়ারস্টাইল, শোল্ডার প্যাড, পাওয়ার স্যুট, হাই-ওয়েস্টেড ট্রাউজার্স, ডেনিম, চোখে পড়ার মতো গয়না, ভারী মেকআপ, ক্যাসেট প্লেয়ার, পুরোনো গাড়ি, স্টুডিও ফ্ল্যাশ, উষ্ণ আলো- অল্প কয়েকটি বৈশিষ্ট্যেই একটা ছবিকে এইটিজ বলে চিনে ফেলা যায়। ফলে এআইয়ের জন্যও সময়টাকে ভিজ্যুয়ালাইজ করা তুলনামূলকভাবে সহজ। একজন মানুষকে শুধু কয়েকটি পরিচিত আশির দশকের উপাদানের মধ্যে বসিয়ে দিলেই দর্শকের চোখে একটা সম্পূর্ণ সময়কাল তৈরি হয়ে যায়। 

৮০র দশকের লুক নিয়েছেন শূণ্য ব্যান্ডের সদস্যরাও

দক্ষিণ এশিয়ায় এই ট্রেন্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় পপ কালচারের প্রভাবও। বিশেষ করে ভারতে আশির দশকের বলিউডের নায়ক-নায়িকাদের চুলের স্টাইল, গোঁফ, শাড়ি, বড় গয়না, উঁচু কোমরের প্যান্ট, স্টুডিও প্রতিকৃতি ও তৎকালীন আলোর ব্যবহার এআই দিয়ে তৈরি ছবিতে ফিরে আসছে। ইকোনমিক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে ট্রেন্ডটির সঙ্গে বলিউডের আশির দশকের নায়ক-নায়িকাদের সাজসজ্জার মিলের কথাও উঠে এসেছে। ফলে এইটিজ শুধু আমেরিকান পপ কালচারের অনুকরণে সীমাবদ্ধ নেই; এআই সেটিকে ব্যবহারকারীর নিজস্ব সাংস্কৃতিক আবহ অনুযায়ী বদলে দিতে পারছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি বেশ পরিচিত। পুরোনো অ্যালবামের স্টুডিও প্রতিকৃতি, তীব্র ফ্ল্যাশ, আনুষ্ঠানিক ভঙ্গি, মলিন রং কিংবা হাতে আঁকা স্টুডিওর পটভূমি- এসবই আমাদের চেনা। অনেকেই নিজের বাবা মায়ের পুরোনো ছবির সাথে মিল খুঁজে পাচ্ছে। বাসায় থাকা অ্যালবামের ছবির কথা মনে পড়ছে। তাই এআইয়ের তৈরি ছবিটা অনেক সময় হলিউডের আশির দশকের মতো নয়, বরং মনে হয়, এটা তো আমাদের বাসার পুরোনো অ্যালবামে থাকতেই পারত। এখানেই ট্রেন্ডটির মজা, এআই শুধু আশির দশক ফিরিয়ে আনছে না, নিজের সাংস্কৃতিক স্মৃতিকেও ছবির অংশ করে দিচ্ছে।

তবে এই প্রবণতার সবচেয়ে মজার দিক সম্ভবত অন্য জায়গায়। যারা এখন নিজেদের আশির দশকের ছবি বানাচ্ছেন, তাদের অনেকেই সেই সময় দেখেননি। তাহলে তারা কীসের জন্য নস্টালজিয়ায় ভুগছেন? নিজের স্মৃতির জন্য তো নয়। তারা আসলে অন্যের স্মৃতি থেকে একটা সময়কে চিনেছেন। বাবা-মায়ের ছবি, পুরোনো সিনেমা, পুরোনো গান, আত্মীয়দের গল্প, টেলিভিশনে দেখা সেই সময়ের দৃশ্য- এসব মিলিয়ে তাদের মাথায় আশির দশকের একটা ছবি তৈরি হয়েছে। সেই ছবির ভেতর এবার তারা নিজেদের দেখছেন।

এই ব্যাপারটাকে এক ধরনের ধার করা নস্টালজিয়া বলা যায়। এমন একটি সময়ের জন্য মন কেমন করা, যে সময়ে তার নিজের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন অনুভূতিকে বোঝাতে অ্যানেমোয়িয়া শব্দটিও আলোচনায় এসেছে- অর্থাৎ এমন এক অতীতের জন্য নস্টালজিয়া, যেটি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা নয়। আশির দশকের এই প্রবণতা যেন সেই অনুভূতিকে চোখের সামনে এনে দিচ্ছে। আগে কেউ হয়তো ভাবতেন, ইশ, আমি যদি ওই সময়টায় থাকতাম! এখন AI সেই কল্পনার একটা ছবি বানিয়ে দিচ্ছে।

আর ছবিটি বানিয়ে দেওয়ার পর শুরু হচ্ছে আসল মজা। মানুষ নিজের ছবি দেখছে, তারপর বন্ধুর ছবি দিয়ে চেষ্টা করছে। কেউ নিজের সঙ্গীর ছবি বানাচ্ছেন, কেউ ভাই-বোনের, কেউ আবার বাবা-মায়ের তরুণ বয়সের ছবি দেখে একই রকম কিছু বানানোর কথা ভাবছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অন্যের ছবি দেখে নতুন নতুন ধারণা যোগ হচ্ছে। কোথাও মানুষকে পুরোনো গাড়ির পাশে দাঁড় করানো হচ্ছে, কোথাও নাচের অনুষ্ঠানে, কোথাও স্কুলের ছবির মতো সাজানো হচ্ছে। ফলে একই প্রবণতার ভেতরেই তৈরি হচ্ছে হাজার হাজার আলাদা গল্প।

তারপর যোগ দিয়েছেন তারকারাও। ব্রাজিলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবরিনা সাতো, লুসিয়ানো হুক, অ্যাঞ্জেলিকা, তাতা ভের্নেক, ভার্জিনিয়া ফনসেকা, পাত্রিসিয়া পোয়েতা, ক্লদিয়া ওহানাসহ বেশ কয়েকজন পরিচিত তারকা আশির দশকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বানানো ছবি প্রকাশ করেছেন। ভারতের বিনোদন জগতের তারকারাও একই প্রবণতায় যোগ দিয়েছেন। মালয়ালম বিনোদন জগতের কয়েকজন পরিচিত মুখের ছবিও এই ধারায় ছড়িয়ে পড়েছে। যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশের নায়ক নায়িকা এবং ইনফ্লুয়েন্সাররাও। 

WhatsApp Image 2026-09-09 at 17.10.15

অনেকে মজা করে বিখ্যাতদেরও দিচ্ছেন ৮০র দশকের রেট্রো লুক

যাই হোক, এই ন্সটালজিক ট্রেন্ডে যদি আপনিও গা ভাসাতে চান, আর না জানেন সাঁতার মানে প্রম্পট তবে আপনার জন্য আমরা জানিয়ে দিচ্ছি সে উপায়। 

যেকোনো AI সাইটে গিয়ে নিজের একটি ছবি আপলোড করে এই প্রম্পটগুলো দিতে পারেন।

১. পুরোনো স্টুডিওর ছবি

Turn my photo into an authentic 1980s studio portrait. Keep my face unchanged. Give me 80s hairstyle, shoulder-padded clothing, subtle bold makeup, direct studio flash, warm lighting, faded colors and realistic 35mm film grain. Make it look like a genuine family photograph from the 1980s.

২. বলিউডের আশির দশক

Turn my photo into a classic 1980s Bollywood portrait. Keep my facial features and identity unchanged. Add an authentic 80s hairstyle, sari, statement jewellery and period-appropriate makeup. Use warm studio lighting, soft focus, faded colors and analog film grain.

৩. দক্ষিণ এশিয়ার পারিবারিক অ্যালবাম

Make my photo look like an old South Asian family photograph from the 1980s. Keep my face exactly the same. Add period-appropriate clothing, a painted studio backdrop, formal posing, direct flash, warm faded colors and natural film grain. Make it look like a real photograph from an old family album.

৪. ৮০-এর দশকের রাস্তার ছবি

Turn my photo into a candid street photograph from the 1980s. Keep my face unchanged. Add authentic 80s denim, high-waisted trousers, sunglasses, an old car and vintage surroundings. Use warm sunlight, faded colors and realistic 35mm film grain.

৫. দম্পতির পুরোনো ছবি

Transform our photo into a realistic 1980s couple portrait. Keep both faces completely unchanged. Dress us in authentic 80s fashion and place us in a vintage studio setting with direct flash, warm lighting, faded colors, soft focus and natural film grain. Make it look like an old family album photograph.

৬. একেবারে পুরোনো অ্যালবামের মতো

Make this photo look like it was taken in 1985 and printed in a family photo album. Keep the faces exactly as they are. Use authentic 80s clothing, hairstyles and makeup, warm faded colors, slightly imperfect exposure, direct flash, soft focus and subtle film grain. Avoid a modern digital look.

এছাড়া আপনার প্রয়োজনমতো প্রম্পট চেঞ্জ করে নিতে পারবেন। তবে এখানে একটি সতর্কতার জায়গাও আছে। নিজের মুখের ছবি কোনো AI তে আপলোড দেওয়ার আগে সেই ছবিটি AI কীভাবে ব্যবহার করে, ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে রাখে- এসব সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। সোশ্যাল মিডিয়ার মজার কোনো ট্রেন্ডে অংশ নিতে গিয়ে নিজের ব্যক্তিগত ছবির নিয়ন্ত্রণ যেন অজান্তে অন্যের হাতে চলে না যায়, সেটাও একটু মনে রাখা দরকার। 



১৮২ পঠিত ... ২৩ ঘন্টা ১২ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top